১৯১৯ সালের ভারত শাসন আইনে দ্বৈতশাসন ব্যবস্থার কার্যকারিতা

১৯১৯ সালের ভারত শাসন আইনের অধীনে দ্বৈতশাসন ব্যবস্থার কার্যকারিতা মূল্যায়ন কর, দ্বৈতশাসন ব্যবস্থার কার্যকারিতা, Functionality of Dual System,
Follow Our Official Facebook Page For New Updates


Join our Telegram Channel!

প্রশ্ন ॥ ১৯১৯ সালের ভারত শাসন আইনের অধীনে দ্বৈতশাসন ব্যবস্থার কার্যকারিতা মূল্যায়ন কর। Evaluate the functioning of the dual system of government under the Government of India Act, 1919.

দ্বৈতশাসন ব্যবস্থার কার্যকারিতা

ভূমিকা : ১৯০৯ সালের মর্লিমিন্টো সংস্কার আইনের ব্যর্থতার কারণে ভারতীয় জনসাধারণের ক্ষোভ প্রশমন করার জন্য দ্রুত একটি আইন প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। 

এর পরিপ্রেক্ষিতে ব্রিটিশ সরকার ১৯১৯ সালে ভারত শাসন আইন প্রবর্তন করেন। এ আইনের বিভিন্ন ইতিবাচক ধারাগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি ধারা ছিল দ্বৈতশাসন ব্যবস্থার প্রবর্তন। 

এ ব্যবস্থা প্রবর্তনের পর ভারতের অনেক বিখ্যাত রাজনীতিবিদ একে একটি অভিনব শাসনব্যবস্থা বলে আখ্যায়িত করে। অন্তর্নিহিত ও আনুষঙ্গিক ভুল-ত্রুটির কারণে দ্বৈতশাসন ব্যবস্থা তার কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলেও ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। দ্বৈতশাসন ব্যবস্থার কার্যকারিতা

দ্বৈতশাসন : 

১৯১৯ সালের ভারত শাসন আইনের একটি উল্লেখযোগ্য ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে দ্বৈতশাসন ব্যবস্থা। এর ইংরেজি প্রতিশব্দ "Dyarchy" এটি গ্রিক শব্দ থেকে উদ্ভূত। Di অর্থ twice বা দুইবার এবং Archi শব্দের অর্থ to rule বা শাসন করা।

সুতরাং দ্বৈতশাসন বলতে দুই ধরনের শাসনকে বুঝায়। ভারত শাসন আইনের অধীন প্রদেশের শাসনকার্যের বিভাগসমূহকে দুইভাগে ভাগ করে দুটি ভিন্ন কর্তৃপক্ষের পরামর্শক্রমে শাসন করা হয়েছিল বলে এরূপ নামকরণ করা হয়। দ্বৈতশাসন ব্যবস্থার কার্যকারিতা

দ্বৈতশাসন ব্যবস্থার কার্যকারিতা : 

১৯১৯ সালের ভারত শাসন আইনের অধীনে শাসনব্যবস্থা বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে যে দ্বৈতশাসন ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়েছিল, নানা কারণে সেটা তার কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলে। 

তাই বলা যায় যে জনগণের সুফলের জন্য এ আইন প্রণয়ন করা হলেও এটা তখন অকার্যকর একটি আইন হিসেবে প্রমাণিত হয়। যে সকল কারণে এর কার্যকারিতা বিনষ্ট হয় সেগুলো ছিল নিম্নরূপ : 

১. শাসন পরিষদ সদস্যগণের অসহযোগিতা : 

যেকোনো আইন কার্যকর ও সফল করার জন্য সরকারি আমলাদের সমর্থন ও সহযোগিতার প্রয়োজন হয়। দ্বৈতশাসন ব্যবস্থায় মন্ত্রিপরিষদ ও শাসন পরিষদের সদস্যদের মধ্যে সহযোগিতা মনোভাবের অভাব ছিল। তাই এটি এর কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলে। দ্বৈতশাসন ব্যবস্থার কার্যকারিতা

২. নীতিগত ত্রুটি : 

সরকার একটি সামগ্রিক প্রতিষ্ঠান। এর একটি বিভাগ অন্যটির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই কৃত্রিমভাবে বিভাজন সৃষ্টির মধ্য দিয়ে দুটি কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে শাসনকার্য পরিচালনা করার জন্য চরম বিশৃঙ্খলা পরিবেশের সৃষ্টি হয়। যার ফলে এটি অকার্যকর হয়ে পরে। দ্বৈতশাসন ব্যবস্থার কার্যকারিতা

৩. মন্ত্রীদের দ্বিমুখী দায়িত্বশীলতা : 

দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে মন্ত্রীদের গভর্নর ও আইনসভা এ দুই জায়গায় জবাবদিহি করতে হতো। একারণে মন্ত্রী একপ্রকার মানসিক চাপে থাকতেন এবং দায়িত্ব পালনে অনীহা প্রকাশ করতেন বিধায় এব্যবস্থা কার্যকর হতে ব্যর্থ হয়। 

৪. গভর্নরের ব্যাপক ক্ষমতা : 

দ্বৈতশাসন ব্যবস্থায় গভর্নরকে এতো অধিক ক্ষমতা প্রদান করা হয় যে তার কথাই শেষ কথা হিসেবে গণ্য হতো। শাসন বিভাগ, আইন বিভাগ, প্রাদেশিক আইনসভা প্রতিটি বিভাগে তার ক্ষমতা ছিল অপ্রতিরোধ্য।

আইনসভায় বাজেট বা কোনো বিল তার পূর্বানুমান ছাড়া পাস করা যেতো না। তিনি ভেটো প্রদান করতে পারতেন। এজন্য চাইলেই কোনো বিল আইনসভায় তিনি আটকিয়ে দিতে পারতেন।

৫. গভর্নরের পক্ষপাতিত্ব : 

শাসন পরিষদের প্রধান হওয়ার কারণে তার সাথে শাসন পরিষদের অন্যান্য সদস্যদের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। তাই এই পরিষদের কোনো সভায় তিনি তাদের পক্ষ হয়ে কথা বলতেন। যার ফলে শাসনব্যবস্থায় স্বজনপ্রীতি অনুপ্রবেশ করেও এটি অকার্যকর হয়ে পড়ে। দ্বৈতশাসন ব্যবস্থার কার্যকারিতা

৬. প্রাদেশিক আর্থিক অস্বচ্ছলতা : 

দ্বৈতশাসন ব্যবস্থা কার্যকরী না হবার অন্যতম কারণ এটি। প্রদেশগুলোর উন্নয়নের জন্য যতটুকু অর্থ সাহায্যের প্রয়োজন ছিল, মন্ত্রীরা সেটা কেন্দ্র হতে পেতেন না। মন্ত্রীদের সাথে শাসন পরিষদের সদস্যদের দ্বৈরথ অনেক আগে থেকেই বিদ্যমান ছিল। দ্বৈতশাসন ব্যবস্থার কার্যকারিতা

আর অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব ছিল শাসন পরিষদ সদস্যদের হাতে। এজন্য অর্থ বরাদ্দ পাওয়া মন্ত্রীদের জন্য কঠিন ছিল। শাসন পরিষদের অর্থ সচিব মন্ত্রীদের অর্থ চাহিদা পত্রের মূল্যায়ন করতেন না। এ সকল কারণে মন্ত্রীরা স্থানীয় জনগণের রোষানলে পড়ে।

৭. শৃঙ্খলাবদ্ধ রাজনৈতিক দলের অভাব : 

১৯১৯ সালের দ্বৈতশাসন ব্যবস্থা অকার্যকর হবার পেছনে অন্য একটি কারণ ছিল সুশৃঙ্খল রাজনৈতিক দলের অনুপস্থিতি। এ রাজনৈতিক দলের অভাবে মন্ত্রীরা গভর্নর জেনারেলের পদাঙ্ক অনুসরণ করতে বাধ্য হতো। গভর্নরের ভুল সিদ্ধান্তও মন্ত্রীরা মেনে নিতে বাধ্য থাকতো।

৮. শাসনব্যবস্থায় সমন্বয়হীনতা : 

রাষ্ট্রের উন্নতির জন্য সরকারের প্রত্যেকটি বিভাগের মধ্যে সমন্বয় থাকা জরুরি। দ্বৈতশাসন ব্যবস্থায় এ সমন্বয় ছিল না। মন্ত্রী সভা ও শাসন পরিষদের মধ্যে যৌথ বৈঠক করার কথা থাকলেও গভর্নর এ বিষয়ে ছিল উদাসীন। দ্বৈতশাসন ব্যবস্থার কার্যকারিতা

তাছাড়া গভর্নর যৌথ বৈঠক আহ্বান না করে মাঝে মধ্যে মন্ত্রীদের সাথে ব্যক্তিগতভাবে বৈঠক করতেন। যার ফলে দ্বৈতশাসন ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে উঠেন। দ্বৈতশাসন ব্যবস্থার কার্যকারিতা

৯. আমলাদের দৌরাত্ম্য : 

দ্বৈতশাসন ব্যবস্থায় আমলারা গভর্নরের পরেই বেশি ক্ষমতাবান ছিলেন। প্রতিটি সরকারি কাজে তারা বাধার সৃষ্টি করতেন। মন্ত্রীরা আমলাদের নিকট কোনো সহযোগিতা চাইলে সবসময় সেটা পেতেন না। 

কোনো কোনো আমলা আবার স্থানীয় পর্যায়ের মন্ত্রীদের সাথে ব্যক্তিগত বৈঠক করে দুর্নীতির পথ সুগম করেন। গভর্নরের সাথে আমলাদের একনিষ্ট সম্পর্ক ও যোগাযোগের ফলে তাদের উপর কথা বলারও কেউ সাহস করতো না।

১০. বিশেষ শ্রেণির স্বার্থ সংরক্ষণ : 

১৯১৯ সালের আইন অনুসারে রচিত দ্বৈতশাসন ব্যবস্থার আইনসভার মোট সদস্যের ৩০% সদস্য সরকার কর্তৃক মনোনীত হতেন। এ কারণে তাদের ক্ষমতা ছিল বেশি এবং তাদের মধ্যে ঐক্য বিরাজমান ছিল। 

কোনো বিল আইনসভায় পাস করতে চাইলে তাদের সহযোগিতা প্রয়োজন ছিল বিধায় মন্ত্রীরা এ গোষ্ঠীর স্বার্থ সংরক্ষণ করে চলতেন। আর এ স্বার্থসিদ্ধি মনোভাবের ফলে দ্বৈতশাসন ব্যবস্থা তার কার্যকারিতা হারায়। দ্বৈতশাসন ব্যবস্থার কার্যকারিতা

কার্যকারিতা মূল্যায়ন : 

শাসনব্যবস্থার মধ্যে গতিশীলতা আনয়ন করার জন্যই ১৯১৯ সালে ভারত শাসন আইনের মাধ্যমে দ্বৈতশাসন ব্যবস্থার প্রচলন করা হয়। এর অন্তর্নিহিত কিছু ভুল-ত্রুটি ও প্রায়োগিক দুর্বলতার জন্য এটি এর কার্যকারিতা হারায়। 

তা সত্ত্বেও এটি তৎকালীন সময়ে কিছুটা সুফল বয়ে এনেছিল। যার কারণে প্রায় ১৬ বছরে (১৯১৯-৩৫) এ আইনটি কার্যকর ছিল। দ্বৈতশাসন ব্যবস্থার কার্যকারিতা

আর এ দ্বৈতশাসন ব্যবস্থা বিদ্যমান থাকার সময়ই কলকাতা মিউনিসিপ্যালিটি আইন ১৯২৩, প্রজাস্বত্ব আইন ১৯২৮ এবং প্রাথমিক শিক্ষা আইন ১৯৩০ পাস করা হয়। সুতরাং বলাই যায় যে দ্বৈতশাসন ব্যবস্থা শতভাগ ব্যর্থ ছিল এরূপ মূল্যায়ন করাটা বোকামি।

উপসংহার : 

পরিশেষে বলা যায় যে, শাসনব্যবস্থাকে অধিকতর গ্রহণযোগ্য ও স্বচ্ছ করার স্বার্থে ব্রিটিশ সরকার ১৯১৯ সালে ভারত শাসন আইনের মাধ্যমে দ্বৈতশাসন ব্যবস্থার প্রচলন করেন। 

শাসনতান্ত্রিক ইতিহাসে এটা নিঃসন্দেহে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ ছিল। কিন্তু তারপরও এ ব্যবস্থা তেমন সুফল বয়ে আনতে পারেনি। 

যার ফলশ্রুতিতে ১৯৩৫ সালে নতুন আরেকটি আইন প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হয়। তবে দ্বৈতশাসন ব্যবস্থা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছিল এ কথা বলা যাবে না। কারণ এ ব্যবস্থা বিদ্যমান থাকার সময় জনকল্যাণমূলক কিছু আইন পাস করা হয়েছিল। দ্বৈতশাসন ব্যবস্থার কার্যকারিতা, দ্বৈতশাসন ব্যবস্থার কার্যকারিতা

Post a Comment

Cookie Consent
We serve cookies on this site to analyze traffic, remember your preferences, and optimize your experience.
Oops!
It seems there is something wrong with your internet connection. Please connect to the internet and start browsing again.
AdBlock Detected!
We have detected that you are using adblocking plugin in your browser.
The revenue we earn by the advertisements is used to manage this website, we request you to whitelist our website in your adblocking plugin.
Site is Blocked
Sorry! This site is not available in your country.