মওলানা ভাসানীকে মজলুম জননেতা বলার কারণ

মওলানা ভাসানীকে মজলুম জননেতা বলার কারণ, মওলানা ভাসানীকে মজলুম জননেতা বলা হয় কেন? Why is Maulana Bhasani called an oppressed public leader?
Join our Telegram Channel!

প্রশ্ন ॥ মওলানা ভাসানীকে মজলুম জননেতা বলা হয় কেনWhy is Maulana Bhasani called an oppressed public leader?

মওলানা ভাসানীকে মজলুম জননেতা বলার কারণ

মওলানা ভাসানীর রাজনৈতিক আদর্শ সম্বলিত কোনো গ্রন্থ নেই। তিনি সময়ের প্রয়োজনে কিছু সংখ্যক পুস্তিকা প্রকাশ করেছেন এবং জীবনের শেষ পর্যায়ে 'হক কথা' নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশ করেন। 

এই পুস্তিকাবলি, সাপ্তাহিক পত্রিকা এবং তাঁর বক্তৃতা বিবৃতি থেকে তাঁর রাজনীতিক মতাদর্শের পরিচয় পাওয়া যায়। 

মওলানা ভাসানীকে মজলুম জননেতা বলার কারণ: 

নিম্নে মওলানা ভাসানীকে মজলুম জননেতা বলার কারণ আলোচনা করা হলো :

১. কৃষক আন্দোলন : 

১৭৯৩ সালে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রবর্তনের ফলে বাংলায় বহু ভুইফোঁড় জমিদার ও সুদখোর মহাজন শ্রেণির সৃষ্টি হয়। এদের অত্যাচার নিপীড়নে অতীষ্ঠ হয়ে উঠে বাংলার সাধারণ মানুষ। 

শোষিত শ্রেণির বন্ধু হিসেবে এগিয়ে আসেন মওলানা ভাসানী। বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষক আন্দোলন এমনকি কৃষক বিদ্রোহ শুরু হয় তাঁর নেতৃত্ব। 

রাজশাহীর ধূপঘাটের জমিদার ময়মনসিংহের সন্তোষ ও গৌরীপুরে মহারাজা এবং পাবনার সুদখোর মহাজনদের বিরুদ্ধে পর্যায়ক্রমে যে কৃষক আন্দোলন ও বিদ্রোহ সংঘটিত হয়েছিল তাঁর নেতৃত্ব দিয়েছিলেন মওলানা ভাসানী। 

শুধু কৃষক আন্দোলনের নেতৃত্ব নয়, তিনি অশিক্ষিত কৃষকদের অধিকার সচেতন করে তোলার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন অঞ্চলে বিরাট কৃষক সম্মেলন আহ্বান করেছেন। 

তিনি এরকম একটি সম্মেলনের আয়োজন করেন আসামের ধুবড়ি জেলার ভাসানচরে (১৯২৪)। এই সম্মেলনে তিনি আসামে বসবাসকারী বহিরাগত বাঙালিদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের দৃঢ় সংকল্প ঘোষণা করেন। 

ভাসানচরের সম্মেলনের সাফল্যের কারণেই তিনি ভাসানীর মওলানা নামে অভিহিত হন। এই সম্বোধনই শেষে রূপান্তরিত হয় মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানিতে। 

ভাসানচরের সম্মেলন ছাড়াও টাঙ্গাইলের কৃষক সম্মেলন (বাং ১৩৩৭), কামরুপ জেলার বড় পেটার মুসলিম লীগ সম্মেলন (ইং ১৩৩৭), সিরাজগঞ্জের বঙ্গ আসাম প্রজা সম্মেলন (বাং ১৩৩৭), চারাবাড়ি কাটের কৃষক সম্মেলন (বাং ১৩৩৭)। 

মঙ্গলদই আন্দোলন, কাগমারী সম্মেলন (ইং ১৯৫৯), টাঙ্গাইলের কৃষক খাতক সমাবেশ (ইং ১৯৪১) ইত্যাদিকে মওলানা ভাসানী সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। 

২. লাইন প্রথার বিরুদ্ধে আন্দোলন :

আসামের প্রবাস জীবনের প্রথম পর্যায়ে ভাসানীকে কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছিল।ঘাগমারার গভীর জঙ্গল সাফ করে তিনি বসতি স্থাপন করেছেন। 

তার হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রমে ঘাগমারায় গড়ে উঠল জনপদ, প্রতিষ্ঠিত হলো বিদ্যালয়, হাসপাতাল, বিপনিকেন্দ্র। হামিদাবাদ নামে পরিচিত হলো নতুন জনপদ। কিন্তু মওলানা ভাসানী আবার নতুন চক্রান্তের শিকারে পরিণত হন। মওলানা ভাসানীকে মজলুম জননেতা বলার কারণ

ইংরেজ রাজপুরুষের সঙ্গে বাঙালি বাবুগণ একজোট হয়ে আসাম থেকে বাঙালি মুসলমান উৎখাতের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হলো। ইংরেজ রাজপুরুষ ও বাঙালি বাবুদের হেয় মনোভাবই লাইন প্রথার উৎস। মওলানা ভাসানীকে মজলুম জননেতা বলার কারণ

বাঙালি মুসলমানদের অস্তিত্ব আসাম থেকে উৎখাত করার অভিসন্ধিতে আসামের বড়দলই সরকার ১৯৩৭ সালে লাইন প্রথা নামে সরকারি নিয়ন্ত্রণমূলক আইন জারি করে।

৩. খেলাফত আন্দোলনে যোগদান : 

আসামের গালেশ্বরে অবস্থানকালে মওলানা ভাসানী খেলাফত আন্দোলনে যোগদান করেন । এই আন্দোলন তাঁর মনে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। 

কারণ তিনি মনে করেছিলেন যে প্রথমত এর মাধ্যমে ইসলামের পূর্বগৌরব পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে এবং দ্বিতীয়ত এর আঘাতে ইংরেজ শক্তির পতন ঘটবে। 

খেলাফত আন্দোলন সূত্রে তিনি মওলানা শওকত আলী, মওলানা মোহাম্মদ আলী, মওলানা আবুল কালাম আজাদ, হাকিম আজমল খা প্রমুখ বরেণ্য নেতার সান্নিধ্যে আসেন। 

অন্যদিকে স্বরাজ ও অসহযোগ আন্দোলনের সূত্রে তাঁর পরিচয় ঘটে এ্যানি বেসান্ত, গান্ধী, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, চিত্তরঞ্জন দাস, লোকমান্য তিলক এবং সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ সর্বভারতীয় নেতার সঙ্গে। মওলানা ভাসানীকে মজলুম জননেতা বলার কারণ

১৯১৯ সনের মার্চ মাসে রাওলাট আইন পাস হওয়ার পর সারা উপমহাদেশে প্রচণ্ড বিক্ষোভ শুরু হয়। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল ভারতবাসী এই দমনমূলক আইনের বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে উঠে। মওলানা ভাসানীকে মজলুম জননেতা বলার কারণ

বিক্ষোভে আন্দোলন সংগঠনের ব্যাপারে ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মওলানা ভাসানী তখন কংগ্রেসের প্রাথমিক সদস্যপদ লাভ করেন। 

সে বছরই (১৯১৯) প্রতিরোধ আন্দোলনে অংশগ্রহণের অভিযোগে তাঁকে কারারুদ্ধ করা হয়। এটাই ছিল তাঁর কারাবরণের প্রথম অভিজ্ঞতা। মওলানা ভাসানীকে মজলুম জননেতা বলার কারণ

৪. বাংলার প্রতি বিশেষ মনোযোগ : 

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকে মওলানা ভাসানী সর্বভারতীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বাংলার অভ্যন্তরেই সীমাবদ্ধ ছিল। 

এর প্রধান কারণ, সর্বভারতীয় নেতৃত্ব নয় বাংলার শোষিত মানবতার মুক্তিই ছিল তাঁর প্রধান লক্ষ্য। বাংলার তৎকালীন আর্থসামাজিক অবস্থা তাকে খুব পীড়া দিত। 

আশরা আতরাফের প্রভেদ, ইংরেজ সমর্থনপুষ্ট জমিদার শ্রেণির অত্যাচার, করভারে জর্জরিত কৃষক, মজুর, তাঁতি, কামার ও কুমারের দুর্দশাগ্রস্ত জীবন তাঁর সংবেদনশীল মানসে গভীর রেখাপাত করে। মওলানা ভাসানীকে মজলুম জননেতা বলার কারণ

তাই তিনি পুরাতন সমাজ কাঠামো ভেঙে নতুন সাম্যবাদী সমাজ গড়ে চেয়েছিলেন।

৫. পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে ভাসানী : 

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের প্রাথমিক পর্যায়েই মওলানা ভাসানী পাকিস্তান দাবির সমর্থনে জোর প্রচার কার্য চালাতে থাকেন। পাকিস্তান জন্মলাভ করল, সমস্যা দেখা দিল সিলেটের পাকিস্তান অন্তর্ভুক্তি প্রশ্নে। 

সে সময় অন্যান্য নেতার ন্যায় ভাসানীও কঠোর পরিশ্রম করে প্রচারকার্য চালিয়ে পাকিস্তানের সপক্ষে জনমত গড়ে তুলেছিলেন। তার ফলেই সিলেটবাসীরা গণভোটের মাধ্যমে পাকিস্তানে যোগদান করে। 

পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই তিনি উপলব্ধি করেন যে, পাকিস্তানের দুই অংশের বিচ্ছেদ অনিবার্য ও সময়ের ব্যাপারমাত্র। 

তিনি কাগমারী সম্মেলনে (৮ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫৭) পশ্চিত পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর প্রতি প্রবল ক্ষোভের সঙ্গে 'আসসালুম আলাইকুম', জানিয়ে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার ইঙ্গিত দেন। মওলানা ভাসানীকে মজলুম জননেতা বলার কারণ

৬. পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন আন্দোলনে ভাসানী :

১৯৫৪ সনে পূর্ব পাকিস্তানে শুরু হয় যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক আন্দোলন। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক আন্দোলনে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতিতে যোগ করে নতুন মাত্রা। 

বলা যায়, বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন শুরু হয়েছিল তখন থেকেই। যুক্তফ্রন্ট গঠন, ১৯৫৪-এর নির্বাচনে জয়লাভ এবং পূর্ব-পাকিস্তানের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের জন্য যে ব্যাপক গণআন্দোলন শুরু হয় মওলানা ভাসানী ছিলেন তার অন্যতম নেতা।

৭. ভাষা আন্দোলনে মওলানা ভাসানী :

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনকে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের সূচনা বলা হয়ে থাকে। বাংলা ভাষা অন্যতম রাষ্ট্র ভাষা হিসেবে স্বীকৃতির দাবিতে যে ব্যাপক গণ আন্দোলনের শুরু হয় তারও অন্যতম নেতা ছিলেন মওলানা ভাসানী। 

ব্যাপক জনপ্রিয়তা ও সম্মোহনী নেতৃত্বের কারণে প্রায় প্রতিটি আন্দোলনে ভাসানী সফল হয়েছিলেন।

৮. স্বাধীন বাংলাদেশে ভাসানীর রাজনীতি: 

স্বাধীন বাংলাদেশের আজীবন সংগ্রাম মওলানা ভাসানী স্বস্তিতে কালাতিপাত করতে  পারেননি। শাসকচন্দ্রের ক্ষমতালিপ্সা, দুর্নীতি এবং অবৈধ পন্থায় ক্ষমতা দখলের প্রবণতা তাকে বিক্ষুব্ধ করে তোলে। 

দুর্নীতি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রীর অগ্নিমূল্যের বিরুদ্ধে ভূখা মিছিল ও অনশন ধর্মঘটে তিনি নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।

উপসংহার : 

পরিশেষে বলা যায় যে, মওলানা ভাসানীর রাজনীতির একটি বিশেষ দিক হচ্ছে ফরাসি দার্শনিক রুশোর ন্যায় রাজনীতিতে অনুভূতি ও আবেগের প্রসার। বাংলার সহজ-সরল মানুষের আবেগের প্রতিনিধিত্ব করেছেন মওলানা ভাসানী। 

বাংলার শোষিত বঞ্চিত মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর অবদান ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। 

তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সংগ্রাম ও আন্দোলন অনগত দিনের রাজনীতিবিদ, সমালোচক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও গবেষকদের চিন্তার খোরাক জোগাবে। মওলানা ভাসানীকে মজলুম জননেতা বলার কারণ, মওলানা ভাসানীকে মজলুম জননেতা বলার কারণ, মওলানা ভাসানীকে মজলুম জননেতা বলার কারণ

Post a Comment

Cookie Consent
We serve cookies on this site to analyze traffic, remember your preferences, and optimize your experience.
Oops!
It seems there is something wrong with your internet connection. Please connect to the internet and start browsing again.
AdBlock Detected!
We have detected that you are using adblocking plugin in your browser.
The revenue we earn by the advertisements is used to manage this website, we request you to whitelist our website in your adblocking plugin.
Site is Blocked
Sorry! This site is not available in your country.
close