প্রাচ্যের রাষ্ট্রচিন্তা: বৈশিষ্ট্য, গুরুত্ব ও গ্রিকদের অবদান
প্রশ্নঃ প্রাচ্যের রাষ্ট্রচিন্তা বলতে কী বুঝায়? প্রাচ্যের রাষ্ট্রচিন্তা পাঠের গুরুত্ব আলোচনা কর। প্রাচ্যের-রাষ্ট্রচিন্তার প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ আলোচনা কর। প্রাচ্যের-রাষ্ট্রচিন্তার বিষয়বস্তু ও পরিধি আলোচনা কর। রাষ্ট্রচিন্তায় গ্রিকদের অবদান আলোচনা কর।
ভূমিকা
আধুনিক যুগে সেকুলার রাষ্ট্রচিন্তার ব্যাপক প্রসার ঘটলেও, ধর্মাশ্রয়ী চিন্তা এখনও প্রাচ্য কিংবা পাশ্চাত্য সবক্ষেত্রেই সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। উল্লেখ্য যে, প্রাচ্যের রাষ্ট্রচিন্তা মূলত ধর্মতান্ত্রিক এবং অনেকটা নৈতিকতা প্রকৃতির। তবে, প্রাচ্যের রাষ্ট্রচিন্তায় কল্যাণকামী রাজার ধারণার মাধ্যমে রাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার ধারণাও স্বীকৃতি লাভ করেছে।
বস্তুত, এশিয়া, আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার মতো অ-পাশ্চাত্য দেশসমূহের সমাজ, রাজনীতি ও রাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে মনীষীদের চিন্তাই হলো প্রাচ্যের রাষ্ট্রচিন্তা। এই চিন্তাধারা প্রাচীনকাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত রাষ্ট্রব্যবস্থায় গভীর প্রভাব বিস্তার করে আসছে।
প্রাচ্যের রাষ্ট্রচিন্তার সংজ্ঞা ও শ্রেণুবিভাগ
অ-পাশ্চাত্য দেশসমূহ তথা এশিয়া, আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার দেশসমূহ প্রাচ্য দেশ বা অঞ্চল হিসেবে বিবেচিত। আর প্রাচ্যের যে সকল মনীষী রাষ্ট্র ও রাজনীতি সম্পর্কে যে চিন্তা-ভাবনা করেছেন তাকে প্রাচ্যের রাষ্ট্রচিন্তা বলে। প্রাচ্যের রাষ্ট্রচিন্তাকে প্রধানত তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়:
- প্রথমত, প্রাচীন রাষ্ট্রচিন্তা: প্রাচীনকালে চীনে কনফুসিয়াস, লাওৎসু, মেনসিয়াস, ভারতে কৌটিল্য ও ব্যাবিলনে হাম্বুরাবি প্রাচ্য রাষ্ট্রচিন্তার জগৎকে প্রসারিত করেন।
- দ্বিতীয়ত, মধ্যযুগীয় রাষ্ট্রচিন্তা: মধ্যযুগে হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রবর্তিত রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রাচ্য রাষ্ট্রচিন্তার জগতে আলোড়ন সৃষ্টি করে। পরবর্তীতে আল ফারাবী, ইবনে সিনা, আল গাজ্জালি, ইবনে রুশদ এতে যথেষ্ট অবদান রাখেন।
- তৃতীয়ত, আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তা: প্রাচ্যের আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তায় অবদান রাখেন সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী, মহাত্মা গান্ধী, আল্লামা ইকবাল, মোজাফফর আহমদ, মওলানা ভাসানী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রমুখ।
রাষ্ট্রচিন্তা পাঠের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা
আধুনিক বিশ্বে পাশ্চাত্য রাষ্ট্রচিন্তার প্রভাব ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেলেও, পাশাপাশি প্রাচ্যের রাষ্ট্রচিন্তার তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক গুরুত্ব সমান্তরালভাবে বেড়েছে। নিম্নে এর গুরুত্ব আলোচনা করা হলো:
১. ইসলামি জ্ঞান ও অর্থব্যবস্থা সম্পর্কে ধারণা
ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। ইসলামের পরিচয়, উৎপত্তি, ক্রমবিকাশ এবং মর্যাদা সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করতে হলে প্রাচ্যের রাষ্ট্রচিন্তা অধ্যয়ন করা জরুরি। তদুপরি, ইসলামি অর্থব্যবস্থা হলো সুদমুক্ত ও ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবস্থা। মানুষের সর্বাঙ্গীন ও সমৃদ্ধ জীবনযাপনের জন্য এই অর্থব্যবস্থা সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা প্রয়োজন।
২. রাজনৈতিক ও আইনগত জ্ঞান
ইসলামি রাজনীতি, রাষ্ট্রের উপাদান, গঠন প্রণালি এবং মূলনীতি সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করতে হলে প্রাচ্যের রাষ্ট্রচিন্তা অধ্যয়নের বিকল্প নেই। অন্যদিকে, ইসলামি আইনের উৎস, বৈশিষ্ট্য এবং আইন প্রণয়নের পদ্ধতি সম্পর্কে জানতেও এটি অপরিহার্য।
আরও পড়ুন:
৩. তুলনামূলক জ্ঞান ও আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা
উন্নত বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হলে তুলনামূলক জ্ঞান অর্জন করা জরুরি। প্রাচ্যের দেশগুলো খনিজ সম্পদ ও জনসম্পদে সমৃদ্ধ হতে হলে প্রাচ্য-রাষ্ট্রচিন্তার তুলনামূলক জ্ঞান প্রয়োজন। তাছাড়া, বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক উন্নয়নেও এই পাঠের গুরুত্ব অপরিসীম।
প্রাচ্যের রাষ্ট্রচিন্তার প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ
প্রাচ্য রাষ্ট্রচিন্তার ক্ষেত্রে ধর্ম ও নৈতিকতার সামঞ্জস্য থাকলেও প্রকৃতপক্ষে এটি সম্পূর্ণ ধর্মকেন্দ্রিক নয়। এর প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:
১. আদর্শবাদ ও নীতিবাদ
আদর্শবাদ প্রাচ্যের রাষ্ট্রচিন্তার প্রধান বৈশিষ্ট্য। চীনে কনফুসিয়াসের আদর্শ এবং মধ্যযুগে ইসলামি ভাবধারার আদলে এই আদর্শবাদী ধারা গড়ে উঠে। পাশাপাশি, এটি নৈতিক প্রকৃতির। কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র এবং ইসলামের সকল কাজে নৈতিকতার উপদেশ বাণী পাওয়া যায়।
২. অভিজ্ঞতাবাদ ও ন্যায়বিচার
প্রাচ্যের রাষ্ট্রচিন্তার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে অভিজ্ঞতাবাদ। পরবর্তী রাষ্ট্রচিন্তাবিদগণ রাষ্ট্রদর্শনের গবেষণায় অভিজ্ঞতাবাদকে কাজে লাগান। অন্যদিকে, কনফুসিয়াস ও কৌটিল্য উভয়েই রাষ্ট্রে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার কথা বলেছেন। ইসলামের রাষ্ট্রব্যবস্থার মূল দর্শনও হলো ন্যায়বিচার।
৩. ধর্ম ও মানবতাবাদের প্রাধান্য
প্রাচ্যের রাষ্ট্রচিন্তার উপর ধর্মের প্রভাব অনস্বীকার্য। কনফুসিয়াসের চিন্তাধারা এবং মহাত্মা গান্ধীর দর্শন সবই ধর্ম উদ্ভূত। তবে এর পাশাপাশি মানবতাবাদের নিদর্শনও লক্ষ্য করা যায়। এখানে ব্যক্তির অধিকারকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
প্রাচ্যের রাষ্ট্রচিন্তার বিষয়বস্তু ও পরিধি
প্রাচ্যের রাষ্ট্রচিন্তার বিষয়বস্তু অত্যন্ত ব্যাপক। ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বিষয়াবলি এর অন্তর্ভুক্ত। এর পরিধির প্রধান দিকগুলো হলো:
- ইসলামি জীবনব্যবস্থা: ইসলামের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক জীবনের যাবতীয় সমাধান এর অন্তর্ভুক্ত।
- সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা: সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং সুদমুক্ত অর্থব্যবস্থা সম্পর্কে আলোচনা করা হয়।
- রাজনৈতিক ব্যবস্থা: রাষ্ট্রের গঠন, শাসন বিভাগের ক্ষমতা ও কার্যাবলি এর পরিধিভুক্ত।
- যুদ্ধ ও শান্তি: প্রাচ্যের চিন্তাবিদগণ সাধারণত যুদ্ধ বর্জনের এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার মত প্রকাশ করেছেন।
রাষ্ট্রচিন্তায় গ্রিকদের অবদান
বিশ্বের প্রাচীনতম সভ্যতাসমূহের মধ্যে গ্রিক সভ্যতা শীর্ষস্থানীয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের উদ্ভব ও বিকাশে গ্রিকদের অবদান অনস্বীকার্য। তাদের প্রজ্ঞা ও দূরদৃষ্টি পরবর্তীকালের পাশ্চাত্য সভ্যতাকে সমৃদ্ধ করেছে।
১. রাষ্ট্র সম্পর্কে ধারণা ও গণতন্ত্র
গ্রিকরাই সর্বপ্রথম রাষ্ট্র সম্পর্কিত ধারণার সূত্রপাত ঘটায়। তারা রাষ্ট্রের উৎপত্তি, প্রকৃতি ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে আলোচনা করে। উল্লেখ্য যে, গ্রিক রাষ্ট্রচিন্তার একটি বিশেষ অবদান হলো স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র। তাদের সমাজব্যবস্থায় গণতান্ত্রিক চরিত্র স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করা যায়।
২. ব্যক্তিস্বাধীনতা ও আইনের শাসন
গ্রিকরা সর্বপ্রথম ব্যক্তিস্বাধীনতার গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারে। এরিস্টটলের মতে, মানুষের পূর্ণতার জন্য অবাধ স্বাধীনতা প্রয়োজন। তদুপরি, আইনের প্রতি শ্রদ্ধা পোষণ করা গ্রিক রাষ্ট্রচিন্তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। তাদের মতে, আইন প্রকৃতির উৎস এবং সকলকে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা উচিত।
৩. ন্যায়বিচার ও নৈতিকতা
সর্বপ্রথম গ্রিক রাষ্ট্রদর্শনেই ন্যায়বিচার সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। তাদের মতে, সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা না হলে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে। তাছাড়া, রাষ্ট্রে নৈতিকতা প্রতিষ্ঠায় তারা ধর্ম ও নৈতিকতার ওপর সবিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছেন।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, প্রাচ্যের রাষ্ট্রচিন্তা এবং গ্রিক রাষ্ট্রদর্শন উভয়ই আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভিত্তি রচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। প্রাচ্যের চিন্তাধারা যেমন নৈতিকতা ও ধর্মের সমন্বয় ঘটিয়েছে, তেমনি গ্রিক চিন্তাধারা গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচারের পথ দেখিয়েছিল। জ্ঞান-বিজ্ঞানের উৎকর্ষ সাধনে এই উভয় ধারার অবদান অনস্বীকার্য।