পবিত্র কুরআনের সূরা আল-আহযাবের ৫৬ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন স্বয়ং নির্দেশ দিয়েছেন— "নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতাগণ নবীর ওপর সালাত (দরূদ) পেশ করেন। হে মুমিনগণ! তোমরাও তাঁর ওপর দরূদ পাঠ কর এবং ভক্তিভরে সালাম জানাও।" বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি মুমিন হৃদয়ের গভীর প্রেম ও ভালোবাসার এক অতুলনীয় সুরমাখা প্রকাশ হলো 'আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা সাইয়্যিদিনা মুহাম্মাদ'। মিলাদ ও সীরাত মাহফিলে এবং একাকী মোনাজাতে এই দরূদ শরীফটি হৃদয়কে স্বর্গীয় নূরে ভরে তোলে।
'আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা' সম্পূর্ণ দীর্ঘ ক্বাসিদা লিরিক্স (সকল মূল ও বিস্তৃত অন্তরা)
(ধুয়া / স্থায়ী কোরাস)
আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা সাইয়্যিদিনা মুহাম্মাদিন
ওয়া আলা আলি সাইয়্যিদিনা মুহাম্মাদিন ওয়া বারিক ওয়াসাল্লিম!
(১ম অন্তরা: নবীপ্রেম ও হাশরের ভয়মুক্তি)
নবীজির প্রেমেতে যারা মাতোয়ারা সদা রয়,
হাশরের মাঠেতে তাদের নাহি কোনো ভয়!
আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা সাইয়্যিদিনা মুহাম্মাদিন...
(২য় অন্তরা: নয়নের মণি ও উম্মতের কাণ্ডারী)
ইয়া রাসূলাল্লাহ আপনি মোদের নয়নেরই মণি,
উম্মতেরই কান্ডারী আপনি প্রেমের খনি!
আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা সাইয়্যিদিনা মুহাম্মাদিন...
(৩য় অন্তরা: পুলসিরাত পারের আকুল মিনতি)
লাখো কোটি সালাত ও সালাম জানাই আপনার চরণে,
পার করে দিও মোদের পুলসিরাত দয়ার কারণে!
আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা সাইয়্যিদিনা মুহাম্মাদিন...
(৪র্থ অন্তরা: আমিনার কোলে শুভাগমন ও বিশ্ব জাহান ধন্য)
আমিনার কোল আলো করে এলেন রাহমাতাল্লিল আলামিন,
ধন্য হলো মক্কা নগর ধন্য হলো বিশ্ব জমিন!
আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা সাইয়্যিদিনা মুহাম্মাদিন...
(৫ম অন্তরা: দূর মদিনার রওজা পাকের দিদার)
দূর মদিনায় শুয়ে আছেন মোদের দয়ার নবীজী,
যাঁর নূরেরই রওশনীতে হাসে নিখিল পৃথিবী!
মন যে মানে না গো মোদের দেখতে সোনার মদিনা,
স্বপ্নে এসে দেখা দাও ওগো শাহে মদিনা!
আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা সাইয়্যিদিনা মুহাম্মাদিন...
(৬ষ্ঠ অন্তরা: কবরের সওয়াল-জওয়াব ও নূরানী বেশ)
কাফনেরই কাপড় গায়ে দিয়ে যখন যাব কবর দেশে,
দয়াল নবী আসবেন সেদিন নূরানী ঐ বেশে!
সওয়াল-জওয়াবের কঠিন কালে তুমি মোদের ভুলে যেও না,
উম্মত বলে সুপারিশের হাতটি যেন গুটিও না!
আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা সাইয়্যিদিনা মুহাম্মাদিন...
(৭ম অন্তরা: চাঁদ-সুরুজ ও সৃষ্টিজগতের মূল কারণ)
চাঁদ সুরুজ আর গ্রহ তারা তোমার নূরে পয়দা সব,
তুমি ছাড়া এই নিখিলে কেউ তো নাই গো আর বান্ধব!
আদম হতে ঈসা নবী যাঁর আগমনে ধন্য হলো,
সেই নবীরই উম্মত হয়ে ভাগ্য মোদের খুলে গেল!
আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা সাইয়্যিদিনা মুহাম্মাদিন...
(৮ম অন্তরা: হাশরের তৃষ্ণা ও হাউজে কাওসার)
তপ্ত রৌদ্রে তৃষ্ণায় যখন ফাটবে সবার বুক,
কাওসারের ঐ শরাব দিয়ে জুড়িয়ে দিও মোদের মুখ!
শাফায়াতের ঝাণ্ডা তলে জায়গা দিও মেহেরবান,
তোমার নামের দরূদ পড়ে জুড়ায় মুমিনের পরান!
আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা সাইয়্যিদিনা মুহাম্মাদিন
ওয়া আলা আলি সাইয়্যিদিনা মুহাম্মাদিন ওয়া বারিক ওয়াসাল্লিম!
দরূদ শরীফের প্রতিটি আরবী শব্দের ব্যাকরণ ও গভীর তাৎপর্য
প্রতিটি শব্দের গভীর আধ্যাত্মিক অর্থ উপলব্ধি করে দরূদ পাঠ করলে অন্তরে এক স্বর্গীয় নূর অনুভূত হয়। নিচে আরবী বাক্যটির ব্যাকরণিক ও ভাবগত বিশ্লেষণ তুলে ধরা হলো:
- আল্লাহুম্মা (اللَّهُمَّ): "হে আল্লাহ!"—সরাসরি মহান প্রতিপালককে সম্বোধন করে এই দোয়ার সূচনা। বান্দা নিজে থেকে নবীর যোগ্য মর্যাদা দিতে অক্ষম, তাই সে স্বয়ং পরাক্রমশালী আল্লাহর দরবারে প্রিয় নবীর জন্য প্রার্থনা পেশ করে।
- সাল্লি (صَلِّ): যখন বান্দা আল্লাহর কাছে 'সাল্লি' বলে, তখন এর অর্থ দাঁড়ায়—হে আল্লাহ, আপনার প্রিয় হাবীবের ওপর বিশেষ করুণা, সম্মান ও অসীম রহমত বর্ষণ করুন।
- আলা (عَلَى): এর আভিধানিক অর্থ "প্রতি" বা "ওপর"।
- সাইয়্যিদিনা (سَيِّدِنَا): "আমাদের নেতা, সর্দার বা পথপ্রদর্শক।" উম্মত হিসেবে বিশ্বনবীর প্রতি সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা, শিষ্টাচার ও বিনম্র আনুগত্য প্রকাশের জন্য এই পবিত্র শব্দটি ব্যবহার করা হয়। সহীহ হাদিসে নবীজী স্বয়ং বলেছেন—'আনা সাইয়্যিদু ওলাদি আদামা ইয়াওমাল কিয়ামাহ' (আমি কিয়ামতের দিন সমগ্র বনি আদমের নেতা)।
- মুহাম্মাদ (مُحَمَّدٍ): যাঁর অর্থ "চরম প্রশংসিত ও বারবার প্রশংসিত"। সৃষ্টির আদি থেকে অনন্তকাল যাঁর পবিত্র গুণগান আসমান ও জমিনে ধ্বনিত।
- ওয়া আলা আলি সাইয়্যিদিনা মুহাম্মাদ (وَعَلَى آلِ سَيِّدِنَا مُحَمَّدٍ): এবং আমাদের নেতা হযরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর পবিত্র পরিবার-পরিজন, আহলে বাইত ও সত্যের অনুসারী পুণ্যবানদের ওপর।
- ওয়া বারিক ওয়াসাল্লিম (وَبَارِكْ وَسَلِّمْ): এবং আপনার অফুরন্ত কল্যাণ, বরকত ও চিরন্তন নিরাপত্তা অবতীর্ণ করুন।
সহীহ হাদিসের আলোকে দরূদ পাঠের ফযিলত ও মর্যাদা
হাদিস শরীফে দরূদ পাঠের অসংখ্য অলৌকিক ফযিলত ও প্রতিদানের কথা বর্ণিত রয়েছে। যেকোনো পুণ্যবান মুসলমানের দৈনন্দিন জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আমল হলো দরূদ শরীফ পাঠ করা।
হযরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন—
"যে ব্যক্তি আমার ওপর একবার দরূদ পাঠ করবে, আল্লাহ তাআলা তার ওপর দশটি রহমত বর্ষণ করবেন, তার দশটি গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন এবং তার জন্য দশটি মর্যাদা বৃদ্ধি করবেন।"
(সহীহ আন-নাসাঈ: ১২৯৭, মুসনাদে আহমাদ: ১১৯৯৮)
অন্য এক হাদিসে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করীম (সা.) বলেন— "কিয়ামতের দিন মানুষের মধ্যে আমার সবচেয়ে নিকটবর্তী হবে সেই ব্যক্তি, যে আমার ওপর সবচেয়ে বেশি দরূদ পাঠ করবে।" (জামে আত-তিরমিযী: ৪৮৪)। এর অর্থ হলো, যে ব্যক্তি দুনিয়ায় নিয়মিত দরূদ পড়বে, হাশরের কঠিন দিনে বিশ্বনবীর শাফায়াত লাভ তার জন্য সহজ ও নিশ্চিত হয়ে যাবে।
দোয়া কবুলের মূল চাবিকাঠি হিসেবে দরূদ শরীফ
প্রার্থনা আল্লাহর দরবারে পৌঁছানোর জন্য দরূদ শরীফ একটি অপরিহার্য সেতু হিসেবে কাজ করে। হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) বলেছেন— "নিশ্চয়ই বান্দার দোয়া আসমান ও জমিনের মাঝখানে ঝুলন্ত অবস্থায় থাকে; কোনো দোয়াই আল্লাহর দরবারে পৌঁছায় না, যতক্ষণ না তোমরা তোমাদের নবীর ওপর দরূদ পাঠ কর।" (জামে আত-তিরমিযী)।
ইসলামী ফেকাহবিদ ও বুজুর্গগণ পরামর্শ দেন যে, যেকোনো মোনাজাতের শুরুতে মহান আল্লাহর প্রশংসা (আলহামদুলিল্লাহ) এবং দরূদ শরীফ পড়া উচিত এবং মোনাজাতের সমাপ্তিও দরূদ শরীফ দিয়ে করা উচিত। কারণ উভয় পাশের দরূদ আল্লাহ কবুল করেন, আর আল্লাহর পরম দয়া অনুযায়ী তিনি এর মধ্যবর্তী দোয়াসমূহকেও কবুল করে নেন।
দরূদ ও ক্বাসিদা পাঠের আত্মিক আদব ও নিয়ম
দরূদ শরীফ কেবল মুখে শব্দ উচ্চারণ করা নয়; এটি হলো হৃদয়ের গভীর থেকে বিশ্বনবী (সা.)-এর সুমহান আদর্শ, ত্যাগ ও করুণার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানো। পবিত্র শরীরে, ওজু অবস্থায়, কেবলামুখী হয়ে বিনম্র হৃদয়ে দরূদ পাঠ করলে মন থেকে পার্থিব হতাশা, মানসিক অস্থিরতা ও পাপবোধ দূর হয়ে অন্তরে পরম আত্মিক প্রশান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়।
বিভিন্ন সময়ে দরূদ পাঠের গুরুত্ব
ইসলামে কিছু বিশেষ মুহূর্ত রয়েছে যেখানে দরূদ পাঠের সওয়াব বহুগুণ বৃদ্ধি পায়:
- জুমার দিনে ও রাতে: জুমার দিনে দরূদ পাঠের বিশেষ নির্দেশ রয়েছে, কারণ এই দিনের পঠিত দরূদ সরাসরি নবীজীর রওজা শরীফে পেশ করা হয়।
- আজানের পর: আজান সমাপ্ত হওয়ার পর দরূদ পাঠ করে 'ওয়াসীলাহ'র দোয়া পাঠ করা সুন্নাত।
- মসজিদে প্রবেশের সময়: মসজিদে প্রবেশকালে ও বের হওয়ার সময় দরূদ ও সালাম পাঠ করার দোয়া রয়েছে।
- বিপদ-আপদের সময়: দুশ্চিন্তা ও সংকটের সময় একমনে দরূদ পড়লে মহান আল্লাহ বান্দার দুশ্চিন্তা দূর করে দেন এবং মনের আশা পূর্ণ করেন।