Table of Contents
বাংলাদেশের বিস্তারিত ইতিহাস: সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ ও বিজয়ের গৌরবগাঁথা
div class="separator" style="clear: both; text-align: center;">

একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে জন্ম নেওয়া স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের ইতিহাস সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের এক মহাকাব্য। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর শুরু হওয়া রাজনৈতিক বঞ্চনা, অর্থনৈতিক শোষণ এবং সাংস্কৃতিক নিপীড়নই বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতার পথে ধাবিত করে। চলুন, সেই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, আন্দোলন এবং মুক্তিযুদ্ধের বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরা যাক।
১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হলে পূর্ব বাংলা 'পূর্ব পাকিস্তান' নাম ধারণ করে। জনগণ আশা করেছিল এবার তাদের প্রত্যাশিত স্বাধীনতা আসবে। কিন্তু অল্পদিনের মধ্যেই পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ও অর্থনৈতিক শোষণ শুরু করে। পূর্ব পাকিস্তানের সম্পদে পশ্চিম পাকিস্তানের উন্নয়ন নিশ্চিত করার ব্যবস্থা করা হয়, যা ক্ষোভের জন্ম দেয়।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকেই পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানায়। ১৯৪৮ সালে উর্দুকে একমাত্র সরকারি ভাষা হিসেবে ঘোষণা করলে প্রতিবাদ শুরু হয়। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষার দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ছাত্র-জনতার মিছিলে পুলিশ গুলি চালালে রফিক, সালাম, বরকত, জববারসহ অনেকে শহীদ হন। এই ঘটনা বাঙালি জাতীয়তাবাদকে নতুন মাত্রা দেয় এবং ১৯৫৬ সালে বাংলাকে উর্দুর পাশাপাশি অন্যতম প্রধান জাতীয় ভাষা হিসেবে গ্রহণ করা হয়।
২৫শে মার্চ'৬৯ সামরিক শাসন জারির পর প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক জেনারেল ইয়াহিয়া খান এক ব্যক্তি এক ভোটের নীতিতে সাধারণ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেন। ৭ই থেকে ১৯ই ডিসেম্বর '৭০ এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ জাতীয় পরিষদে ৩১০ আসনের মধ্যে ১৬৭ আসনে জয়লাভ করে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। কিন্তু পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতা হস্তান্তরে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে, যা অনিবার্য সংঘাতের জন্ম দেয়।
নির্বাচনের ফলাফল মেনে না নিয়ে সামরিক শাসক জেনারেল ইয়াহিয়া খান সরকার গঠনে অস্বীকৃতি জানালে বঙ্গবন্ধু ১লা মার্চ ১৯৭১ দেশব্যাপী অসহযোগের আহবান জানান। ২রা মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের পতাকা প্রদর্শিত হয়।
৭ই মার্চ ১৯৭১ বঙ্গবন্ধু রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) সমগ্র বাঙালি জাতিকে দিকনির্দেশনামূলক ভাষণ দেন। এই ভাষণে তিনি সশস্ত্র সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত হতে আহবান জানিয়ে বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করেন:
আলোচনার নামে সময়ক্ষেপণ করে পাকিস্তান সামরিক বাহিনী মাত্র ২২ দিনে দুই ডিভিশন অবাঙালি সৈন্য পূর্ব বাংলায় স্থানান্তর করে। ২৫শে মার্চ ১৯৭১ রাত ১১টায় পাকিস্তান সেনাবাহিনী অতর্কিত আক্রমণের প্রস্ত্ততি নিয়ে সেনানিবাস ত্যাগ করে। তাদের পূর্বপরিকল্পিত এই গণহত্যার নাম ছিল "অপারেশন সার্চলাইট"। ঢাকার পিলখানা, রাজারবাগ পুলিশ লাইন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (বিশেষ করে জহুরুল হক হল ও জগন্নাথ হল) সহ দেশের সমস্ত বড় শহর ও বাঙালি রেজিমেন্টসমূহ আক্রান্ত হয়। ধারণা করা হয়, সেই রাতেই শুধু ঢাকা ও তার আশেপাশে প্রায় এক লক্ষ নিরীহ নর-নারীর জীবনাবসান ঘটে।
২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে (রাত ১২টা ৩০ মিনিট) ধানমন্ডি বাসভবন থেকে বন্দী হবার পূর্বে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসাবে ঘোষণা করেন। এই ঘোষণা চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র থেকে আওয়ামী লীগ নেতা এম. এ হান্নান এবং পরবর্তীতে ২৭ মার্চ ৮ম ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের মেজর জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধুর পক্ষে পাঠ করেন।
মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য রাজনৈতিক নেতৃত্ব একটি কাঠামোগত সরকার গঠন করে এবং সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু হয়।
১০ই এপ্রিল '৭১ নির্বাচিত সাংসদগণ আগরতলায় একত্রিত হয়ে সরকার গঠন করেন। ১৭ই এপ্রিল '৭১ মেহেরপুর মহকুমার বৈদ্যনাথ তলায় এই সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ গ্রহণ করে। স্থানটির নামকরণ করা হয় ‘মুজিব নগর’।
| পদ | দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা |
|---|---|
| রাষ্ট্রপতি | বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান (পাকিস্তানে বন্দী) |
| উপ-রাষ্ট্রপতি (ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি) | সৈয়দ নজরুল ইসলাম |
| প্রধানমন্ত্রী | তাজউদ্দিন আহমেদ |
| অর্থমন্ত্রী | ক্যাপ্টেন মনসুর আলী |
| পররাষ্ট্রমন্ত্রী | খন্দকার মোশতাক আহমেদ |
| স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী | এ এইচ এম কামরুজ্জামান |
স্বাধীনতার সনদ বলে গঠিত এই সরকার মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য সামরিক কাঠামো তৈরি করে।
মুক্তিযোদ্ধা ও অবরুদ্ধ এলাকার জনগণের মনোবল চাঙ্গা রাখতে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ৩০ মার্চ পাকিস্তানি বিমান বাহিনীর আক্রমণে চট্টগ্রামের কেন্দ্রটি ধ্বংস হলেও পরবর্তীতে কলকাতা থেকে এর সম্প্রচার নিয়মিত শুরু হয়। চরমপত্র ছিল এখানকার সবচেয়ে জনপ্রিয় অনুষ্ঠান। এছাড়াও 'জয় বাংলা', 'বাংলাদেশ', 'বঙ্গবাণী' সহ বিভিন্ন সংবাদপত্র বিদেশে বাঙালিদের উদ্যোগে প্রকাশিত হয়।
দেশের ভেতরে পাকিস্তান দখলদার বাহিনীর সহযোগী হিসেবে কিছু সংগঠন কাজ করে, যারা মুক্তিকামী মানুষের উপর জঘন্য অত্যাচার চালায়।
নভেম্বর '৭১ এর প্রথম দিকে মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় মিত্র বাহিনীর সমন্বয়ে সম্মিলিত বাহিনী গঠিত হয়। ৩রা ডিসেম্বর '৭১ পাকিস্তান ভারত আক্রমণ করলে যুদ্ধের মোড় ঘুরে যায় এবং সম্মিলিত বাহিনী চূড়ান্ত আক্রমণে নামে।
এই আত্মসমর্পণ দলিলে স্বাক্ষর করেন পূর্বাঞ্চলের সম্মিলিত বাহিনী প্রধান লেঃ জেনারেল জগজিত সিং অরোরা এবং পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় অধিনায়ক লেঃ জেঃ এ কে নিয়াজী। এই অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধিত্ব করেন মুক্তিবাহিনীর উপ-সেনা প্রধান ও বিমান বাহিনী প্রধান গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ কে খন্দকার।
মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে ৩০ লক্ষ শহীদের আত্মদান এবং ২ লক্ষ ৫০ হাজারের বেশি নারীর সম্ভ্রমের বিনিময়ে বিশ্ব মানচিত্রে জন্ম নেয় স্বাধীন বাংলাদেশ। প্রতি বছর এই দিনটি 'বিজয় দিবস' হিসাবে পালিত হয়।
ইতিহাসের এই মহান অধ্যায় সম্পর্কে আপনার যদি আরও কোনো প্রশ্ন থাকে, তবে অবশ্যই জিজ্ঞাসা করুন।