চিত্র: প্রাচীন প্রথাভিত্তিক সমাজ ও আধুনিক প্রযুক্তি-গণতান্ত্রিক সমাজের কাঠামোগত তুলনামূলক বিশ্লেষণ
সারসংক্ষেপ: সমাজবিজ্ঞানের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে মানব সমাজের দুটি প্রধান বিপরীতমুখী রূপ লক্ষ্য করা যায়—সনাতন সমাজ (Traditional Society) এবং আধুনিক সমাজ (Modern Society)। সনাতন সমাজ যেখানে কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি, অন্ধ লোকবিশ্বাস, বংশানুক্রমিক মর্যাদা ও পারিবারিক রক্তসম্পর্কের ওপর প্রতিষ্ঠিত; আধুনিক সমাজ সেখানে শিল্পায়ন, বিজ্ঞানমনস্ক দৃষ্টিভঙ্গি, ব্যক্তিগত যোগ্যতা, শ্রমবিভাগ এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ওপর ভিত্তিশীল। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্স শেষ পর্ব রাষ্ট্রবিজ্ঞান পরীক্ষার জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন। নিম্নে সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে সনাতন ও আধুনিক সমাজের মৌলিক পার্থক্য এবং ১২টি বিষয়ের পূর্ণাঙ্গ তুলনামূলক টেবিল বিশদভাবে আলোচনা করা হলো।
১. সনাতন ও আধুনিক সমাজের তাত্ত্বিক পটভূমি ও সমাজতাত্ত্বিক প্রত্যয়
মানব সভ্যতার উন্মেষলগ্ন থেকে শুরু করে আঠারো শতকের শিল্প বিপ্লব পর্যন্ত বিশ্বের অধিকাংশ জনপদই সনাতন সমাজের চরিত্র বহন করেছে। সনাতন সমাজ বলতে মূলত সেই প্রথাগত সমাজব্যবস্থাকে বোঝায় যা কঠোরভাবে ঐতিহ্য, দলীয় সংহতি, ধর্মীয় অনুশাসন এবং জীবনধারণভিত্তিক কৃষিকাজের ওপর নির্ভরশীল ছিল। এ সমাজে পরিবর্তন ছিল অত্যন্ত ধীরগতিসম্পন্ন এবং বাহ্যিক নতুন ধ্যানধারণাকে সন্দেহের চোখে দেখা হতো।
অপরদিকে, ইউরোপে রেনেসাঁ, বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার এবং ইংল্যান্ডের শিল্প বিপ্লবের পর এক নতুন সমাজ ব্যবস্থার জন্ম হয়, যাকে সমাজবিজ্ঞানের পরিভাষায় 'আধুনিক সমাজ' বলা হয়। আধুনিক সমাজ মূলত যুক্তিভিত্তিক চিন্তা, নাগরিক স্বাধীনতা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতার মাধ্যমে পরিচালিত হয়।
বিশ্ববিখ্যাত সমাজতাত্ত্বিক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীগণ সনাতন ও আধুনিক সমাজকে বিভিন্ন তাত্ত্বিক ফ্রেমওয়ার্কে বিশ্লেষণ করেছেন:
২. সনাতন সমাজ ও আধুনিক সমাজের মধ্যে ১২টি বিষয়ের প্রামাণ্য তুলনামূলক ছক
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত কলেজসমূহের মাস্টার্স পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর প্রাপ্তির জন্য পরীক্ষার্থীদের জন্য এই তুলনামূলক ছকটি অত্যন্ত কার্যকরী:
| তুলনার বিষয় | সনাতন সমাজ (Traditional Society) | আধুনিক সমাজ (Modern Society) |
|---|---|---|
| ১. অর্থনৈতিক কাঠামো | সম্পূর্ণ কৃষিনির্ভর ও স্বনির্ভর গ্রামীণ অর্থনীতি। উৎপাদনের মূল লক্ষ্য ছিল নিজস্ব জীবনধারণ (Subsistence Economy)। | শিল্প, বাণিজ্য ও উচ্চ প্রযুক্তিনির্ভর বাজার অর্থনীতি। উৎপাদনের মূল লক্ষ্য মুনাফা অর্জন ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য। |
| ২. প্রযুক্তি ও উৎপাদন পদ্ধতি | সনাতন হস্তচালিত সরঞ্জাম, পশুশক্তি ও আবহাওয়া নির্ভর। উদ্ভাবন ও প্রযুক্তির ব্যবহার ছিল সীমিত। | স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রপাতি, বিদ্যুৎ, তথ্যপ্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত বৈজ্ঞানিক উৎপাদন ব্যবস্থা। |
| ৩. সামাজিক স্তরবিন্যাস ও পদমর্যাদা | সামাজিক মর্যাদা নির্ধারিত হতো জন্মসূত্র, বংশমর্যাদা ও জাতপাতের ভিত্তিতে (Ascribed Status)। পরিবর্তনের সুযোগ ছিল না। | সামাজিক মর্যাদা নির্ধারিত হয় ব্যক্তিগত মেধা, শিক্ষা, দক্ষতা ও কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে (Achieved Status)। |
| ৪. পারিবারিক কাঠামো ও আত্মীয়তা | বৃহৎ যৌথ পরিবার এবং পিতৃতান্ত্রিক কঠোর কর্তৃত্ব। রক্তের সম্পর্ক ও আত্মীয়তার বন্ধন ছিল সামাজিক নিরাপত্তার ভিত্তি। | ক্ষুদ্র একক পরিবার (Nuclear Family)। পারিবারিক আত্মীয়তার চেয়ে পেশাগত ও নাগরিক সম্পর্ক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। |
| ৫. শ্রমবিভাগ ও পেশাগত বৈচিত্র্য | শ্রমবিভাগ ছিল নিতান্তই সরল—লিঙ্গ ও বয়স ভিত্তিক। পেশার বৈচিত্র্য ছিল খুবই সীমিত। | জটিল, সুনির্দিষ্ট ও উচ্চমাত্রার বিশেষায়িত শ্রমবিভাগ (Specialization of Labor)। পেশার হাজারো বৈচিত্র্য বিদ্যমান। |
| ৬. শিক্ষা ব্যবস্থা ও বিস্তার | ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও পারিবারিক গণ্ডিতে সীমিত ছিল। নিরক্ষরতার হার ছিল অত্যধিক বেশি। | সার্বজনীন, অবৈতনিক, বাধ্যতামূলক আধুনিক বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষা। উচ্চ সাক্ষরতার হার। |
| ৭. রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও নাগরিক অধিকার | রাজতন্ত্র, সামন্ততন্ত্র বা গোত্রভিত্তিক শাসন। সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক অধিকার ছিল না; তারা ছিল শুধুই প্রজা। | বহুত্ববাদী প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্র, আইনের শাসন, সার্বজনীন ভোটাধিকার এবং মৌলিক মানবাধিকারের নিশ্চয়তা। |
| ৮. সামাজিক ও ভৌগোলিক গতিশীলতা | গতিশীলতা ছিল শূন্যের কোঠায়। মানুষ যে গ্রামে বা সমাজে জন্মাত, সেখানেই আজীবন অতিবাহিত করত। | উচ্চমাত্রার পেশাগত ও আন্তর্জাতিক ভৌগোলিক গতিশীলতা। মানুষ নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী স্থান ও পেশা বদলাতে পারে। |
| ৯. যোগাযোগ ও তথ্যপ্রবাহ | যোগাযোগের মাধ্যম ছিল পায়ে হাঁটা বা পশুবাহিত যান। তথ্য আদান-প্রদান হতো মুখে মুখে ও নিতান্ত ধীরগতিতে। | হাই-স্পিড ইন্টারনেট, স্যাটেলাইট মিডিয়া ও সোশ্যাল নেটওয়ার্ক। চোখের পলকে বিশ্বজুড়ে তথ্যের আদান-প্রদান ঘটে। |
| ১০. আইন ও বিচার ব্যবস্থা | প্রথা, লোকরীতি, ধর্মীয় অনুশাসন এবং গোত্রপ্রধানের স্বেচ্ছাচারী সিদ্ধান্তের ওপর প্রতিষ্ঠিত। | লিখিত সংবিধান, নিরপেক্ষ বিচার বিভাগ, আনুষ্ঠানিক আইন এবং আইনের চোখে সকলের সমতা। |
| ১১. ধর্মীয় প্রভাব ও ধর্মনিরপেক্ষতা | ধর্ম ছিল জীবনের কেন্দ্রবিন্দু। মানুষের দৈনন্দিন আচার-আচরণ থেকে রাষ্ট্র পরিচালনা পর্যন্ত ধর্মের প্রভাব ছিল একচ্ছত্র। | রাষ্ট্র পরিচালনায় ধর্মনিরপেক্ষতা ও আইনের প্রাধান্য। ধর্মকে ব্যক্তিগত বিশ্বাসের বিষয় হিসেবে গণ্য করা হয়। |
| ১২. দৃষ্টিভঙ্গি ও বিশ্বদর্শন | ভাগ্যবাদী, অলৌকিক বিশ্বাসে আস্থাশীল ও অদৃষ্টবাদী (Fatalistic)। নতুন ধারণাকে সহজে গ্রহণ করত না। | যুক্তিবাদী, বিজ্ঞানমনস্ক, বিশ্লেষণাত্মক ও ভবিষ্যৎমুখী। প্রতিটি ঘটনাকে কারণ-ফল দিয়ে বিচার করা হয়। |
৩. পার্থক্যসমূহের গভীর সমাজতাত্ত্বিক মূল্যায়ন
উপরোক্ত তুলনামূলক পর্যালোচনা থেকে এটি স্পষ্ট যে, সনাতন সমাজ ও আধুনিক সমাজের পার্থক্য কেবল কোনো বাহ্যিক পোশাক বা যন্ত্রপাতির পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি মানব চেতনার আমূল পরিবর্তনের বহিঃপ্রকাশ। নিম্নে কয়েকটি মৌলিক রূপান্তরের গভীর মূল্যায়ন তুলে ধরা হলো:
ক. জন্মগত নিয়তি বনাম ব্যক্তিগত কৃতিত্ব
সনাতন সমাজে কোনো ব্যক্তি কোন পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছে, সেটিই নির্ধারণ করত তার ভবিষ্যৎ পেশা, সামাজিক সম্মান ও জীবনসঙ্গী। একজন কৃষকের সন্তান আজীবন কৃষকই থাকত। কিন্তু আধুনিক সমাজের সবচেয়ে বড় বিপ্লব হলো মেধার মুক্তি। এখানে নিম্নবিত্ত পরিবারের কোনো সন্তানও নিজের মেধা ও পরিশ্রমের জোরে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে অধিষ্ঠিত হতে পারে।
খ. গোষ্ঠীকেন্দ্রিকতা বনাম ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ
সনাতন সমাজে সমষ্টিগত স্বার্থ ছিল প্রধান। সমাজের বা গোত্রের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে কোনো ব্যক্তি নিজের সিদ্ধান্ত নিতে পারত না। অন্যদিকে আধুনিক সমাজে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ (Individualism) সর্বোচ্চ মর্যাদা লাভ করেছে। ব্যক্তি স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে পারে, পেশা বেছে নিতে পারে এবং নিজের জীবনধারা নির্ধারণের অধিকার সংরক্ষণ করে।
গ. অন্ধবিশ্বাস বনাম যৌক্তিক দৃষ্টিভঙ্গি
সনাতন সমাজে রোগ-ব্যাধি বা প্রাকৃতিক দুর্যোগকে মনে করা হতো ঈশ্বরের অভিশাপ বা ভাগ্যের লিখন। পক্ষান্তরে আধুনিক সমাজে মানুষ প্রতিটি ঘটনার পেছনে কার্যকারণ সম্পর্ক অনুসন্ধান করে। বৈজ্ঞানিক গবেষণাগার, আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা এবং পরিবেশ বিজ্ঞানের মাধ্যমে মানুষ প্রকৃতির ওপর যৌক্তিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে।
৪. রূপান্তরের ক্রান্তিকাল ও পরিবর্তনশীল সমাজের সেতু
কোনো সনাতন সমাজ একদিনেই আধুনিক সমাজে রূপান্তরিত হতে পারে না। এই দুই প্রান্তের মাঝে একটি দীর্ঘ সময়ের ট্রানজিশনাল বা রূপান্তর পর্ব থাকে, যা সমাজবিজ্ঞানে 'পরিবর্তনশীল সমাজ' নামে পরিচিত। বাংলাদেশসহ বর্তমান বিশ্বের বহু উন্নয়নশীল দেশ এখন ঠিক এই ক্রান্তিকালীন অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে।
এই ক্রান্তিকালীন সামাজিক গতিপ্রকৃতি আরও বিস্তারিত জানার জন্য আমাদের পূর্ববর্তী স্পেশাল হ্যান্ডনোট পরিবর্তনশীল সমাজের বৈশিষ্ট্যসমূহ ও সংকট পড়ুন। একই সাথে সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাস ও আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শিক দ্বন্দ্ব গভীরভাবে বুঝতে আমাদের সম্পর্কিত হ্যান্ডনোট ধর্মনিরপেক্ষতা বনাম ইসলামি মূল্যবোধ অধ্যয়ন করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
মাস্টার্স শেষ পর্ব চূড়ান্ত পরীক্ষা প্রস্তুতি: স্পেশাল মডেল প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন ১: জেমিনশাফট ও গেজেলশাফট প্রত্যয় দুটির প্রবক্তা কে?
উত্তর: জার্মান সমাজবিজ্ঞানী ফার্ডিনান্ড টোনিস (Ferdinand Tönnies)।
প্রশ্ন ২: সনাতন ও আধুনিক সমাজের সংহতির ক্ষেত্রে এমিল ডুর্খেইমের দৃষ্টিভঙ্গি কী?
উত্তর: ডুর্খেইমের মতে সনাতন সমাজ 'যান্ত্রিক সংহতি' (Mechanical Solidarity) এবং আধুনিক সমাজ 'জৈবিক সংহতি' (Organic Solidarity)-এর ওপর প্রতিষ্ঠিত।
প্রশ্ন ৩: সনাতন সমাজে সামাজিক পদমর্যাদা কীভাবে নির্ধারিত হতো?
উত্তর: জন্মসূত্র, বংশ এবং জাতপাতের ভিত্তিতে অর্থাৎ আরোপিত বা জন্মসূত্রে প্রাপ্ত মর্যাদার (Ascribed Status) মাধ্যমে।
প্রশ্ন ৪: আধুনিক সমাজের প্রশাসনিক ব্যবস্থার মূল ভিত্তি কোনটি?
উত্তর: ম্যাক্স ওয়েবারের মতে নিয়মমাফিক ও যৌক্তিক-আইনি কর্তৃত্বের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত আধুনিক আমলাতন্ত্র।
প্রশ্ন ৫: সনাতন সমাজ থেকে আধুনিক সমাজে উত্তরণের প্রধান চালিকাশক্তি কী কী?
উত্তর: আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির আবিষ্কার, শিল্পায়ন, সর্বজনীন শিক্ষা, নগরায়ণ এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের উন্মেষ।
উপসংহার
সার্বিক আলোচনার পরিশেষে বলা যায়, সনাতন সমাজ ও আধুনিক সমাজ হলো মানব সভ্যতার সামাজিক বিবর্তনের দুটি ভিন্ন মাইলফলক। আধুনিক সমাজ মানুষকে অন্ধবিশ্বাস ও দারিদ্র্য থেকে মুক্ত করে জ্ঞান, বিজ্ঞান ও অধিকারের স্বাদ দিয়েছে সত্য; কিন্তু একই সাথে মানুষের মাঝে একাকীত্ব, মানসিক অবসাদ ও ভোগবাদী প্রতিযোগিতাও বৃদ্ধি করেছে। তাই সনাতন সমাজের মানবিক সৌহার্দ্য ও আধুনিক সমাজের বৈজ্ঞানিক যুক্তির এক ভারসাম্যপূর্ণ সমন্বয়ই আজকের দিনে একটি আদর্শ মানবিক সমাজ বিনির্মাণের চাবিকাঠি হতে পারে।