
দ্রুত সারসংক্ষেপ: কোম্পানি নিরীক্ষকের অধিকার ও কর্তব্য সম্পর্কে ১৯৯৪ সালের বাংলাদেশ কোম্পানি আইনের ২১৩ ধারায় সুস্পষ্ট বিধান দেওয়া হয়েছে। একজন নিরীক্ষকের প্রধান আইনি অধিকার হলো যেকোনো সময় হিসাব বহি তল্লাশি করা, পরিচালক ও কর্মকর্তাদের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া এবং বার্ষিক সাধারণ সভায় উপস্থিত থাকা। অন্যদিকে তাঁর বিধিবদ্ধ কর্তব্য হলো শেয়ারহোল্ডারদের উদ্দেশ্যে নিরপেক্ষ আর্থিক প্রতিবেদন দাখিল করা ও অনুসন্ধান চালানো। আইন অনুযায়ী কোম্পানি নিরীক্ষকের অধিকার ও কর্তব্য পালনকারী কোনো নিরীক্ষককে মেয়াদের পূর্বে অপসারণ করতে হলে বিশেষ সাধারণ সভায় বিশেষ প্রস্তাব ও সরকারের পূর্বানুমতি গ্রহণ বাধ্যতামূলক।
সূচিপত্র (Table of Contents)
- ১. কোম্পানি নিরীক্ষকের অধিকার ও কর্তব্য: ১৯৯৪ সালের কোম্পানি আইনের ২১৩ ধারা
- ২. বিধিবদ্ধ আইনি ক্ষমতা অনুযায়ী কোম্পানি নিরীক্ষকের অধিকারসমূহ
- ৩. শেয়ারহোল্ডারদের প্রতি কোম্পানি নিরীক্ষকের কর্তব্য ও দায়িত্বসমূহ
- ৪. কোম্পানি নিরীক্ষকের অধিকার ও কর্তব্য এর তুলনামূলক বিশ্লেষণ ছক
- ৫. কোম্পানি নিরীক্ষকের অধিকার ও কর্তব্য পালনে ব্যর্থতা এবং অপসারণের আইনি পদ্ধতি
- ৬. কোম্পানি নিরীক্ষকের অধিকার ও কর্তব্য নিয়ে সাধারণ প্রশ্নাবলি (FAQ)
একটি যৌথ মূলধনী কোম্পানি পরিচালকদের দ্বারা পরিচালিত হলেও এর প্রকৃত মালিক হলেন সাধারণ শেয়ারহোল্ডাররা। পরিচালকরা যাতে কোম্পানির অর্থ আত্মসাৎ বা অপব্যবহার করতে না পারেন, সেজন্য শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থের পাহারাদার হিসেবে একজন স্বাধীন চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টকে নিরীক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়। নিরীক্ষক যাতে কোনো প্রভাবশালী পরিচালকের ভয়ে বা চাপে নতিস্বীকার না করেন, সেজন্য কোম্পানি আইনে কোম্পানি নিরীক্ষকের অধিকার ও কর্তব্য নিশ্চিত করে তাঁকে ব্যাপক আইনি সুরক্ষা ও ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। নিচে এর বিশদ বিশ্লেষণ তুলে ধরা হলো। আরও শিক্ষামূলক তথ্যের জন্য আমাদের জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্নার ঘুরে আসুন।
১. কোম্পানি নিরীক্ষকের অধিকার ও কর্তব্য: ১৯৯৪ সালের কোম্পানি আইনের ২১৩ ধারা
কোম্পানি আইনের ২১৩ ধারা হলো নিরীক্ষা পেশার মূল আইনি রক্ষাকবচ। এই ধারার আওতায় কোম্পানি নিরীক্ষকের অধিকার ও কর্তব্য সুস্পষ্টভাবে পৃথক করে বর্ণিত হয়েছে, যাতে নিরীক্ষক সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেন। ২১৩(১) ও ২১৩(২) ধারা মোতাবেক একজন কোম্পানি নিরীক্ষক তাঁর দায়িত্ব পালনকালে নিচের বিধিবদ্ধ অধিকারগুলো ভোগ করেন:
২. বিধিবদ্ধ আইনি ক্ষমতা অনুযায়ী কোম্পানি নিরীক্ষকের অধিকারসমূহ
নিরীক্ষা কাজ নির্ভুলভাবে পরিচালনার স্বার্থে আইনপ্রদত্ত প্রধান অধিকারগুলো নিম্নে আলোচনা করা হলো:
- হিসাব বহি ও নথিপত্র পরিদর্শনের অধিকার (Right of Access to Books): নিরীক্ষক যেকোনো সময় কোম্পানির প্রধান কার্যালয় বা যেকোনো শাখায় সংরক্ষিত সমস্ত হিসাব বহি, ভাউচার, চুক্তিপত্র, দলিল-দস্তাবেজ এবং ক্যাশ বই তল্লাশি ও পরিদর্শন করার নিরঙ্কুশ অধিকার রাখেন। কোনো পরিচালক বা কর্মকর্তা এতে বাধা দিতে পারেন না।
- তথ্য ও ব্যাখ্যা চাওয়ার অধিকার (Right to Obtain Information): নিরীক্ষা পরিচালনার স্বার্থে কোম্পানির যেকোনো পরিচালক, ম্যানেজার বা কর্মচারীর নিকট থেকে প্রয়োজনীয় যেকোনো হিসাবসংক্রান্ত তথ্য, উপাত্ত ও স্পষ্টীকরণ চাওয়ার আইনি অধিকার নিরীক্ষকের রয়েছে।
- শাখা কার্যালয়ে প্রবেশের অধিকার (Right to Visit Branch Offices): কোম্পানির যদি কোনো আঞ্চলিক শাখা বা বিদেশে শাখা থাকে, তবে নিরীক্ষক সেখানে সশরীরে প্রবেশ করতে পারেন অথবা শাখার স্থানীয় হিসাবের সত্যায়িত কপি তলব করতে পারেন।
- সাধারণ সভার নোটিশ প্রাপ্তি ও উপস্থিতির অধিকার (Right to Attend AGM): কোম্পানির বার্ষিক সাধারণ সভা (AGM) বা যেকোনো সাধারণ সভার নোটিশ শেয়ারহোল্ডারদের মতো নিরীক্ষকের নিকটও পাঠানো বাধ্যতামূলক। নিরীক্ষক উক্ত সভায় উপস্থিত থাকার এবং অডিট সংক্রান্ত যেকোনো প্রশ্নের সরাসরি ব্যাখ্যা দেওয়ার অধিকার রাখেন।
- বিশেষজ্ঞের মতামত গ্রহণের অধিকার (Right to Seek Expert Opinion): কোনো জটিল আইনগত, প্রকৌশলগত বা সম্পত্তি মূল্যায়নের ক্ষেত্রে নিরীক্ষক কোম্পানির খরচে আইনজীবী বা পেশাদার ভ্যালুয়ারের টেকনিক্যাল পরামর্শ নিতে পারেন।
- পারিশ্রমিক পাওয়ার অধিকার (Right to Remuneration): নিরীক্ষা কার্য সম্পন্ন করার পর নিয়োগের শর্তানুযায়ী চুক্তিমাফিক পারিশ্রমিক ও আনুষঙ্গিক খরচাদি আদায়ের আইনগত অধিকার নিরীক্ষকের রয়েছে।
৩. শেয়ারহোল্ডারদের প্রতি কোম্পানি নিরীক্ষকের কর্তব্য ও দায়িত্বসমূহ
অধিকারের পাশাপাশি কোম্পানি আইন নিরীক্ষকের ওপর কিছু অলঙ্ঘনীয় ও বাধ্যতামূলক দায়িত্ব অর্পণ করেছে। কোম্পানি নিরীক্ষকের অধিকার ও কর্তব্য-এর কর্তব্য অংশটি মূলত শেয়ারহোল্ডারদের বিনিয়োগ সুরক্ষার সাথে সম্পৃক্ত:
- শেয়ারহোল্ডারদের নিকট প্রতিবেদন দাখিলের কর্তব্য (Duty to Report): কোম্পানি আইনের ২১৩(৩) ধারা মোতাবেক নিরীক্ষক লাভ-লোকসান হিসাব ও উদ্বৃত্তপত্র পরীক্ষা করে শেয়ারহোল্ডারদের উদ্দেশ্যে একটি সুস্পষ্ট লিখিত অডিট রিপোর্ট পেশ করতে বাধ্য।
- সুনির্দিষ্ট অনুসন্ধান চালানোর কর্তব্য (Duty of Inquiry): নিরীক্ষককে বিশেষভাবে অনুসন্ধান করতে হয় যে—কোম্পানি কর্তৃক প্রদত্ত ঋণ ও অগ্রিম কোনো ভুয়া বা জামানতবিহীন কি না, ব্যক্তিগত খরচ কোম্পানির হিসাবে দেখানো হয়েছে কি না, এবং শেয়ার ইস্যুর অর্থ যথাযথভাবে ব্যাংকে জমা পড়েছে কি না।
- কোম্পানি আইন মেনে চলার বাধ্যবাধকতা যাচাই: প্রতিষ্ঠানের উদ্বৃত্তপত্র ও লাভ-লোকসান হিসাব কোম্পানি আইন ১৯৯৪-এর তপশিল ১১ এবং আইএফআরএস অনুসারে প্রস্তুত হয়েছে কি না তা নিশ্চিত করা।
- সততা ও পেশাগত গোপনীয়তা রক্ষা: নিরীক্ষা কাজের মাধ্যমে কোম্পানির অভ্যন্তরীণ ব্যবসায়ের যে গোপন সূত্রাবলী নিরীক্ষক জানতে পারেন, তা কোনো তৃতীয় পক্ষের কাছে প্রকাশ না করা এবং পূর্ণাঙ্গ পেশাগত নিরপেক্ষতা বজায় রাখা। বিস্তারিত বিধিমালার জন্য ICAB Code of Ethics দেখুন।
৪. কোম্পানি নিরীক্ষকের অধিকার ও কর্তব্য এর তুলনামূলক বিশ্লেষণ ছক
পরীক্ষার্থীদের সুবিধার্থে কোম্পানি নিরীক্ষকের অধিকার ও কর্তব্য এর মধ্যকার আইনি ও প্রায়োগিক পার্থক্য নিচে একটি ছকে তুলে ধরা হলো:
| তুলনার ক্ষেত্র | নিরীক্ষকের অধিকার (Rights) | নিরীক্ষকের কর্তব্য (Duties) |
|---|---|---|
| আইনি চরিত্র | এটি কাজের সুবিধার জন্য আইনপ্রদত্ত ক্ষমতা বা সুবিধা। | এটি শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থে পালনীয় বাধ্যতামূলক দায়িত্ব। |
| প্রয়োগের স্বাধীনতা | প্রয়োজন না হলে নিরীক্ষক কোনো অধিকার ত্যাগ করতে পারেন। | কর্তব্য কোনো অবস্থাতেই ত্যাগ বা অবহেলা করা যায় না। |
| লঙ্ঘনের ফলাফল | অধিকার খর্ব হলে নিরীক্ষক অডিট রিপোর্টে আপত্তি জানাতে পারেন। | কর্তব্য অবহেলা করলে নিরীক্ষক দেওয়ানি ও ফৌজদারি দণ্ডে দণ্ডিত হন। |
৫. কোম্পানি নিরীক্ষকের অধিকার ও কর্তব্য পালনে ব্যর্থতা এবং অপসারণের আইনি পদ্ধতি
কোনো নিরীক্ষক যদি সততার সাথে কোম্পানি নিরীক্ষকের অধিকার ও কর্তব্য পালন করতে গিয়ে কোম্পানির বড় কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতির রিপোর্ট প্রকাশ করেন, তবে ম্যানেজমেন্ট যাতে তাঁকে অন্যায়ভাবে চাকরিচ্যুত না করতে পারে—সেজন্য অপসারণের ক্ষেত্রে কোম্পানি আইনে কঠোর বিধান রাখা হয়েছে:
১৯৯৪ সালের কোম্পানি আইনের ২১০(৭) ধারা মোতাবেক—কোনো নিরীক্ষককে তাঁর নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার পূর্বে পদচ্যুত করতে হলে:
- কোম্পানির বিশেষ সাধারণ সভায় (EGM) বিশেষ প্রস্তাব (Special Resolution) পাস করতে হবে।
- উক্ত সভার কমপক্ষে ১৪ দিন পূর্বে নিরীক্ষককে লিখিত নোটিশ দিতে হবে এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হবে।
- এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—সরকারের পূর্বানুমোদন (Prior Approval of Government) ব্যতীত মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে কোনো নিরীক্ষককে পদচ্যুত করা সম্পূর্ণ বেআইনি। নিয়মিত আপডেটের জন্য আমাদের HelpTrickBD পোর্টাল ভিজিট করুন।
৬. কোম্পানি নিরীক্ষকের অধিকার ও কর্তব্য নিয়ে সাধারণ প্রশ্নাবলি (FAQ)
প্রশ্ন ১: কোম্পানি নিরীক্ষকের অধিকার ও কর্তব্য অনুযায়ী কোনো কোম্পানির পরিচালক কি ওই কোম্পানির অডিটর হতে পারেন?
উত্তর: না। কোম্পানি আইনের ২১২ ধারা অনুযায়ী কোনো কোম্পানির অফিসার, পরিচালক, কর্মচারী বা তাদের অংশীদার ওই কোম্পানির নিরীক্ষক হিসেবে নিযুক্ত হওয়ার সম্পূর্ণ অযোগ্য।
প্রশ্ন ২: কোম্পানি নিরীক্ষকের অধিকার ও কর্তব্য প্রয়োগে বাধা আসলে অডিটর কী করবেন?
উত্তর: যদি ব্যবস্থাপনা হিসাবের বই দেখতে বাধা দেয়, তবে নিরীক্ষক তাঁর অডিট রিপোর্টে বিষয়টি উল্লেখ করে Disclaimer of Opinion (মতদানে অসম্মতি) জারি করবেন।
