সমাজ সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান ও ভূমিকা

ব্রিটিশ ভারতে সমাজ সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান, বিধবা বিবাহ আইন ও নারী শিক্ষা বিস্তার সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন।

সমাজ সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান ও ভূমিকা

সমাজ সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান ও ভূমিকা

প্রশ্নঃ সমাজ সংস্কারে বিদ্যাসাগরের ভূমিকা লিখ। অথবা, সমাজ সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান সমূহ লিখ।

ভূমিকা

ঊনবিংশ শতকে হিন্দু সমাজে নানা ধরনের কুসংস্কার বিদ্যমান ছিল। এসব কুসংস্কার দূরীকরণে শিক্ষিত বাঙালি মনীষী রাজা রামমোহন রায়ের পরবর্তীতে যিনি বলিষ্ঠভাবে এগিয়ে আসেন, তিনি হলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। মূলত, তাঁর সংস্কার কর্মসূচি ছিল তৎকালীন সামাজিক কুসংস্কারের বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী আন্দোলন।

বস্তুত, হিন্দু সমাজ থেকে কুসংস্কার, কুপ্রথা ও অজ্ঞতা দূরীকরণ এবং বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহ রোধে সমাজ সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান অপরিসীম। তিনি আজীবন নারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং বিধবা বিবাহ আইনসিদ্ধ করার জন্য সংগ্রাম করে গেছেন।

সমাজ সংস্কারে বিদ্যাসাগরের অবদান

রাজা রামমোহন রায়ের পরবর্তীতে সমাজ সংস্কারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। তাঁর এই অসামান্য কর্মপ্রচেষ্টা সমাজকে নতুন আলোর পথ দেখিয়েছিল। নিম্নে তাঁর উল্লেখযোগ্য অবদানসমূহ আলোচনা করা হলো:

১. বিধবা বিবাহ আইনসিদ্ধকরণ

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সামাজিক সংস্কারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো বিধবা বিবাহ আইনসিদ্ধকরণ। তিনি গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন যে, বিধবাদের পুনর্বিবাহের অধিকার প্রদান করা সমাজের নৈতিক দায়িত্ব।

ফলশ্রুতিতে, তিনি বিধবা বিবাহ সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করার জন্য বিভিন্ন পত্রিকায় নিয়মিত প্রবন্ধ রচনা করেন। তিনি ১৮৫৫ সালে সহস্রাধিক স্বাক্ষর সম্বলিত বিধবা বিবাহ আইনসিদ্ধ করার জন্য সরকারের নিকট একটি আবেদনপত্র পেশ করেন। অবশেষে, তাঁর নিরলস প্রচেষ্টায় ১৮৫৬ সালে লর্ড ডালহৌসি বিধবা বিবাহ আইন পাস করেন।

২. বাল্য ও বহুবিবাহের বিরুদ্ধে আন্দোলন

হিন্দু সমাজে প্রচলিত বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহ রোধে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ভূমিকা ছিল অতুলনীয়। তৎকালীন সময়ে হিন্দু সমাজে পুরুষরা অনেক সময় স্ত্রীর সম্পদের লোভে একাধিক কিংবা শতাধিক বিয়ে করতো।

অন্যদিকে, তারা যখন-তখন স্ত্রীদের পরিত্যাগ করতো, যা ছিল অত্যন্ত অমানবিক। এহেন দুরবস্থা দেখে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহ রোধের জন্য তীব্র আন্দোলনের সূচনা করেন। তাঁর এই আন্দোলনের ফলে হিন্দু সমাজে বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহের প্রকোপ অনেকাংশে হ্রাস পায়।

৩. নারী উন্নয়ন ও শিক্ষা বিস্তার

নারীদের সামাজিক উন্নয়নে সমাজ সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান অনস্বীকার্য। তিনি স্পষ্টভাবে বুঝতে পেরেছিলেন যে, নারীদের সার্বিক অগ্রগতি ও মঙ্গল সাধনের জন্য নারী শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই।

তদুপরি, তিনি বিশ্বাস করতেন যে একমাত্র শিক্ষার মাধ্যমেই নারীরা তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হতে পারে। এজন্যই তিনি আজীবন নারী শিক্ষার প্রসারে ব্রতী ছিলেন এবং বেথুন স্কুলের মতো অসংখ্য বিদ্যালয় স্থাপনে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখেন।

উপসংহার

সুতরাং উপরের আলোচনা সাপেক্ষে আমরা বলতে পারি যে, হিন্দু সমাজ থেকে কুসংস্কার, কুপ্রথা ও অজ্ঞতা দূরীকরণে তাঁর ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য। বিশেষ করে বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহ রোধ, বিধবা বিবাহ আইনসিদ্ধকরণ এবং নারীদের সামাজিক উন্নয়নে সমাজ সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

পরীক্ষার প্রস্তুতি ও টিপস

  • প্রশ্ন ধরন ও মান: এটি সাধারণত রচনামূলক (১০ নম্বর) প্রশ্ন হিসেবে আসে। তবে 'বিধবা বিবাহ আইন' সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত টিকা (৪ নম্বর) হিসেবেও আসতে পারে।
  • উত্তর লেখার কৌশল: ভূমিকা দিয়ে শুরু করবেন। এরপর বিধবা বিবাহ, বহুবিবাহ রোধ এবং নারী শিক্ষা—এই তিনটি মূল পয়েন্ট প্যারাগ্রাফ আকারে বিস্তারিত লিখবেন।
  • সতর্কতা: বিধবা বিবাহ আইন পাসের সাল (১৮৫৬) এবং লর্ড ডালহৌসির নাম সঠিকভাবে উল্লেখ করবেন। রাজা রামমোহন রায়ের সাথে যেন বিদ্যাসাগরের অবদান গুলিয়ে না যায়।

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

প্রশ্ন: বিধবা বিবাহ আইন কত সালে পাস হয়?

উত্তর: ১৮৫৬ সালে লর্ড ডালহৌসি বিধবা বিবাহ আইন পাস করেন, যাতে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের প্রধান ভূমিকা ছিল।

প্রশ্ন: ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর কেন স্মরণীয়?

উত্তর: তিনি বাংলা গদ্যের জনক, সমাজ সংস্কারক এবং নারী শিক্ষার অগ্রদূত হিসেবে স্মরণীয়। বিশেষ করে বিধবা বিবাহ প্রচলন তাঁর জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কীর্তি।

প্রশ্ন: বিদ্যাসাগর কোন প্রথার বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলেন?

উত্তর: তিনি কৌলিন্য প্রথা, বাল্যবিবাহ এবং বহুবিবাহ প্রথার বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলেন।

Content Protection & Copyright

If you believe any content on our website infringes your rights, please contact us. We will review and take action promptly.

Post a Comment