সমাজকল্যাণ ও সমাজ সংস্কারে শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হকের অবদান
প্রশ্নঃ সমাজকল্যাণ ও সমাজ সংস্কারে শেরে বাংলা এ. কে ফজলুল হকের অবদান বর্ণনা কর। অথবা, বাংলার কৃষকদের ভাগ্য উন্নয়নে শেরে বাংলার অবদান কি ছিল?
ভূমিকা
ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক বিশাল ব্যক্তিত্ব শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক। রাজনীতি, শিক্ষা এবং নিপীড়িত ও শোষিত জনগণের মুক্তিদাতা হিসেবে শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হকের অবদান অনস্বীকার্য। বস্তুত, তিনি যে অসামান্য কর্মযজ্ঞ রেখে গিয়েছেন, তা বাংলার তথা ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে তাকে অমরত্ব দান করেছে।
সময় কোনো কোনো মানুষকে সৃষ্টি করে, আবার অন্যদিকে কেউ কেউ এক একটি বিশেষ সময়ের জন্য জন্মগ্রহণ করেন। কিন্তু শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক সময়ের চাহিদা অনুযায়ী একজন সাহসী সৈনিকের মতো জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে বুঝতে পেরেছিলেন। ফলে, তিনি তাদের প্রিয় নেতা হিসেবে নিজের শ্রেণিতে অবস্থান করেই স্বীয় ভূমিকা এবং কর্তব্য নির্ধারণ ও পালনে সক্ষম হয়েছিলেন। নিঃসন্দেহে, সমাজ সংস্কারে তার ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য।
শেরে বাংলার কর্মধারা ও আদর্শ
সুদীর্ঘ ঘটনাবহুল জীবনে শেরে বাংলা ফজলুল হক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন। মূলত, তাঁর কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে আদর্শের যে পরিচয় ফুটে ওঠে, সময়ের ধারাবাহিকতায় তাকে প্রধানত চারটি খাতে প্রবহমান দেখতে পাওয়া যায়:
- প্রথমত: তিনি মুসলমানদের শিক্ষা বিস্তারের মাধ্যমে এদেশে একটি মুসলিম মধ্যবিত্ত শ্রেণি গঠনের চেষ্টা চালান।
- দ্বিতীয়ত: তিনি জাতীয়তাবাদী নেতা হিসেবে বাঙালি জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ঘটানোর চেষ্টা করেন।
- তৃতীয়ত: তিনি মহাজনী তথা জমিদারী প্রথা উচ্ছেদের সপক্ষে আন্দোলন গড়ে তোলেন।
- চতুর্থত: তিনি ছিলেন অসাম্প্রদায়িক, অর্থাৎ তিনি সর্বদা সাম্প্রদায়িকতার বিরোধিতা করতেন।
আরও পড়ুন:
১. রাজনীতিতে অবদান ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা
নির্দিষ্ট আদর্শ ও লক্ষ্যকে সামনে রেখে ফজলুল হক রাজনৈতিক জীবন শুরু করেন। মানব স্বাধীনতা ও নিয়মতান্ত্রিক শাসনের প্রতি তাঁর অবিচল আস্থা ছিল। তবে তিনি গভীরভাবে বিশ্বাস করতেন যে, বিদ্যমান শ্রেণিভিত্তিক ব্যবস্থার আমূল সংস্কার ব্যতীত গণতন্ত্র ও স্বাধীনতা সার্থক হতে পারে না। তাছাড়া, তিনি মনে করতেন, মুসলিম সম্প্রদায়কে শিক্ষা ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে পশ্চাৎপদ রেখে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। তিনি ছিলেন গণতন্ত্রের একজন বলিষ্ঠ প্রবক্তা। এ প্রসঙ্গে ফজলুল হকের মতে, গণতন্ত্রের সংজ্ঞা হলো:
"In a democracy the government of the people by the people must be the government of all the people by all the people, not the people."
অর্থাৎ, গণতন্ত্রে জনগণ দ্বারা গঠিত সরকার হতে হবে সকল মানুষের দ্বারা গঠিত সরকার। কারণ, জনগণের একাংশের সরকার প্রকৃত জনগণের সরকার হয় না।
কৃষক রাজনীতি ও নির্বাচন
এছাড়া, এদেশের কৃষকদের মুক্তি ও তাদের রাজনীতি সচেতন করার জন্য তিনি ১৯২২ থেকে ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত কৃষক-প্রজা আন্দোলন সৃষ্টি ও পরিচালনা করেছিলেন। ১৯৩৪ সালে লক্ষীনিরঞ্জন সরকারকে পরাজিত করে তিনি কলিকাতার মেয়র নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে, ১৯৩৫ সালে লক্ষ্ণৌতে অনলবর্ষী উর্দু ভাষায় বক্তৃতার জন্যে তাকে “শেরে বাংলা” উপাধিতে ভূষিত করা হয়। ১৯৩৭ সালে নির্বাচনে জয়ী হয়ে তিনি মন্ত্রিসভা গঠন করেন এবং মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। বিশেষ করে, ১৯৪০ সালে তিনি ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব পেশ করেন।
২. শিক্ষাক্ষেত্রে শেরে বাংলার অবদান
রাজনীতির পাশাপাশি শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক শিক্ষাক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রেখে গেছেন। ১৯২৪ সাল থেকে ১৯৪৩ সাল পর্যন্ত বেশ কয়েকবার মন্ত্রী বা মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন প্রতিবারই তিনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে নিজ দায়িত্বে রেখেছিলেন। উদাহরণস্বরূপ, ১৯০৬ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত "মুসলিম শিক্ষা সম্মেলনের" অন্যতম সংগঠক ছিলেন তিনি। ১৯১২ সালের বঙ্গীয় আইন পরিষদে উত্থাপিত "শিক্ষা পরিকল্পনা বিল" এদেশে শিক্ষা বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন
১৯২৪ সালে ফজলুল হক শিক্ষামন্ত্রী নিযুক্ত হয়ে কলকাতায় ইসলামিয়া কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন এবং মুসলমান ছাত্র-ছাত্রীদের আর্থিক সাহায্য দানের জন্য ”মুসলিম এডুকেশনাল ফান্ড” গঠন করেন। ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তিনি নেতৃস্থানীয় উদ্যোক্তার ভূমিকা পালন করেন। পরবর্তীতে, ১৯৩৭ সালে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী থাকার প্রাক্কালে তিনি মুসলমান মেয়েদের জন্য "লেডী ব্রাবোর্ণ কলেজ" স্থাপন করেন। তাঁর আমলেই স্কুল ও মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড গঠনের বিল আনীত হয়।
কৃষক শ্রমিকদের কল্যাণে ফজলুল হকের অবদান
ব্রিটিশ শাসনামলে শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক কৃষকদের কল্যাণের জন্য বিভিন্ন যুগান্তকারী পদক্ষেপ নেন। মূলত এ কারণেই তাকে কৃষক প্রজাকুলের মুক্তির দূত বলা হয়। কৃষক-শ্রমিকের কল্যাণে তাঁর প্রধান অবদানসমূহ নিচে আলোচনা করা হলো:
১. কৃষক ঋণ আইন পাস
ব্রিটিশ শাসনামলে বাংলার কৃষকরা খাজনা দেয়ার জন্য তাদের সম্পত্তি মহাজনদের কাছে বন্ধক দিয়ে টাকা ধার নিত। মহাজনরা ঐ ঋণের ওপর প্রচুর সুদ চাপাত এবং চক্রবৃদ্ধি হারে এ সুদের হার বাড়াতো, যার ফলে কৃষকরা ঋণ শোধ করতে পারতো না। পরিণামে, মহাজনরা তাদের ভিটেবাড়ি সব গ্রাস করে নিত। তবে, শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হকের প্রচেষ্টায় ১৯১৩ সালের ৪ এপ্রিল কৃষক ঋণ আইন পাস হয়। এর ফলে কৃষকরা জমিদার, জোতদার ও মহাজনদের হাত থেকে মুক্তি পায়।
২. প্রজাস্বত্ব আইন পাস
বাংলার কৃষক শ্রেণি যখন জমিদার, জোতদার ও মহাজনদের অত্যাচার ও শোষণে দিশেহারা, তখন ফজলুল হক ১৯২৮ সালে প্রজাস্বত্ব আইন পাস করেন। পরবর্তীতে ১৯৩৭ সালে এই আইন সংশোধনের মাধ্যমে প্রজাদের স্বত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়।
৩. ঋণ সালিসি বোর্ড
মহাজনদের শোষণ থেকে কৃষকদের রক্ষা করার জন্য ১৯৩৭ সালে তিনি “বঙ্গীয় কৃষি ঋণ আইন” পাস করেন। এর অধীনে ১৯৩৮ সালে ঋণ সালিসি বোর্ড গঠিত হয়, যার মাধ্যমে প্রায় আট কোটি প্রজা ঋণমুক্ত হয়।
৪. জমিদারি উচ্ছেদ আইন পাস
জমিদারদের অত্যাচারের হাত থেকে জনগণকে বাঁচাতে শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক জমিদারি প্রথা উচ্ছেদের প্রাথমিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তাঁর প্রচেষ্টায় ব্রিটিশ সরকার “ফ্লাউড কমিশন” গঠন করে। এই কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে ১৯৫০ সালে জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ আইন পাস হয়।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হকের অবদান এবং তাঁর কর্মময় জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত মানবসেবায় উৎসর্গীকৃত ছিল। তিনি ছিলেন একজন জনদরদী ও হৃদয়বান মানুষ। উল্লেখ্য যে, তাঁর রাজনীতি কখনও হিংসাত্মক বা ষড়যন্ত্রমূলক ছিল না। তিনি বাংলার দুঃস্থ মানুষের সেবায় সর্বদা নিয়োজিত ছিলেন। তাকে মূল্যায়ন করতে গিয়ে বিচারপতি রাধিকা রঞ্জন গুহ যথার্থই বলেন, "ফজলুল হক আমেরিকায় জন্ম নিলে হতেন ওয়াশিংটন। বিলেতে জন্ম নিলে হতেন ডিসরেলী, রাশিয়ায় জন্ম নিলে হতেন লেনিন এবং ফ্রান্সে জন্ম নিলে হতেন রুশো কিংবা নেপোলিয়ন।" এই মহান পুরুষ ১৯৬২ সালে পরলোকগমন করেন।
পরীক্ষার প্রস্তুতি ও টিপস
- প্রশ্ন ধরন ও মান: এই প্রশ্নটি সাধারণত রচনামূলক (১০ নম্বর) হিসেবে পরীক্ষায় আসে। তবে 'ঋণ সালিসি বোর্ড' বা 'প্রজাস্বত্ব আইন' সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত টিকা (৪ নম্বর) হিসেবেও আসতে পারে।
- উত্তর লেখার কৌশল: ভূমিকা দিয়ে শুরু করুন। এরপর রাজনৈতিক, শিক্ষা এবং কৃষক কল্যাণে অবদানগুলো আলাদা প্যারাগ্রাফে পয়েন্ট আকারে লিখুন এবং শেষে উপসংহার দিন।
- সতর্কতা: সালগুলো (১৯১৩, ১৯৩৭, ১৯৪০) সঠিকভাবে লিখবেন। বিশেষ করে ঋণ সালিসি বোর্ড এবং লাহোর প্রস্তাবের সাল যেন ভুল না হয়।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
প্রশ্ন: শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক কেন বিখ্যাত?
উত্তর: তিনি বাংলার কৃষকদের অধিকার আদায়, ঋণ সালিসি বোর্ড গঠন এবং শিক্ষা বিস্তারে অসামান্য অবদানের জন্য বিখ্যাত।
প্রশ্ন: ঋণ সালিসি বোর্ড কত সালে গঠিত হয়?
উত্তর: ১৯৩৮ সালে ঋণ সালিসি বোর্ড গঠিত হয়।
প্রশ্ন: শেরে বাংলা কত সালে লাহোর প্রস্তাব পেশ করেন?
উত্তর: তিনি ১৯৪০ সালে ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব পেশ করেন।
If you believe any content on our website infringes your rights, please contact us. We will review and take action promptly.