বাংলাদেশে শিল্প জাতীয়করণের সমস্যা ও প্রতিবন্ধকতা

Faruk Sir
0

স্বাধীনতার ঠিক পরপরই, ১৯৭২ সালে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশকে পুনর্গঠনের লক্ষ্যে সরকার সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির পথে হাঁটে। ২৬ মার্চ এক অধ্যাদেশের মাধ্যমে দেশের প্রধান প্রধান শিল্পগুলোকে রাষ্ট্রীয় মালিকানায় বা জাতীয়করণ করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল মহৎ—সম্পদের সুষম বণ্টন এবং সাধারণ মানুষের কল্যাণ। কিন্তু পাঁচ দশক পর প্রশ্ন উঠছে, এই জাতীয়করণ কি সত্যিই আমাদের শিল্পের চাকা সচল রাখতে পেরেছে, নাকি এটি অর্থনীতির গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে? আজকের ব্লগে আমরা আলোচনা করব বাংলাদেশে শিল্প জাতীয়করণের সমস্যাগুলো এবং এর পেছনের কারণ নিয়ে।

এক নজরে মূল কথা (Key Takeaways):
  • জাতীয়করণ প্রক্রিয়া ছিল আংশিক এবং অপরিকল্পিত।
  • দলীয়করণ এবং স্বজনপ্রীতি অদক্ষ ব্যবস্থাপনার প্রধান কারণ।
  • প্রতিযোগিতার অভাবে পণ্যের মান ও উৎপাদন কমেছে।
  • আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও সমন্বয়হীনতা রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পের বড় বাধা।

বাংলাদেশে শিল্প জাতীয়করণের প্রধান সমস্যাসমূহ

বাংলাদেশে শিল্প জাতীয়করণের সমস্যা ও প্রতিবন্ধকতা

রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি হওয়ার কথা থাকলেও, বাস্তব চিত্র ভিন্ন। বছরের পর বছর ধরে লোকসান গুনতে থাকা এই প্রতিষ্ঠানগুলোর সংকটের পেছনে বেশ কিছু কাঠামগত ও নীতিগত সমস্যা রয়েছে। নিচে ৮টি প্রধান সমস্যা আলোচনা করা হলো:

১. আংশিক ও অপরিকল্পিত জাতীয়করণ

তৎকালীন সরকার শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার কথা বললেও জাতীয়করণ প্রক্রিয়াটি ছিল অসম্পূর্ণ। বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড হলো কৃষি, অথচ সর্ববৃহৎ এই খাতটি জাতীয়করণের আওতার বাইরে ছিল। ফলে একটি মিশ্র এবং বিভ্রান্তিকর অর্থনৈতিক কাঠামো তৈরি হয়, যা শিল্পের পূর্ণ বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে।

২. সংকীর্ণ দলীয় স্বার্থ ও রাজনীতি

রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো কখনোই রাজনীতির প্রভাবমুক্ত হতে পারেনি। যখন যে সরকার ক্ষমতায় এসেছে, তারা এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করেছে। নিয়োগ, বদলি এবং টেন্ডার প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে যোগ্য নেতৃত্ব উঠে আসতে পারেনি। ক্ষমতার অপব্যবহার এবং স্বজনপ্রীতি শিল্পের স্বাভাবিক উৎপাদনকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করেছে।

৩. ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও প্রণোদনার অভাব

রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে 'লাভ হলে সরকারের, ক্ষতি হলেও সরকারের'—এই মানসিকতা কাজ করে। এখানে ভালো কাজের জন্য কোনো পুরস্কার বা প্রণোদনা নেই, আবার খারাপ কাজের জন্য জবাবদিহিতা নেই। ব্যক্তিগত মালিকানা না থাকায় ব্যবস্থাপক বা শ্রমিকদের মধ্যে নতুন কিছু করার উদ্যোগ (Initiative) দেখা যায় না। ফলে উৎপাদনশীলতা স্থবির হয়ে পড়ে।

৪. দায়িত্বহীন ও অদক্ষ প্রশাসন

অধিকাংশ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পের শীর্ষ পদে আমলা বা দলীয় অনুগতদের বসানো হয়, যাদের শিল্প পরিচালনার কোনো কারিগরি বা ব্যবসায়িক জ্ঞান থাকে না। যোগ্যতা অপেক্ষা আনুগত্যকে প্রাধান্য দেওয়ায় প্রশাসন অদক্ষ হয়ে পড়ে। ফলস্বরূপ, ভুল সিদ্ধান্ত এবং অব্যবস্থাপনার কারণে কোটি কোটি টাকা লোকসান হয়।

৫. বিশেষ পরিস্থিতিতে তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত

১৯৭২ সালের জাতীয়করণ কোনো দীর্ঘমেয়াদী গবেষণার ফল ছিল না, বরং যুদ্ধবিধ্বস্ত পরিস্থিতিতে অবাঙালিদের পরিত্যক্ত শিল্পগুলো রক্ষার জন্য এটি একটি তাৎক্ষণিক বা 'ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত' ছিল। এই তড়িঘড়ি সিদ্ধান্তের ফলে প্রায় ৯২% শিল্প সরকারি নিয়ন্ত্রণে চলে আসে, যা পরিচালনা করার মতো সক্ষমতা তখন প্রশাসনের ছিল না।

৬. ব্যক্তিস্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের সংঘাত

বাংলাদেশ একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, যেখানে ব্যক্তিস্বাধীনতা ও মুক্তবাজার অর্থনীতিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু ঢালাও জাতীয়করণ নীতি ব্যক্তিমালিকানায় ব্যবসা করার অধিকারকে খর্ব করে। পুঁজিবাদী বিশ্বে টিকে থাকতে হলে ব্যক্তিস্বাধীনতাকে মূল্যায়ন করতে হয়, যা জাতীয়করণ নীতির সাথে সাংঘর্ষিক।

বিশেষজ্ঞ মতামত: অর্থনীতিবিদদের মতে, রাষ্ট্র ব্যবসা করার জন্য নয়, বরং ব্যবসার পরিবেশ তৈরি করার জন্য। যখন সরকার নিজেই উৎপাদকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয় এবং প্রতিযোগিতার পথ রুদ্ধ করে, তখন পণ্যের মান কমে যায় এবং দুর্নীতি বাড়ে।

৭. প্রতিযোগিতার অভাব ও মান নিয়ন্ত্রণ

ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে টিকে থাকার জন্য সর্বদা পণ্যের মান উন্নয়ন ও খরচ কমানোর প্রতিযোগিতা থাকে। এতে ভোক্তারা লাভবান হয়। কিন্তু রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পে একচেটিয়া আধিপত্য থাকায় প্রতিযোগিতার কোনো বালাই নেই। ফলে অদক্ষতা, দুর্নীতি এবং নিম্নমানের পণ্য উৎপাদনের সংস্কৃতি গড়ে ওঠে, যা শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটিকে রুগ্ন শিল্পে পরিণত করে।

৮. সমন্বয়হীনতা ও দীর্ঘসূত্রিতা

রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পগুলো সাধারণত মন্ত্রণালয়, সেক্টর কর্পোরেশন এবং শিল্প ইউনিট—এই তিন স্তরে বিভক্ত থাকে। সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে এই তিন স্তরের মধ্যে তীব্র সমন্বয়হীনতা দেখা যায়। আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে ছোটখাটো সিদ্ধান্ত নিতেও মাসের পর মাস সময় লেগে যায়, যা ব্যবসায়িক গতিশীলতা নষ্ট করে।

উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, জাতীয়করণের মূল লক্ষ্য জনকল্যাণ হলেও বাংলাদেশে বাস্তবায়নের ত্রুটি এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে তা কাঙ্ক্ষিত সুফল বয়ে আনতে পারেনি। দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা এবং অদক্ষতার ভারে রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পগুলো আজ ধুঁকছে। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্বার্থে এই লোকসানি প্রতিষ্ঠানগুলোকে হয় লাভজনক করার জন্য কঠোর সংস্কার করতে হবে, অথবা বিরাষ্ট্রীয়করণের মাধ্যমে বেসরকারি খাতের হাতে ছেড়ে দিতে হবে।

Post a Comment

0 Comments

Post a Comment (0)

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Check Out
Ok, Go it!