নারীকে বলা হয় 'অর্ধেক আকাশ', কিন্তু সেই আকাশেই যখন মেঘ জমে, তখন জন্ম নেয় ঝড়। বাংলাদেশের নারী আন্দোলনের ইতিহাস কোনো শান্ত নদীর স্রোত নয়, বরং এটি বঞ্চনা আর শোষণের বিরুদ্ধে এক ধারাবাহিক প্রতিরোধ। ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন থেকে ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ—সবখানেই নারীর অংশগ্রহণ ছিল প্রত্যক্ষ। কিন্তু স্বাধীন দেশে আজও নারীকে লড়তে হচ্ছে তার মৌলিক অস্তিত্ব টিঁকে রাখার জন্য। আজকের ব্লগে আমরা দেখব, কেন এদেশের নারীরা বারবার রাজপথে নামতে বাধ্য হন এবং তাদের আন্দোলনের মূল ভিত্তিগুলো আসলে কোথায় প্রোথিত।

আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু: আইন ও স্বীকৃতি
বাংলাদেশের নারী আন্দোলনের বর্তমান রূপরেখা বিশ্লেষণ করলে দুটি প্রধান স্তম্ভ বা প্রত্যয় চোখে পড়ে। আন্দোলনকারীরা মনে করেন, এই দুটি আইনি কাঠামো পরিবর্তন ছাড়া নারীর প্রকৃত মুক্তি অসম্ভব।
- অভিন্ন পারিবারিক আইন (Uniform Family Code): রাষ্ট্রে ফৌজদারি আইন সবার জন্য এক হলেও, পারিবারিক আইন ধর্মের ভিত্তিতে ভিন্ন। এর ফলে বিবাহ, বিচ্ছেদ ও উত্তরাধিকার সম্পত্তিতে নারীরা চরম বৈষম্যের শিকার হন। নারী আন্দোলনের অন্যতম দাবি হলো, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল নারীর জন্য রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে একটি অভিন্ন ও সমঅধিকারভিত্তিক পারিবারিক আইন প্রণয়ন করা।
- CEDAW বাস্তবায়ন: জাতিসংঘের নারী বৈষম্য বিলোপ সনদ (CEDAW)-এর কিছু ধারা বাংলাদেশ সরকার সংরক্ষণ সহ স্বাক্ষর করেছে। আন্দোলনের দাবি হলো, কোনো শর্ত ছাড়াই এই সনদের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন করতে হবে।
সংগ্রামের ক্ষেত্রসমূহ (Battlegrounds)
নারীর জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রই যেন এক একটি যুদ্ধক্ষেত্র। পারিবারিক গণ্ডি থেকে কর্মস্থল—কোথাও তাদের লড়াই থামেনি। প্রধান ইস্যুগুলোকে আমরা তিনটি ভাগে ভাগ করতে পারি: এই লড়াই কখনো নীরব, কখনো প্রকাশ্য—কিন্তু প্রতিটি ক্ষেত্রেই গভীর।
একজন নারী সারা দিন সংসারে যে শ্রম দেন, জিডিপিতে তার কোনো হিসাব নেই। তাকে 'বেকার' তকমা দেওয়া হয়। কর্মক্ষেত্রেও চিত্রটি ভিন্ন নয়। পোশাক শিল্পে লাখ লাখ নারী শ্রমিক দেশের অর্থনীতি সচল রাখলেও তাদের চাকরির নিরাপত্তা নেই। ট্রেড ইউনিয়নে তাদের কণ্ঠস্বর রোধ করা হয় এবং পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার কারণে সমকাজে সমমজুরি থেকেও তারা বঞ্চিত।
প্রাথমিক শিক্ষায় নারীর অংশগ্রহণ বাড়লেও বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতে তারা এখনো পিছিয়ে। পাঠ্যপুস্তকে নারীকে এখনো গতানুগতিক ভূমিকায় উপস্থাপন করা হয়, যা শিশুকাল থেকেই জেন্ডার বৈষম্য তৈরি করে। এছাড়া শিক্ষাখাতে নারীদের জন্য বাজেট বরাদ্দ ও গবেষণা কেন্দ্রের অভাব একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
নারী আন্দোলনের সবচেয়ে জ্বলন্ত ইস্যু হলো নিরাপত্তা। বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে ধর্ষণ, এসিড নিক্ষেপ এবং ফতোয়ার নামে নির্যাতন দিন দিন বাড়ছে। পুলিশি হেফাজতে নারীর নিরাপত্তা এবং ভিকটিম ব্লেমিং (Victim Blaming) বন্ধের দাবিতে নারীরা বারবার সোচ্চার হয়েছেন।
এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত জানতে পড়ুন: নারী নির্যাতন: সংজ্ঞা, কারণ ও প্রভাব
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট: স্বাস্থ্য ও রাজনীতি (Local Context)
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে স্বাস্থ্য ও রাজনীতি—উভয় ক্ষেত্রেই নারীর অবস্থান এখনো নড়বড়ে। স্বাস্থ্যখাতে প্রসূতি মৃত্যুহার কমলেও নারীদের পুষ্টিহীনতা এবং প্রজনন স্বাস্থ্যের বাইরের সমস্যাগুলো অবহেলিত। অনেক ক্ষেত্রে পরিবার পরিকল্পনার নামে নারীর ওপর একতরফাভাবে জন্মনিরোধক পদ্ধতি চাপিয়ে দেওয়া হয়।
রাজনীতিতে নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসন রাখা হয়েছে, কিন্তু সরাসরি নির্বাচনে মনোনয়ন দেওয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর অনীহা স্পষ্ট। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণ না বাড়লে প্রকৃত ক্ষমতায়ন সম্ভব নয়।
বিশেষজ্ঞ মতামত: মানবাধিকার কর্মীদের মতে, নারী আন্দোলনকে সফল করতে হলে কেবল আইন পরিবর্তন যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির আমূল পরিবর্তন। যতক্ষণ সমাজ নারীকে 'মানুষ' হিসেবে না দেখবে, ততক্ষণ এই লড়াই চলবে।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের নারী আন্দোলন কেবল কিছু দাবি-দাওয়ার ফর্দ নয়, এটি একটি শোষণমুক্ত সমাজ গড়ার অঙ্গীকার। নারীরা আজ তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন। তারা আর করুণা চায় না, চায় অধিকার। রাষ্ট্র যখন CEDAW সনদ এবং অভিন্ন পারিবারিক আইনের পূর্ণ বাস্তবায়ন করবে, সেদিনই এই দীর্ঘ সংগ্রাম ইতিহাসের নয়, বাস্তবতার অংশ হয়ে উঠবে।