শিশুর মানসিক বিকাশ: খেলার সাথী ও বন্ধুদের প্রভাব নিয়ে সতর্কবার্তা

Faruk Sir
0

আপনার সন্তান কি সবার সাথে মিশতে ভয় পায়? কিংবা সারাদিন ঘরের কোণে একা বসে স্মার্টফোনে গেম খেলতে পছন্দ করে? বর্তমান যুগে অনেক অভিভাবকেরই প্রধান দুশ্চিন্তার কারণ হলো সন্তানের অসামাজিক আচরণ বা সামাজিকীকরণের অভাব। আমরা অনেক সময় ভুলে যাই যে, পুঁথিগত বিদ্যার চেয়েও শিশুকে 'মানুষ' হিসেবে গড়ে তোলার জন্য যা বেশি প্রয়োজন, তা হলো তার সমবয়সী বন্ধু বা খেলার সাথী (Peer Group)। আজকের ব্লগে আমরা আলোচনা করব, কেন শিশুর বিকাশে খেলার সাথী অপরিহার্য এবং কীভাবে এটি শিশুর একাকীত্বের সমাধান হতে পারে।

এক নজরে মূল কথা (Key Takeaways):
  • পরিবারের বাইরে শিশুর প্রথম সমাজ হলো তার খেলার সাথীরা।
  • বন্ধুদের সাথে মিশলে শিশু নেতৃত্ব ও সহযোগিতার মনোভাব অর্জন করে।
  • শহুরে একাকীত্ব বা 'ভার্চুয়াল আসক্তি' কাটাতে পিয়ার গ্রুপের বিকল্প নেই।
  • সমবয়সীদের মাধ্যমেই শিশু গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও অধিকার সচেতনতা শেখে।
শিশুর মানসিক বিকাশ: খেলার সাথী ও বন্ধুদের প্রভাব নিয়ে সতর্কবার্তা

সমস্যা ও সমাধান: পিয়ার গ্রুপের ধারণা

সামাজিকীকরণ একটি জীবনব্যাপী প্রক্রিয়া। পরিবার শিশুকে নীতি-নৈতিকতা শেখায় ঠিকই, কিন্তু বাইরের জগতের কঠিন বাস্তবতার সাথে পরিচয় করিয়ে দেয় তার বন্ধুরা। সমাজবিজ্ঞানের ভাষায়, সমবয়সী বা একই মানসিকতার শিশুদের দলকে 'Peer Group' বলা হয়। যখন শিশু দেখে যে তার বন্ধুরা নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলছে, তখন সে-ও সেই নিয়মে অভ্যস্ত হতে শুরু করে। এটি তাকে সামাজিকীকরণের মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনে।

সামাজিকীকরণে খেলার সাথীর ভূমিকা

অনেকেই মনে করেন বন্ধুরা শিশুকে বখে নিয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সঠিক পিয়ার গ্রুপ শিশুর ব্যক্তিত্ব গঠনে জাদুকরী ভূমিকা রাখে। নিচে এর প্রধান প্রভাবগুলো আলোচনা করা হলো:

  • নেতৃত্বের গুণাবলি (Leadership): খেলার মাঠে কে আগে ব্যাট করবে বা দল কীভাবে সাজানো হবে—এই সিদ্ধান্তগুলো শিশুরাই নেয়। এর মাধ্যমে তাদের মধ্যে ছোটবেলা থেকেই নেতৃত্বের বীজ রোপিত হয়।
  • সহনশীলতা ও অভিযোজন: বন্ধুদের সাথে ঝগড়া হবেই। কিন্তু সেই ঝগড়া মিটিয়ে আবার গলায় গলা মিলিয়ে খেলা—এভাবেই শিশু শেখে কীভাবে অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হয় এবং পরিস্থিতির সাথে খাপ খাওয়াতে হয়।
  • গণতান্ত্রিক শিক্ষা: খেলার সাথীদের মধ্যে কেউ বড় বা ছোট নয়, সবাই সমান। এই সমতা শিশুকে নিজের অধিকার আদায় এবং অন্যের অধিকার রক্ষার শিক্ষা দেয়।

বিশেষজ্ঞ মতামত: বিখ্যাত মনোবিজ্ঞানী জঁ পিয়াজে (Jean Piaget)-এর মতে, সমবয়সীদের সাথে মিথস্ক্রিয়া শিশুর নৈতিক বিকাশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বড়দের সাথে সম্পর্ক থাকে কর্তৃত্বপরায়ণ, কিন্তু বন্ধুদের সাথে সম্পর্ক থাকে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সমতার ভিত্তিতে।

তুলনামূলক চিত্র: পরিবার বনাম খেলার সাথী

শিশুর বিকাশে পরিবার ও খেলার সাথী—উভয়ের ভূমিকাই গুরুত্বপূর্ণ, তবে এদের কাজের ক্ষেত্র ভিন্ন। নিচের ছকে এই পার্থক্য তুলে ধরা হলো:

বিষয় পরিবারের ভূমিকা খেলার সাথীর ভূমিকা
সম্পর্কের ধরন স্নেহ, শাসন ও অসম সম্পর্ক (বড়-ছোট)। সমতা, বন্ধুত্ব ও মুক্ত সম্পর্ক।
শিক্ষার মাধ্যম উপদেশ ও নির্দেশ। মিথস্ক্রিয়া ও অভিজ্ঞতা।
ফলাফল নৈতিকতা ও নিরাপত্তা বোধ। সামাজিক দক্ষতা ও আত্মবিশ্বাস।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট: শহুরে সংকট ও একাকী শৈশব

আমাদের দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে, বিশেষ করে ঢাকা বা চট্টগ্রামের মতো বড় শহরগুলোতে শিশুদের সামাজিকীকরণ একটি বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। গ্রামের শিশুরা এখনো দলবেঁধে পুকুরে সাঁতার কাটে, গোল্লাছুট খেলে বা ঘুড়ি ওড়ায়, যা তাদের সমাজকল্যাণমূলক ও সহযোগিতামূলক মানসিকতা তৈরিতে প্রাকৃতিকভাবে সাহায্য করে। কিন্তু শহরের চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং বেশ করুণ।

শহুরে জীবনের কিছু নির্মম বাস্তবতা শিশুদের খেলার সাথী থেকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে:

  • খেলার মাঠের অভাব: অপরিকল্পিত নগরায়নের ফলে শহরে খেলার মাঠ নেই বললেই চলে। ফলে শিশুরা চার দেয়ালে বন্দি থাকতে বাধ্য হচ্ছে।
  • ফ্ল্যাট কালচার ও নিরাপত্তা উদ্বেগ: নিরাপত্তার অভাবে বা প্রতিবেশীদের সাথে সুসম্পর্ক না থাকায় অনেক অভিভাবক সন্তানকে বাইরে ছাড়তে ভয় পান। ফলে পাশের ফ্ল্যাটে সমবয়সী শিশু থাকলেও তাদের মধ্যে বন্ধুত্ব গড়ে উঠছে না।
  • অতিরিক্ত পড়ার চাপ: স্কুল, কোচিং আর প্রাইভেট টিউটরের চাপে শিশুদের হাতে খেলার জন্য কোনো সময় থাকছে না। তাদের শৈশব এখন বইয়ের ব্যাগে চাপা পড়ে গেছে।
  • ডিজিটাল আসক্তি: খেলার সাথীর অভাব পূরণ করতে গিয়ে শিশুরা স্মার্টফোন, ইউটিউব বা ভিডিও গেমের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ছে। এর ফলে তৈরি হচ্ছে 'ভার্চুয়াল অটিজম', সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, বিষণ্নতা এবং অসহিষ্ণুতা।

মনোবিজ্ঞানীদের মতে, এই যান্ত্রিক জীবনযাপনের ফলে শহরের শিশুরা ক্রমশ আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছে। বাস্তব বন্ধুদের সাথে মেশার সুযোগ না পাওয়ায় তাদের মধ্যে সহমর্মিতা ও অভিযোজন ক্ষমতার ঘাটতি দেখা দিচ্ছে, যা তাদের ভবিষ্যৎ সামাজিক জীবনের জন্য হুমকিস্বরূপ।

উপসংহার

পরিশেষে, শিশুর সুস্থ মানসিক বিকাশের জন্য শুধু ভালো স্কুল বা দামি খেলনাই যথেষ্ট নয়। তাকে মানুষের সাথে মিশতে দিন। খেলার সাথী বা বন্ধুদের মাধ্যমেই সে শিখবে সহযোগিতা, প্রতিযোগিতা এবং সহমর্মিতা। প্রযুক্তি নির্ভরতা কমিয়ে আমাদের উচিত শিশুদের জন্য একটি সুস্থ ও সামাজিক পরিবেশ নিশ্চিত করা।

Post a Comment

0 Comments

Post a Comment (0)

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Check Out
Ok, Go it!