জনসংখ্যার পরিবর্তন কী? (Concept of Population Change)

সহজ কথায়, কোনো নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে নির্দিষ্ট কোনো স্থানের জনসংখ্যার পরিমাণগত পরিবর্তনকেই জনসংখ্যার পরিবর্তন বলা হয়। এই পরিবর্তন হতে পারে ধনাত্মক (বৃদ্ধি) অথবা ঋণাত্মক (হ্রাস)। জনসংখ্যা রাষ্ট্র ও অর্থনীতির অন্যতম প্রধান সম্পদ, তাই এর পরিবর্তনের গতিপ্রকৃতি বোঝা যেকোনো দেশের পরিকল্পনার জন্য অত্যন্ত জরুরি।
জনসংখ্যা পরিবর্তনের প্রধান ৩টি নিয়ামক
জনবিজ্ঞানীদের মতে, জনসংখ্যা পরিবর্তনের পেছনে অনেক কারণ থাকলেও মূলত তিনটি প্রধান উপাদান বা নিয়ামক এর গতিপথ নির্ধারণ করে। এগুলো হলো: প্রজননশীলতা, মরণশীলতা এবং স্থানান্তর। নিচে ছকের মাধ্যমে এদের ধারণা দেওয়া হলো।
এক নজরে পরিবর্তনের নিয়ামকসমূহ
| নিয়ামক | মূল কাজ | ফলাফল |
|---|---|---|
| প্রজননশীলতা (Fertility) | নতুন শিশু জন্মদান। | জনসংখ্যা বৃদ্ধি করে। |
| মরণশীলতা (Mortality) | জীবনের অবসান। | জনসংখ্যা হ্রাস করে। |
| স্থানান্তর (Migration) | এক স্থান থেকে অন্য স্থানে গমন। | ভারসাম্য পরিবর্তন করে। |
১. প্রজননশীলতা (Fertility)
প্রজননশীলতা হলো কোনো নারীর সন্তান জন্মদানের সক্ষমতা বা ক্ষমতা। জনবিজ্ঞানের ভাষায়, নারী বা নারী সমষ্টির জীবিত সন্তান জন্মদানের প্রকৃত সংখ্যাকেই প্রজননশীলতা বলা হয়। জাতিসংঘের "The Determinants and Consequences of Population Trends" গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে, জন্মনিয়ন্ত্রণ ছাড়া প্রজননকে স্বাভাবিক প্রজনন এবং জন্মনিয়ন্ত্রণসহ প্রজননকে নিয়ন্ত্রিত প্রজনন বলা হয়। যদি কোনো দেশে মৃত্যুহার ও অভিবাসন স্থির থাকে, তবে উচ্চ প্রজননশীলতা সরাসরি জনসংখ্যা বৃদ্ধি করে।
আরও পড়ুন: বাংলাদেশের মৌলিক অর্থনীতির বৈশিষ্ট্য, সমস্যা ও সমাধান
২. মরণশীলতা (Mortality)
মানুষের জীবনের স্বাভাবিক নিঃশেষ হয়ে যাওয়াকে মরণশীলতা বলে। এটি জনসংখ্যা হ্রাসের প্রধান কারণ। যদি কোনো দেশের জন্মহার স্থির থাকে কিন্তু মৃত্যুহার কমে যায় (চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নতির ফলে), তবে সেখানে জনসংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাবে। বিপরীতভাবে, মহামারি বা যুদ্ধবিগ্রহের কারণে মরণশীলতা বেড়ে গেলে জনসংখ্যা হ্রাস পায়। বর্তমানে উন্নত দেশগুলোতে মৃত্যুহার কম হওয়ায় জনসংখ্যার গড় আয়ু বাড়ছে।
৩. নীট স্থানান্তর বা অভিগমন (Net Migration)
স্থানান্তর বা মাইগ্রেশন হলো জনসংখ্যা পরিবর্তনের তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। যখন মানুষ স্থায়ীভাবে এক দেশ থেকে অন্য দেশে চলে যায়, তখন তাকে আন্তর্জাতিক স্থানান্তর বলে। কোনো নির্দিষ্ট সময়ে একটি দেশে কতজন মানুষ প্রবেশ করল (Immigration) এবং কতজন চলে গেল (Emigration)—এই দুইয়ের পার্থক্যকেই নীট স্থানান্তর (Net Migration) বলা হয়। নীট স্থানান্তর ধনাত্মক হলে জনসংখ্যা বাড়ে, আর ঋণাত্মক হলে কমে।
আরও পড়ুন: রাষ্ট্রের সংজ্ঞা, উপাদান ও লক্ষ্য-উদ্দেশ্য: পূর্ণাঙ্গ আলোচনা
বিশেষজ্ঞ মতামত: বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ ম্যালথাসের জনসংখ্যা তত্ত্ব অনুযায়ী, জনসংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়ে কিন্তু খাদ্য উৎপাদন বাড়ে গাণিতিক হারে। তাই প্রজননশীলতা নিয়ন্ত্রণ না করলে ভবিষ্যতে প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে জনসংখ্যা পরিবর্তন (Local Context)
বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। আমাদের দেশে জনসংখ্যা পরিবর্তনের ক্ষেত্রে প্রজননশীলতা ও মরণশীলতার প্রভাবই সবচেয়ে বেশি। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশে শিশুমৃত্যুর হার কমেছে এবং গড় আয়ু বেড়েছে, যার ফলে জনসংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে বর্তমানে জন্মনিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম সফল হওয়ার কারণে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কিছুটা নিম্নমুখী।
এছাড়া, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক স্থানান্তর বা রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের বিদেশ গমন জনসংখ্যার কাঠামোতে কিছুটা প্রভাব ফেললেও, মোট জনসংখ্যার হ্রাসে এর ভূমিকা খুব বেশি বড় নয়। বরং এটি আমাদের অর্থনীতির চাকাকে সচল রেখেছে। (সূত্র: উইকিপিডিয়া)
আরও পড়ুন: রেমিট্যান্স কী? অর্থনীতিতে গুরুত্ব ও প্রবাসীদের সমস্যা
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, জনসংখ্যা কোনো স্থির বিষয় নয়। প্রজননশীলতা, মরণশীলতা এবং স্থানান্তর—এই তিনটি প্রধান নিয়ামক প্রতিনিয়ত কোনো দেশের জনসংখ্যার আকার ও গঠন পরিবর্তন করে চলেছে। বর্তমান সময়ে চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নতির ফলে মৃত্যুহার কমেছে, তাই জনসংখ্যা পরিবর্তনের হার নিয়ন্ত্রণে রাখা যেকোনো দেশের টেকসই উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য।