পরিবেশ কাকে বলে? পরিবেশের উপাদান ও শ্রেণিবিভাগ সমূহ

Faruk Sir
0

সকালে ঘুম থেকে ওঠা থেকে রাতে ঘুমানো পর্যন্ত—আমরা যা কিছু দেখি, অনুভব করি বা ব্যবহার করি, তার সবই আমাদের পরিবেশের অংশ। কিন্তু আমরা কি জানি পরিবেশ আসলে কত প্রকার এবং এটি কীভাবে আমাদের মানসিক ও শারীরিক বিকাশকে নিয়ন্ত্রণ করে? শুধু গাছপালা বা নদীনালাই পরিবেশ নয়, আমাদের সমাজ ও সংস্কৃতিও এর অন্তর্ভুক্ত। আজকের ব্লগে আমরা জানব পরিবেশ কাকে বলে, এর উপাদানসমূহ এবং শ্রেণিবিভাগ সম্পর্কে বিস্তারিত।

পরিবেশের উপাদান ও শ্রেণিবিভাগ

পরিবেশ কাকে বলে? (Definition of Environment)

সহজ কথায়, আমাদের চারপাশে যা কিছু আছে তা নিয়েই পরিবেশ গঠিত। তবে ব্যাপক অর্থে, পরিবেশ হলো বস্তুগত ও অবস্তুগত, দৃশ্যমান ও অদৃশ্যমান সব উপাদানের সমষ্টি যা কোনো ব্যক্তির জীবনযাত্রা, আচরণ এবং বিকাশকে প্রভাবিত করে। পৃথিবী ও ওজোনস্তরের সব উপাদান মিলে যে পারিপার্শ্বিক অবস্থা তৈরি করে, তাকেই পরিবেশ (Environment) বলা হয়।

শব্দগত উৎপত্তি: পরিবেশের ইংরেজি প্রতিশব্দ 'Environment'। এটি ফরাসি শব্দ 'Environ' থেকে এসেছে, যার অর্থ 'চারপাশ' বা 'বেষ্টন করা' (Encircle)। অর্থাৎ, জীবকে যা কিছু বেষ্টন করে আছে, তাই তার পরিবেশ। (সূত্র: উইকিপিডিয়া)

বিভিন্ন বিজ্ঞানীদের মতে পরিবেশের সংজ্ঞা

বিভিন্ন সমাজবিজ্ঞানী ও পরিবেশ বিজ্ঞানী পরিবেশকে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে সংজ্ঞায়িত করেছেন। নিচে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য সংজ্ঞা তুলে ধরা হলো:

  • ম্যাকাইভার ও পেজ-এর মতে: "সার্বিক বিবেচনায় আমাদের বাসস্থানই আমাদের পরিবেশ।"
  • উইলিয়াম পি. স্কট-এর মতে: "পরিবেশ হচ্ছে এমন একটি সামাজিক অবস্থা যা ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর আচরণকে উদ্দীপ্ত ও প্রভাবিত করে।"
  • ডগলাস ও হল্যান্ড-এর মতে: "যেসব বাহ্যিক শক্তি ও অবস্থা মানুষের স্বভাব, আচরণ ও দৈহিক বিকাশ প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করে, সেগুলোর সমষ্টিকে পরিবেশ বলে।"
  • ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী-এর মতে: "যেসব অবস্থা ও বস্তু জীবসত্তাকে প্রভাবিত করে তাকে পরিবেশ বলে।"

পরিবেশের উপাদানসমূহ (Elements of Environment)

পরিবেশের উপাদানগুলোকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা যায়: প্রাকৃতিক উপাদান ও সামাজিক উপাদান। নিচে ছকের মাধ্যমে তা দেখানো হলো।

এক নজরে পরিবেশের উপাদান

উপাদান বিবরণ উদাহরণ
প্রাকৃতিক উপাদান প্রকৃতি প্রদত্ত সব উপাদান। মাটি, পানি, বায়ু, সূর্য, গাছপালা।
সামাজিক উপাদান মানুষের তৈরি সমাজ ও সংস্কৃতি। ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, প্রথা, মূল্যবোধ।

১. প্রাকৃতিক উপাদান (Natural Elements)

প্রকৃতি থেকে যেসব উপাদান পাওয়া যায়, তা নিয়ে প্রাকৃতিক পরিবেশ গঠিত। এটি মানুষের জীবনযাত্রার ওপর প্রত্যক্ষ প্রভাব ফেলে। প্রাকৃতিক উপাদানকে আবার দুই ভাগে ভাগ করা যায়:

  • জৈব উপাদান (Biotic): যাদের জীবন আছে। যেমন—প্রাণী, গাছপালা ও অণুজীব।
  • অজৈব উপাদান (Abiotic): প্রাণহীন সব উপাদান। যেমন—মাটি, পানি, বায়ু, পাহাড়-পর্বত ও সূর্যালোক।

আরও পড়ুন: বাংলাদেশের মৌলিক অর্থনীতির বৈশিষ্ট্য, সমস্যা ও সমাধান

২. সামাজিক উপাদান (Social Elements)

মানুষের জীবনধারণের জন্য তৈরি সব উপাদান নিয়ে সামাজিক পরিবেশ গঠিত। পুরো সমাজটাই একটি পরিবেশ। এই পরিবেশ মানুষের দৈহিক ও অর্থনৈতিক জীবনের ওপর প্রভাব বিস্তার করে। সামাজিক পরিবেশ তিনটি প্রধান উপাদানে বিভক্ত:

  • অর্থনৈতিক পরিবেশ: ঘরবাড়ি, জমিজমা, কলকারখানা, রাস্তাঘাট ইত্যাদি।
  • সাংস্কৃতিক পরিবেশ: মানুষের প্রথা, বিশ্বাস, ঐতিহ্য, জ্ঞান-বুদ্ধি ও চিন্তাধারা।
  • মনস্তাত্ত্বিক পরিবেশ: মানুষের অভিজ্ঞতা, মানসিকতা ও মনোভাব।

আরও পড়ুন: রাষ্ট্রের সংজ্ঞা, উপাদান ও লক্ষ্য-উদ্দেশ্য: পূর্ণাঙ্গ আলোচনা

পরিবেশের শ্রেণিবিভাগ (Classification of Environment)

অধ্যাপক ম্যাকাইভার ও পেজ পরিবেশকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করেছেন: বাহ্যিক পরিবেশ ও সামাজিক পরিবেশ। তবে অধ্যাপক জিসবার্ট পরিবেশকে আরও বিস্তারিতভাবে চার ভাগে ভাগ করেছেন। নিচে তা আলোচনা করা হলো:

১. প্রাকৃতিক পরিবেশ (Natural Environment)

জলবায়ু, বৃষ্টিপাত, নদ-নদী, পাহাড়-পর্বত, সমুদ্র ও নক্ষত্র নিয়ে প্রাকৃতিক পরিবেশ গঠিত। এটি মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে এবং প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্টি হয়।

২. কৃত্রিম পরিবেশ (Artificial Environment)

মানুষ তার নিজের প্রয়োজনে প্রযুক্তি ও বুদ্ধি খাটিয়ে যে পরিবেশ তৈরি করে, তাকে কৃত্রিম পরিবেশ বলে। যেমন—শহর, দালানকোঠা, বাঁধ, ও কলকারখানা। আধুনিক সভ্যতার পুরোটাই কৃত্রিম পরিবেশের অন্তর্গত।

৩. সামাজিক পরিবেশ (Social Environment)

মানুষে মানুষে সম্পর্কের ভিত্তিতে যে পরিবেশ গড়ে ওঠে, তাই সামাজিক পরিবেশ। সমাজের প্রচলিত রীতিনীতি, প্রথা, প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন এর অন্তর্ভুক্ত। মানুষ একে অপরের বিপদে এগিয়ে আসে এবং সামাজিক বন্ধনে আবদ্ধ থাকে।

আরও পড়ুন: সমাজকল্যাণ ও সমাজ সংস্কারে শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হকের অবদান

৪. মনস্তাত্ত্বিক পরিবেশ (Psychological Environment)

মানুষের অভিজ্ঞতা, শিক্ষা ও অভ্যাসের সমন্বয়ে যে মানসিক জগত তৈরি হয়, তাকে মনস্তাত্ত্বিক পরিবেশ বলে। মানুষ যখন কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, তখন সে তার পূর্ব অভিজ্ঞতা ও শিক্ষার ওপর নির্ভর করে। সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক পরিবেশ একে অপরের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে পরিবেশ সংরক্ষণ (Local Context)

বাংলাদেশ একটি প্রাকৃতিকভাবে সমৃদ্ধ দেশ হলেও বর্তমানে জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও অপরিকল্পিত নগরায়নের ফলে আমাদের পরিবেশ হুমকির মুখে। সুন্দরবনের ইকোসিস্টেম থেকে শুরু করে ঢাকার বায়ু—সবই আজ দূষণের শিকার। পলিথিন ও প্লাস্টিক বর্জ্য আমাদের মাটি ও নদীর উর্বরতা নষ্ট করছে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় আমাদের ব্যক্তিগত সচেতনতা এবং সরকারি আইনের সঠিক প্রয়োগ অত্যন্ত জরুরি।

বিশেষজ্ঞ মতামত: পরিবেশ বিজ্ঞানীদের মতে, একটি দেশের মোট আয়তনের অন্তত ২৫ শতাংশ বনভূমি থাকা প্রয়োজন। কিন্তু বাংলাদেশে বর্তমানে বনভূমির পরিমাণ মাত্র ১০-১২ শতাংশের মতো, যা পরিবেশগত বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ।

উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, সুষ্ঠু ও সুন্দর জীবনের জন্য সুস্থ পরিবেশ অপরিহার্য। প্রাকৃতিক উপাদান আমাদের বাঁচিয়ে রাখে, আর সামাজিক উপাদান আমাদের মানুষ হিসেবে বিকশিত করে। পরিবেশ দূষণ আজ মানবসভ্যতার জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি। তাই আসুন, আমরা সবাই মিলে আমাদের চারপাশের পরিবেশকে বাসযোগ্য রাখি এবং আগামী প্রজন্মের জন্য একটি সবুজ পৃথিবী নিশ্চিত করি।

Post a Comment

0 Comments

Post a Comment (0)

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Check Out
Ok, Go it!