
প্রশ্ন: সমাজ সংস্কারে রাজা রামমোহন রায়ের অবদান লিখ। (Write the contribution of Raja Rammohan Roy in social reform)
সমাজ সংস্কারে রাজা রামমোহন রায়ের অবদান
ভূমিকা:
১৭৫৭ সালে পলাশির যুদ্ধে নবাব সিরাজ উদ-দৌলার পরাজয়ের মধ্য দিয়ে বাংলার মধ্যযুগের অবসান ঘটে। পলাশি যুদ্ধের পর থেকে বাংলার রাজনৈতিক ও সাধারণ জনজীবনে বিরাট পরিবর্তন আসে। এ সময় ঘন ঘন দুর্ভিক্ষ হতে থাকে, বাংলার সম্পদ ইউরোপে পাচার হতে থাকে এবং সাধারণ মানুষের দুঃখ-দুর্দশা বেড়ে যায়। এসব কারণে বাংলার সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভিত্তি প্রায় ভেঙে যায়। তাই এ দেশের ধর্মীয় জীবনেও প্রবেশ করতে থাকে নানা কুসংস্কার। এ অবস্থার পরিবর্তন হতে থাকে ঊনবিংশ শতকের প্রথম থেকে। বাংলার সামাজিক ও ধর্মীয় জীবন সংস্কার করতে এগিয়ে আসেন বাঙালি সংস্কারক রাজা রামমোহন রায়। আধুনিক ভারতের রূপকার হিসেবে সমাজ সংস্কারে রাজা রামমোহন রায়ের অবদান অপরিসীম।
নিম্নে সামাজিক সংস্কারে তাঁর ভূমিকা ও পদক্ষেপসমূহ আলোচনা করা হলো:
১. আত্মীয় সভা গঠন:
একেশ্বরবাদের বাণী প্রচারের জন্য ১৮১৫ সালে রামমোহন রায় 'আত্মীয় সভা' নামে সমিতি গঠন করেন। সে যুগের কলকাতার শিক্ষিত অভিজাত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির অনেকেই এ সমিতির সদস্য হন। রামমোহন রায়ের মূর্তিপূজা বিরোধী প্রচারণায় হিন্দু সমাজ আতঙ্কিত হয়ে উঠে এবং তাঁর বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা করে। কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজকে আলোর পথে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে এটি ছিল তাঁর সমাজ পরিবর্তনের আন্দোলনের প্রথম পদক্ষেপ।
২. শিক্ষা ক্ষেত্রে সংস্কার:
শিক্ষা ক্ষেত্রে রাজা রামমোহন রায়ের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, সমাজকে কুসংস্কার মুক্ত করতে হলে শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেই তিনি ১৮২৫ সালে 'বেদান্ত কলেজ' এবং ১৮২২ সালে 'এ্যাংলো হিন্দু স্কুল' প্রতিষ্ঠা করেন। আধুনিক ও ইংরেজি শিক্ষা বিস্তারে তাঁর প্রচেষ্টা অনস্বীকার্য।
আরও পড়ুন:
৩. সতীদাহ প্রথা বিলোপ:
সতীদাহ প্রথা বিলোপের ক্ষেত্রে রাজা রামমোহন রায়ের ভূমিকা ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। তৎকালীন হিন্দু সমাজে স্বামীর মৃত্যুর পর স্ত্রীকে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারার যে অমানবিক প্রথা চালু ছিল, তা বন্ধ করতে রাজা রামমোহন রায় ব্রতী হন। তাঁকে সাহায্য ও সমর্থন দেন ভারতের তৎকালীন বড়লাট লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক। তাঁদের যৌথ প্রচেষ্টায় ১৮২৯ সালের ৪ ডিসেম্বর সতীদাহ প্রথা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। নারী মুক্তি ও মানবতার জয়ে ভারতীয় সমাজ সংস্কারে তাঁর অবদান চিরস্মরণীয়।
৪. ব্রাহ্মসমাজ প্রতিষ্ঠা:
রাজা রামমোহন রায় ১৮২৮ সালের ২০ আগস্ট প্রতিষ্ঠা করেন 'ব্রাহ্মসমাজ' নামে নতুন ধর্মীয় মতবাদ। ব্রাহ্মসমাজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ভারতে এক নতুন অধ্যায় সূচিত হয়। এটি হিন্দু ধর্মের গোঁড়ামি দূর করে একশ্বরবাদের প্রচার করে। এছাড়া রাজা রামমোহন রায় সমাজ থেকে কৌলিন্য প্রথা, বাল্য বিবাহ, বহুবিবাহ ইত্যাদি কুপ্রথাগুলো তুলে দেওয়ার জন্য জনমত গড়ে তুলতে থাকেন। ধর্মীয় ও সামাজিক এই বিপ্লব আধুনিক ভারত গঠনে তাঁর অবদানকে সুদৃঢ় করেছে।
উপসংহার:
সুতরাং উপরের আলোচনা সাপেক্ষে আমরা বলতে পারি যে, রাজা রামমোহন রায়ের সমাজ সংস্কারের সবচেয়ে বেশি প্রতিফলন দেখা যায় শহরের শিক্ষিত শ্রেণির মধ্যে। ধীরে ধীরে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি পায় এবং আধুনিক চিন্তাধারার বিকাশ ঘটে। ঊনবিংশ শতাব্দীর রেনেসাঁ বা নবজাগরণের অগ্রদূত হিসেবে সামাজিক পরিবর্তনে তাঁর অবদান বাঙালি জাতি শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে।
পরীক্ষার প্রস্তুতি ও টিপস
- প্রশ্ন ধরন: এই প্রশ্নটি সাধারণত রচনামূলক (১০ নম্বর) বা সংক্ষিপ্ত টিকা (৪ নম্বর) হিসেবে আসে।
- লেখার কৌশল: ভূমিকা দিয়ে শুরু করুন, পয়েন্ট আকারে লিখুন এবং শেষে উপসংহার দিন।
- সতর্কতা: সালগুলো (১৮১৫, ১৮২৮, ১৮২৯) সঠিকভাবে লিখুন।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
প্রশ্ন: রাজা রামমোহন রায় কেন সতীদাহ প্রথা বন্ধ করেছিলেন?
উত্তর: তৎকালীন হিন্দু সমাজে স্বামীর মৃত্যুর পর স্ত্রীকে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারার অমানবিক প্রথা চালু ছিল। রাজা রামমোহন রায় নারী সমাজের এই চরম দুর্দশা ও মানবাধিকার লঙ্ঘন রোধ করতে এবং কুসংস্কার দূর করতে সতীদাহ প্রথা বন্ধের উদ্যোগ নেন।
প্রশ্ন: ব্রাহ্মসমাজ প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য কী ছিল?
উত্তর: ব্রাহ্মসমাজ প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য ছিল হিন্দু ধর্মের মূর্তিপূজা ও বহুঈশ্বরবাদের পরিবর্তে নিরাকার একশ্বরবাদের প্রচার করা এবং ধর্মীয় গোঁড়ামি ও সামাজিক কুসংস্কার দূর করে একটি যুক্তিনির্ভর সমাজ গঠন করা।
প্রশ্ন: সমাজ সংস্কারে রাজা রামমোহন রায়ের মূল অবদানগুলো কী?
উত্তর: সমাজ সংস্কারে তাঁর অবদানগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো সতীদাহ প্রথা বিলোপ, বাল্যবিবাহ ও কৌলিন্য প্রথার বিরোধিতা, নারী শিক্ষার প্রসার, এবং আধুনিক ইংরেজি শিক্ষার প্রচলন।
প্রশ্ন: রাজা রামমোহন রায়কে কেন 'ভারতের প্রথম আধুনিক পুরুষ' বলা হয়?
উত্তর: মধ্যযুগীয় অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজকে পাশ্চাত্য শিক্ষা, যুক্তিবাদ এবং মানবতাবাদের আলোকে নতুনভাবে জাগিয়ে তোলার জন্য এবং আধুনিক ভারতের ভিত্তি স্থাপন করার কারণে তাঁকে 'ভারতের প্রথম আধুনিক পুরুষ' বলা হয়।
If you believe any content on our website infringes your rights, please contact us. We will review and take action promptly.