নারী নির্যাতন কী? সংজ্ঞা, কারণ ও প্রভাব

প্রশ্ন: নারী নির্যাতন কী? অথবা, নারী নির্যাতন বলতে কী বুঝ? নির্যাতন কাকে বলে?
ভূমিকা
বাংলা শব্দ 'নির্যাতন'-এর ইংরেজি প্রতিশব্দ হিসেবে 'Violence' বা 'Oppression' ব্যবহার করা যায়। বিভিন্ন উপায়ে নির্যাতন করা যায়, যেমন: দৈহিক নির্যাতন, মানসিক নির্যাতন ইত্যাদি। দুই পক্ষের পারস্পরিক ক্রিয়ার মাধ্যমেই নির্যাতন সংঘটিত হয়। একপক্ষ নির্যাতনকারী ও অপরপক্ষ নির্যাতন ভোগকারী। নারী নির্যাতন বর্তমানে একটি বৈশ্বিক সমস্যা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
নির্যাতনের সংজ্ঞা
সাধারণভাবে বলা যায়, যখন এক বা একাধিক ব্যক্তি কর্তৃক অন্য এক বা একাধিক ব্যক্তিকে দৈহিক বা মানসিক চাপ দেয়া হয়, তখন তাকে নির্যাতন বলে। কাউকে প্রহার করা, কাউকে অপমানিত করা, কথার মাধ্যমে আঘাত, মারধর ইত্যাদি নির্যাতনের উদাহরণ। অর্থাৎ, কাউকে মানসিক বা দৈহিক আঘাত করাই হলো নির্যাতন।
প্রামাণ্য সংজ্ঞা
বিভিন্ন সংস্থা এবং মনীষীগণ নির্যাতনের বিভিন্ন সংজ্ঞা প্রদান করেছেন। নিম্নে কিছু উল্লেখযোগ্য সংজ্ঞা তুলে ধরা হলো:
“নির্যাতন হলো কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর উপর অন্য কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর হুমকি বা বলপ্রয়োগের মাধ্যমে ইচ্ছানুসারে কাজ করানো।” — Pacific Asian Women Forum (PAWF)
"An act carried out with the intention of or perceived as having the intention of physically hurting another people." — Gelles and Straus
"To frighten and by frightening to dominate and control." অর্থাৎ, ভীতি প্রদর্শন ও ভীতি প্রদর্শনের দ্বারা আধিপত্য ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করাকে নির্যাতন বলে। — Hacker
Oxford Dictionary-এর মতে, 'Violence' শব্দটি ল্যাটিন শব্দ 'Vialatia' থেকে উদ্ভূত, যার আভিধানিক অর্থ আক্রমণ, উৎপীড়ন, শক্তি প্রয়োগ ইত্যাদি। নারী নির্যাতন বলতে নারীদের বিরুদ্ধে সকল প্রকার উৎপীড়ন, আক্রমণ, শোষণ ও প্রহার করাকে বুঝায়।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায় যে, পৃথিবীর আদিকাল থেকে দুর্বলের উপর সবল, শক্তিশালীরা বিভিন্নভাবে নির্যাতন করে আসছে। তবে সবসময়ই নির্যাতন ভোগকারীদের মধ্যে নারীদের সংখ্যাই বেশি। পরিবার থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক পর্যায় পর্যন্ত নারীরা বিভিন্নভাবে নির্যাতিত হচ্ছে।
নারী নির্যাতন বলতে কী বুঝ? বিস্তারিত আলোচনা
ভূমিকা
কাজী নজরুল ইসলাম বলেছেন, "পৃথিবীতে যা কিছু মহান চিরকল্যাণকর, অর্ধেক তার গড়িয়াছে নারী অর্ধেক তার নর।" একটি সমাজ গড়ে উঠে নারী-পুরুষের সমান অংশগ্রহণের মাধ্যমে। যখন কোনো সমাজে নারীর অংশগ্রহণ কমে যাবে, তখন ঐ সমাজের সার্বিক উন্নয়ন ব্যাহত হবে। নারী তখন উন্নয়নের সক্রিয় অংশীদার না হয়ে, সমাজের বোঝা হিসেবে পরিগণিত হবে। তখন থেকেই আমরা সমাজে নারীর অবহেলা, বঞ্চনা, প্রতারণা ও নির্যাতনের চিত্র অবলোকন করছি। তৃতীয় বিশ্বের দেশ হিসেবে বাংলাদেশেও নারী নির্যাতনের হার অনেক এবং দিন দিন এর পরিমাণ বেড়েই চলেছে।
নারী নির্যাতনের সংজ্ঞা
সংকীর্ণ অর্থে নারী নির্যাতন বলতে নারীর প্রতি শারীরিক উৎপীড়ন বা নিপীড়নকে বুঝায়। কিন্তু ব্যাপক অর্থে নারী নির্যাতন বলতে নারীদের উপর শারীরিক, মানসিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় যেকোনো ধরনের নিপীড়নকে বুঝায়। নারীদের যেকোনো অধিকার খর্ব করা এবং নারীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে যেকোনো কিছু করতে বাধ্য করাও নারী নির্যাতনের অন্তর্ভুক্ত।
আরও পড়ুন:
প্রামাণ্য সংজ্ঞা
নিম্নে নারী নির্যাতন সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংজ্ঞা তুলে ধরা হলো:
- প্রফেসর মোহাম্মদ আতিকুর রহমান: "নারী নির্যাতন একটি ব্যাপক অর্থবহ প্রত্যয়। সাধারণভাবে কোনো ব্যক্তি বা ব্যক্তি সমষ্টি নারীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে অথবা বলপ্রয়োগে অথবা ভয় দেখিয়ে নারীকে কোনো কিছু করতে বাধ্য করাই হলো নারী নির্যাতন।"
- সিডও (CEDAW) সনদ: "নারী নির্যাতন হলো নারীকে শারীরিক, মানসিক ও জৈবিকভাবে বেদনাহত, ক্ষতিগ্রস্ত ও দুর্ভোগের ভাগিদার করে এমন কিছু আচরণ কিংবা ভীতি প্রদর্শন। হুমকি ও বলপ্রয়োগ যা নারীর স্বেচ্ছাধীন কাজ করা ও চলাফেরার ব্যাপারে তাকে বঞ্চিত করে।"
- জাতিসংঘ (UN): "নারী নির্যাতন বলতে বুঝায়, নারীদের বিরুদ্ধে যে কোন প্রকার লিঙ্গভিত্তিক নির্যাতন। যেমন: দৈহিক, যৌন বা মানসিক ক্ষতি বা যন্ত্রণা, যা তাদের জনজীবন বা ব্যক্তিগত জীবনে সংঘটিত হয়।"
- জরিনা রহমান খান: "নারী নির্যাতন বলতে শুধু নারীকে দৈহিক নির্যাতন নয়; বরং যে কোন ধরনের শোষণ করাকে বুঝায়।"
পরিশেষে বলা যায় যে, কোন নারীকে মানসিক বা দৈহিক আঘাত করাই হলো নারী নির্যাতন। নারী নির্যাতন বন্ধ করে সকল নারীকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে হবে।
উপসংহার
নারী নির্যাতন নতুন কোনো বিষয় নয়। এর ইতিহাস শত শত বছরের পুরনো। মাতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা পরিবর্তন ও পুরুষশাসিত সমাজব্যবস্থায় ধীরে ধীরে শুরু হয় নারী নির্যাতন। বর্তমানে পৃথিবীর উন্নত, উন্নয়নশীল, অনুন্নত সকল রাষ্ট্রেই কমবেশি নারী নির্যাতন সংঘটিত হচ্ছে। কিন্তু নারী নির্যাতন বন্ধ না করে নারীকে রাষ্ট্রীয় উন্নয়নের অংশীদার না করলে আমাদের আজকের পৃথিবী বহুলাংশে পিছিয়ে পড়বে।
পরীক্ষার প্রস্তুতি ও টিপস
- প্রশ্ন ধরন ও মান: এই প্রশ্নটি সাধারণত সংক্ষিপ্ত (৪ নম্বর) বা রচনামূলক (১০ নম্বর) হিসেবে পরীক্ষায় আসতে পারে। 'নারী নির্যাতন' বা 'সিডও সনদ' নিয়ে টিকা আসার সম্ভাবনা থাকে।
- উত্তর লেখার কৌশল: ভূমিকা দিয়ে শুরু করুন। এরপর সাধারণ সংজ্ঞা এবং প্রামাণ্য সংজ্ঞাগুলো আলাদা প্যারাগ্রাফে লিখুন। শেষে একটি উপসংহার দিন।
- সতর্কতা: জাতিসংঘের সংজ্ঞা এবং সিডও সনদের উল্লেখ করলে উত্তরটি বেশি গ্রহণযোগ্য হবে। সংজ্ঞাগুলো হুবহু লেখার চেষ্টা করবেন।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
প্রশ্ন: নারী নির্যাতন কত প্রকার?
উত্তর: নারী নির্যাতন সাধারণত শারীরিক, মানসিক, যৌন এবং অর্থনৈতিক—এই চার প্রকারের হতে পারে।
প্রশ্ন: সিডও (CEDAW) সনদ কী?
উত্তর: সিডও হলো নারীদের প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ করার জন্য জাতিসংঘ কর্তৃক গৃহীত একটি আন্তর্জাতিক সনদ।
প্রশ্ন: নারী নির্যাতনের প্রধান কারণ কী?
উত্তর: পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা, দারিদ্র্য, যৌতুক প্রথা, শিক্ষার অভাব এবং নারীর প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নারী নির্যাতনের প্রধান কারণ।
If you believe any content on our website infringes your rights, please contact us. We will review and take action promptly.