কল্যাণরাষ্ট্র কী? কল্যাণরাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য ও কার্যাবলী

Faruk Sir
0

কল্যাণরাষ্ট্র কাকে বলে? কল্যাণরাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য ও কার্যাবলীসহ বিস্তারিত আলোচনা

কল্যাণরাষ্ট্র কী? কল্যাণরাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য ও কার্যাবলী

রাষ্ট্র কি শুধুই শাসন করার জন্য? নাকি নাগরিকদের ভালো-মন্দ দেখার দায়িত্বও তার? প্রাচীনকালে রাষ্ট্র ছিল কেবলই একটি পুলিশি ব্যবস্থা, যার কাজ ছিল শুধু আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা করা। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে রাষ্ট্রের ধারণা বদলেছে। আধুনিক রাষ্ট্রগুলো এখন জনগণের সেবক, চিন্তার সহচর এবং প্রকৃত বন্ধু। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় এই জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্রব্যবস্থাকেই বলা হয় কল্যাণরাষ্ট্র (Welfare State)। আজকের ব্লগে আমরা জানব কল্যাণরাষ্ট্র কাকে বলে, এর বৈশিষ্ট্য এবং এটি কীভাবে সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কাজ করে।

এক নজরে মূল কথা (Key Takeaways):
  • কল্যাণরাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য মুনাফা নয়, বরং জনগণের সার্বিক মঙ্গল সাধন।
  • এটি নাগরিকদের মৌলিক চাহিদা (খাদ্য, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা) পূরণে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
  • সামাজিক নিরাপত্তা বিধান এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করা এর অন্যতম প্রধান কাজ।
  • ব্যক্তিস্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রেখে সুষম বণ্টন ব্যবস্থা নিশ্চিত করে।

কল্যাণরাষ্ট্র কী? (Definition of Welfare State)

সহজ কথায়, যে রাষ্ট্র তার নাগরিকদের বস্তুগত ও অবস্তুগত সকল প্রকার কল্যাণের দায়িত্ব গ্রহণ করে, তাকে কল্যাণরাষ্ট্র বলে। এটি এমন এক রাষ্ট্রব্যবস্থা যেখানে সরকার ব্যক্তি ও সমাজের উন্নতি এবং মঙ্গলের জন্য সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করে। এখানে রাষ্ট্র কেবল শাসক নয়, বরং সেবক হিসেবে আবির্ভূত হয়।

বিভিন্ন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও মনীষী কল্যাণরাষ্ট্রকে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে সংজ্ঞায়িত করেছেন:

"জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য হলো সকল মানুষকে খুশি করা।" — রাষ্ট্রবিজ্ঞানী প্লেটো
"যে রাষ্ট্রে ব্যাপকভাবে জনগণের সামাজিক নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়, তাকে কল্যাণমূলক রাষ্ট্র বলে।" — অধ্যাপক বেন্থাম

কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্যসমূহ

একটি রাষ্ট্রকে তখনই কল্যাণরাষ্ট্র বলা যাবে, যখন তার মধ্যে নির্দিষ্ট কিছু বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান থাকবে। নিচে প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো আলোচনা করা হলো:

১. মৌলিক চাহিদা পূরণ ও সামাজিক নিরাপত্তা

কল্যাণরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো নাগরিকদের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করা। পাশাপাশি বেকার, বৃদ্ধ ও অসুস্থদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা, যাতে মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় না ভোগে।

২. অর্থনৈতিক সাম্য ও সুষম বণ্টন

সম্পদ যেন গুটিকয়েক মানুষের হাতে কুক্ষিগত না থাকে, সেজন্য কল্যাণরাষ্ট্র সুষম বণ্টন ব্যবস্থা নিশ্চিত করে। এর মাধ্যমে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য হ্রাস পায় এবং সমাজে অর্থনৈতিক ভারসাম্য বজায় থাকে।

৩. ব্যক্তিস্বাধীনতা ও গণতন্ত্র

জনকল্যাণ করতে গিয়ে এই রাষ্ট্র ব্যক্তিস্বাধীনতা হরণ করে না। বরং ব্যক্তির মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়। এখানে নাগরিকরা তাদের প্রতিভার বিকাশের পূর্ণ সুযোগ পায়।

৪. জনস্বাস্থ্য ও শিক্ষা উন্নয়ন

রাষ্ট্রীয় খরচে মানসম্মত শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা কল্যাণরাষ্ট্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। কারিগরি ও বাস্তবমুখী শিক্ষার মাধ্যমে মানবসম্পদ উন্নয়ন করা হয়, যাতে তারা দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারে।

কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের কার্যাবলি

জনগণের সার্বিক কল্যাণ সাধন করাই কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের অন্যতম কাজ। কল্যাণমূলক রাষ্ট্র এখন শুধু পুলিশি কার্য সম্পাদন করে না, বরং এটি ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব বিকাশে এবং একটি সুখী-সমৃদ্ধশালী সমাজ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। নিম্নে কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের প্রধান কার্যাবলি বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

১. জনকল্যাণ সাধন

রাষ্ট্রের সকল কাজের মূল মানদণ্ড হবে জনকল্যাণ। রাষ্ট্রের প্রধান উদ্দেশ্যই হলো জনসাধারণের সামাজিক কল্যাণ নিশ্চিত করা। জনকল্যাণের স্বার্থে রাষ্ট্র ব্যক্তিজীবনের বিভিন্ন দিক নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করে থাকে।

২. নাগরিকদের নিরাপত্তা দান

রাষ্ট্র নাগরিকদের জান-মালের নিরাপত্তার জন্য প্রতিরক্ষা বাহিনী গঠন করে। এই প্রতিরক্ষা বাহিনী নাগরিকদের সার্বিক নিরাপত্তা বিধানে সর্বদা নিয়োজিত থাকে, যাতে মানুষ নির্ভয়ে বসবাস করতে পারে।

৩. অর্থনৈতিক নিরাপত্তা দান

অর্থনৈতিক দিক থেকে কল্যাণমূলক রাষ্ট্র ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করে। নাগরিকদের অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা দূর করতে রাষ্ট্র বেকার ভাতা, বয়স্ক ভাতা এবং দরিদ্রদের জন্য বিভিন্ন ধরনের রেশনের ব্যবস্থা করে থাকে।

৪. অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণ

রাষ্ট্র নাগরিকদের মধ্যে বিদ্যমান সকল প্রকার অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করার চেষ্টা করে। ধনী ও গরিবের মধ্যকার ব্যবধান কমিয়ে আনা কল্যাণরাষ্ট্রের একটি অন্যতম লক্ষ্য। কারণ অতিরিক্ত বৈষম্য রাষ্ট্রের শান্তি-শৃঙ্খলা নষ্ট করতে পারে।

৫. জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন

রাষ্ট্র নাগরিকদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে নিরলসভাবে কাজ করে। এজন্য রাষ্ট্র মানুষের মৌলিক চাহিদাগুলোর মান উন্নয়নে পদক্ষেপ নেয়। মৌলিক চাহিদার পূরণ ও উন্নয়ন হলে স্বাভাবিকভাবেই জনগণের সামগ্রিক জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়।

৬. স্বাধীন সমাজ প্রতিষ্ঠা

কল্যাণমূলক রাষ্ট্র সকল প্রকার শ্রেণি স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে গণস্বার্থ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একটি স্বাধীন ও মুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে সচেষ্ট হয়। জাতি, ধর্ম, বর্ণ, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলের স্বাধীনতা ও অধিকার নিশ্চিত করাই এর লক্ষ্য।

৭. সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা

সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের একটি মৌলিক দায়িত্ব। তাই কল্যাণমূলক রাষ্ট্র জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের প্রতি সমান দৃষ্টি রাখে এবং আইনের চোখে সবাইকে সমানভাবে দেখে।

৮. শিক্ষামূলক কার্য সম্পাদন

কল্যাণমূলক রাষ্ট্র দেশের সর্বস্তরে শিক্ষা বিস্তারের জন্য স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করে। শিক্ষার আলো সবার ঘরে পৌঁছে দিতে রাষ্ট্র পর্যাপ্ত বই সরবরাহ করে এবং দক্ষ ও যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ প্রদান করে।

এক নজরে কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের কার্যাবলি

ক্রমিক কার্যাবলি বিবরণ
জনকল্যাণ সাধন জনসাধারণের সার্বিক সামাজিক কল্যাণ নিশ্চিত করা।
নিরাপত্তা দান প্রতিরক্ষা বাহিনীর মাধ্যমে নাগরিকদের সার্বিক নিরাপত্তা প্রদান।
অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বেকার ভাতা, বয়স্ক ভাতা ও রেশনের ব্যবস্থা করা।
বৈষম্য দূরীকরণ ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান কমিয়ে অর্থনৈতিক সাম্য আনা।
জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন মৌলিক চাহিদা পূরণের মাধ্যমে জীবনমান বৃদ্ধি করা।
স্বাধীন সমাজ প্রতিষ্ঠা জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা।
ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা সকলের প্রতি সমান দৃষ্টি রাখা ও সুবিচার নিশ্চিত করা।
শিক্ষা বিস্তার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন, বই সরবরাহ ও শিক্ষক নিয়োগ।

বিশেষজ্ঞ মতামত: আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জনক এরিস্টটলের মতে, রাষ্ট্র সৃষ্টি হয়েছে জীবনের প্রয়োজনে, আর রাষ্ট্র টিকে আছে উন্নত জীবনের জন্য। কল্যাণরাষ্ট্র এই 'উন্নত জীবন' নিশ্চিত করারই একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কল্যাণরাষ্ট্র (Local Context)

বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রকে একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার অঙ্গীকার করা হয়েছে। এখানে নাগরিকদের অন্ন, বস্ত্র, চিকিৎসা, শিক্ষা ও বাসস্থানের নিশ্চয়তা বিধানের কথা বলা হয়েছে। বর্তমানে বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, বিনামূল্যে বই বিতরণ এবং সর্বজনীন পেনশন স্কিমের মতো উদ্যোগগুলো বাংলাদেশকে একটি পূর্ণাঙ্গ কল্যাণরাষ্ট্র হওয়ার পথে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। তবে দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন এবং সম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, কল্যাণরাষ্ট্র হলো জনসাধারণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। এটি এমন এক ব্যবস্থা যেখানে রাষ্ট্র এবং নাগরিকের সম্পর্ক হয় অত্যন্ত নিবিড় ও সহযোগিতামূলক। জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকলের স্বার্থ রক্ষা করা এবং একটি সুখী-সমৃদ্ধ সমাজ গঠন করাই কল্যাণরাষ্ট্রের মূল মন্ত্র। বর্তমান বিশ্বে প্রতিটি রাষ্ট্রই এই আদর্শ অর্জনের চেষ্টা করে যাচ্ছে।

আপনার কি মনে হয়, বাংলাদেশ একটি পূর্ণাঙ্গ কল্যাণরাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পেরেছে?

নিচে কমেন্ট করে আপনার মূল্যবান মতামত জানান।

Post a Comment

0 Comments

Post a Comment (0)

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Check Out
Ok, Go it!