সরকার কি? রাষ্ট্র ও সরকারের সম্পর্ক এবং পার্থক্য নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা।

রাষ্ট্র গঠনের চারটি অপরিহার্য উপাদানের মধ্যে অন্যতম প্রধান উপাদান হলো সরকার। সরকার ব্যতীত রাষ্ট্রের অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না। দেশের শাসনকার্য পরিচালনায় সরকার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এবং প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জনসাধারণের কল্যাণে বিভিন্ন কার্য সম্পাদন করে থাকে। অনেকেই রাষ্ট্র ও সরকারকে এক মনে করেন, কিন্তু রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এদের মধ্যে বিস্তর তফাত রয়েছে। আজকের ব্লগে আমরা জানব সরকার কাকে বলে, ব্যক্তির সাথে এর সম্পর্ক এবং রাষ্ট্র ও সরকারের মধ্যকার সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্যসমূহ।
- সরকার হলো রাষ্ট্রের মুখপাত্র বা ইচ্ছা বাস্তবায়নের যন্ত্র।
- রাষ্ট্র স্থায়ী প্রতিষ্ঠান, কিন্তু সরকার পরিবর্তনশীল।
- ব্যক্তি ও সরকার একে অপরের ওপর নির্ভরশীল।
- অধ্যাপক গার্নারের মতে, রাষ্ট্র যদি হয় জীবদেহ, সরকার হলো তার মস্তিষ্ক।
সরকার কি? (Definition of Government)
সরকার একটি বিমূর্ত রাজনৈতিক ধারণা যা রাষ্ট্র পরিচালনায় দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে থাকে। সরকার ব্যতীত রাষ্ট্র গঠিত হতে পারে না। সহজ কথায়, সরকার বলতে সেই শাসনযন্ত্রকে বোঝায় যার মাধ্যমে রাষ্ট্র তার ইচ্ছাকে প্রকাশ করে এবং উদ্দেশ্যকে কার্যকর করে।
প্রামাণ্য সংজ্ঞা
বিভিন্ন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও মনীষী সরকারকে বিভিন্নভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। নিম্নে তাঁদের উল্লেখযোগ্য সংজ্ঞাসমূহ তুলে ধরা হলো:
এছাড়া অধ্যাপক গার্নার বলেন, "সরকার হলো একটি কার্যনির্বাহীর মাধ্যম বা যন্ত্র যার মাধ্যমে সরকারের সাধারণ নীতি নির্ধারিত হয় এবং যার দ্বারা সাধারণ কাজকর্ম নিয়মিত হয় এবং সাধারণ স্বার্থ সাধিত হয়।" অধ্যাপক লাস্কি-এর মতে, "জনগণের স্বার্থে জনগণের অর্পিত ক্ষমতা প্রয়োগকারী সংস্থাকে সরকার বলে।"
সরকার ও ব্যক্তির মধ্যকার সম্পর্ক
সরকার ও ব্যক্তির মধ্যে গভীর এবং অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক বিদ্যমান। সরকার গঠিত হয় কতিপয় ব্যক্তির সমন্বয়ে। সরকার ছাড়া যেমন ব্যক্তি শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করতে পারে না, তেমনি ব্যক্তি ছাড়া সরকার গঠিত হতে পারে না। নিম্নে এই সম্পর্কের প্রধান দিকগুলো আলোচনা করা হলো:
- পারস্পরিক নির্ভরশীলতা: সরকার ও ব্যক্তি পরস্পর পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল। ব্যক্তি ছাড়া যেমন সরকার গঠিত হতে পারে না, তেমনি সরকার ছাড়া শাসনব্যবস্থা চলতে পারে না। সরকার ও ব্যক্তির মধ্যে সুসম্পর্ক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠন করে।
- গঠনগত সম্পর্ক: গঠনগত দিক থেকে সরকার ও ব্যক্তির মধ্যে গভীর সম্পর্ক বিদ্যমান। সরকার গঠিত হয় জনসমষ্টির মাধ্যমে। আর সরকার ও ব্যক্তির সমন্বয়েই রাষ্ট্র গঠিত হয়।
- কার্যগত সম্পর্ক: সরকার রাজনৈতিক, সামাজিক, ধর্মীয় ও অর্থনৈতিক কাজের সাথে সম্পৃক্ত। সরকারের এই সম্পৃক্ততা তখনই সফল হবে যখন ব্যক্তি নিজেকে সম্পৃক্ত করবে।
- মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ: সরকার ও ব্যক্তি একই মুদ্রার এপিঠ ও ওপিঠ। সরকার গঠিত হবে জনসমষ্টির মাধ্যমে, আর জনসমষ্টি গঠিত হয় ব্যক্তি দ্বারা। তাই এদের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর।
- লক্ষ্যগত সম্পর্ক: ব্যক্তির লক্ষ্য হলো নিজ কল্যাণে সরকারের সাথে সম্পৃক্ত থাকা। আর সরকারের উদ্দেশ্য হলো প্রজাদের বা নাগরিকদের সামাজিক কল্যাণ সাধন করা।
- একই প্রতিষ্ঠানের সদস্য: রাষ্ট্রব্যবস্থায় সরকার ও ব্যক্তি সদস্য হিসেবে কাজ করে। উভয়ের কাজের জন্য প্রয়োজন হয় একটি নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান।
রাষ্ট্র ও সরকারের মধ্যে সাদৃশ্য
রাষ্ট্র ও সরকার দুটি আলাদা প্রত্যয় হলেও উভয়ের মধ্যে গভীর সম্পর্ক বিদ্যমান। রাষ্ট্র হলো মাতাস্বরূপ আর সন্তান হলো সরকার। নিম্নে এদের সাদৃশ্যগুলো তুলে ধরা হলো:
- পারস্পরিক নির্ভরশীলতা: রাষ্ট্র ছাড়া সরকার অর্থহীন আবার সরকার ছাড়াও রাষ্ট্রব্যবস্থা অচল। রাষ্ট্রব্যবস্থা সুন্দরভাবে পরিচালনার ক্ষেত্রে রাষ্ট্র ও সরকার একে অপরের ওপর নির্ভরশীল।
- গঠনগত সম্পর্ক: রাষ্ট্র গঠনে সরকার নামক মৌলিক উপাদান ব্যবহৃত হয়। আবার সরকার গঠনে রাষ্ট্রের অন্যতম উপাদান ব্যক্তির সমন্বয়ে সরকার গঠিত হয়।
- উদ্দেশ্যগত মিল: উভয়ই মানবকল্যাণে নিয়োজিত থাকে। মানবকল্যাণ সাধনই সরকার ও রাষ্ট্রের অন্যতম কাজ।
- রাজনৈতিক প্রত্যয়: রাষ্ট্র এবং সরকার উভয়ই রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। রাষ্ট্র রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হলেও বিভিন্ন কার্য সম্পাদন করে থাকে, সরকারও তাই।
- বিমূর্ত ধারণা: রাষ্ট্র যেমন একটি বিমূর্ত ধারণা, তেমনি সরকারও একটি বিমূর্ত ধারণা। কারণ এদের দেখা যায় না, কেবল এদের কার্য পরিলক্ষিত হয়।
রাষ্ট্র ও সরকারের মধ্যে পার্থক্য (Differences between State and Government)
রাষ্ট্র ও সরকার পৃথক দুটি প্রত্যয়। তাই এদের মধ্যে উৎপত্তিগত, সংগত ও উদ্দেশ্যগত পার্থক্য বিদ্যমান। রাষ্ট্র একটি বিশাল বিষয় যার পরিধি ব্যাপক, অন্যদিকে সরকার রাষ্ট্রের একটি অংশ মাত্র। নিম্নে এদের প্রধান পার্থক্যগুলো আলোচনা করা হলো:
| বিষয় | রাষ্ট্র (State) | সরকার (Government) |
|---|---|---|
| ১. সংজ্ঞা | নির্দিষ্ট ভূখণ্ড, জনসমষ্টি, সরকার ও সার্বভৌমত্বের সমন্বয়ে গঠিত রাজনৈতিক সংস্থা। | আইন বিভাগ, শাসন বিভাগ ও বিচার বিভাগের সমন্বয়ে গঠিত প্রতিষ্ঠান। |
| ২. পরিধি | রাষ্ট্র হলো সমগ্র বা পূর্ণাঙ্গ প্রতিষ্ঠান। | সরকার হলো রাষ্ট্রের একটি অংশবিশেষ বা উপাদান মাত্র। |
| ৩. স্থায়িত্ব | রাষ্ট্র স্থায়ী প্রতিষ্ঠান, সহজে ধ্বংস হয় না (যুদ্ধ বা দুর্যোগ ছাড়া)। | সরকার সদা পরিবর্তনশীল। নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তিত হয়। |
| ৪. গঠন | রাষ্ট্র একটি রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত প্রতিষ্ঠান। | সরকার সেই প্রতিষ্ঠানের মুখপাত্র মাত্র। সরকারের মাধ্যমে রাষ্ট্রের ইচ্ছা প্রকাশিত ও কার্যকর হয়। |
| ৫. সার্বভৌমত্ব | রাষ্ট্র সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী। | সরকার রাষ্ট্র প্রদত্ত ক্ষমতার অধিকারী এবং সেই ক্ষমতা প্রয়োগকারী মাত্র। |
| ৬. রূপক অর্থ | অধ্যাপক গার্নারের মতে, রাষ্ট্র হলো জীবদেহ। | সরকার হলো সেই জীবদেহের মস্তিষ্কস্বরূপ। |
বিশেষজ্ঞ মতামত: ফরাসি চিন্তাবিদ আব্রাহাম (Abraham)-এর মতে, "যদি ভাবা হয় রাষ্ট্র ও সরকার আছে তাহলে তা আছে। যদি ভাবা হয় রাষ্ট্র ও সরকার নেই তাহলে তা নেই।" অর্থাৎ, মানুষের মনস্তাত্ত্বিক ধারণার ওপর এদের অস্তিত্ব অনেকাংশে নির্ভরশীল।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায় যে, সরকার রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। সরকার হচ্ছে রাষ্ট্রের একটি খণ্ড বিশেষ, যার মাধ্যমে রাষ্ট্রের নীতিমালা বাস্তবায়িত হয়। সরকার ছাড়া রাষ্ট্রের অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না। দেশে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবং মানবকল্যাণে সরকার মুখ্য ভূমিকা পালন করে। রাষ্ট্র ও সরকারের মধ্যে যতই পার্থক্য থাকুক না কেন, উভয়ই মানবকল্যাণে নিবেদিতপ্রাণ এবং একে অপরের পরিপূরক।
রাষ্ট্র ও সরকারের এই সম্পর্ক নিয়ে আপনার কোনো প্রশ্ন আছে কি? নিচে কমেন্ট করে জানান।