সার্বভৌমত্বের একত্ববাদ ও বহুবাদী মতবাদ: একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ

Faruk Sir
0

সার্বভৌমত্বের একত্ববাদ ও বহুবাদী মতবাদ নিয়ে তুলনামূলক বিশ্লেষণ

সার্বভৌমত্বের একত্ববাদ ও বহুবাদী মতবাদ নিয়ে তুলনামূলক বিশ্লেষণ

রাষ্ট্রবিজ্ঞানে সার্বভৌমত্বের ধারণা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে দুটি প্রধান মতবাদের মধ্যে বিতর্ক চলে আসছে। একদল মনে করেন রাষ্ট্রের ক্ষমতা চরম, একক এবং অবিভাজ্য—যাদের বলা হয় একত্ববাদী। অন্যদল মনে করেন সমাজ যেহেতু বহুকেন্দ্রিক, তাই ক্ষমতাও ভাগ হওয়া উচিত—এরা হলেন বহুবাদী। জন অস্টিন এবং হবস যেখানে রাষ্ট্রকে সর্বশক্তিমান মনে করেছেন, সেখানে লাস্কি ও বার্কারের মতো চিন্তাবিদরা সমাজের অন্যান্য সংঘকেও গুরুত্ব দিয়েছেন। আজকের ব্লগে আমরা সার্বভৌমত্বের এই দুই বিখ্যাত মতবাদ—একত্ববাদ ও বহুবাদী ধারণা—নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।

এক নজরে মূল কথা (Key Takeaways):
  • একত্ববাদ মতে সার্বভৌমত্ব একক, অবিভাজ্য এবং অসীম।
  • জন অস্টিন একত্ববাদী সার্বভৌমত্বের প্রধান প্রবক্তা।
  • বহুবাদী মতবাদ অনুযায়ী রাষ্ট্র একমাত্র ক্ষমতাধর সংগঠন নয়।
  • আধুনিক গণতন্ত্রে বহুবাদী ধারণা বেশি গ্রহণযোগ্য।

সার্বভৌমত্বের একত্ববাদী মতবাদ (Monistic Theory)

একত্ববাদী ধারণার মূল ভিত্তি হলো সার্বভৌম ক্ষমতা চরম, অবাধ এবং অসীম। ইংরেজ আইনবিদ জন অস্টিন (John Austin) এই মতবাদের প্রধান প্রবক্তা। তাঁর মতে, সার্বভৌমত্ব কোনোভাবেই ভাগ করা যায় না এবং এটি নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি বা কর্তৃপক্ষের হাতে ন্যস্ত থাকে।

একত্ববাদের মূল বৈশিষ্ট্য

  1. নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষ: সার্বভৌম ক্ষমতা অবশ্যই একজন নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা সংস্থার হাতে থাকবে।
  2. অসীম ক্ষমতা: এই ক্ষমতা আইনের দ্বারা সীমাবদ্ধ নয়; বরং সার্বভৌম যা আদেশ করেন, তাই আইন।
  3. অবিভাজ্য: সার্বভৌমত্বকে ভাগ করা যায় না। ভাগ করলে এর অস্তিত্ব নষ্ট হয়ে যায়।
  4. আনুগত্য: সমাজের অধিকাংশ মানুষ স্বভাবগতভাবেই এই কর্তৃপক্ষের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে।
"যদি কোনো সুনির্দিষ্ট মানবীয় কর্তৃপক্ষ অনুরূপ কোনো কর্তৃপক্ষের বশ্যতা স্বীকার না করে এবং সমাজের অধিকাংশের আনুগত্য লাভ করে, তবে সেই কর্তৃপক্ষই সার্বভৌম।" — জন অস্টিন

সার্বভৌমত্বের বহুবাদী মতবাদ (Pluralistic Theory)

একত্ববাদের চরম ক্ষমতার প্রতিক্রিয়াস্বরূপ বিংশ শতাব্দীতে বহুবাদী মতবাদের উদ্ভব হয়। এই মতবাদের মূলকথা হলো—রাষ্ট্রই সমাজের একমাত্র সংগঠন নয়। মানুষ তার প্রয়োজনে পরিবার, ধর্মীয় সংঘ, ট্রেড ইউনিয়ন বা সাংস্কৃতিক ক্লাব গড়ে তোলে। রাষ্ট্রের মতো এসব সংগঠনেরও নিজস্ব সত্তা ও ক্ষমতা রয়েছে। তাই সার্বভৌম ক্ষমতা কেবল রাষ্ট্রের হাতে একচেটিয়া থাকতে পারে না।

বহুবাদী মতবাদের বৈশিষ্ট্য

  1. বহুমুখী জীবন: মানুষের জীবন কেবল রাজনীতি বা রাষ্ট্রকেন্দ্রিক নয়। সামাজিক ও ধর্মীয় চাহিদাও গুরুত্বপূর্ণ।
  2. ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ: সার্বভৌমত্ব একক নয়, বরং এটি রাষ্ট্র ও অন্যান্য সংঘের মধ্যে বিভাজ্য।
  3. রাষ্ট্র আইনের ঊর্ধ্বে নয়: রাষ্ট্র আইন তৈরি করে না, বরং আইন আগে থেকেই সমাজে বিদ্যমান প্রথা ও নীতির ভিত্তিতে গড়ে ওঠে। রাষ্ট্র আইনের অধীন।
  4. বলপ্রয়োগের বিরোধিতা: কেবল শক্তি দিয়ে আনুগত্য আদায় করা যায় না, সহযোগিতার ভিত্তিতেই রাষ্ট্র টিকে থাকে।

বিশেষজ্ঞ মতামত: বহুবাদী রাষ্ট্রবিজ্ঞানী লাস্কি (Laski)-এর মতে, "যেহেতু সমাজ যুক্তরাষ্ট্রীয় (Federal), তাই কর্তৃপক্ষও যুক্তরাষ্ট্রীয় হওয়া উচিত।" অর্থাৎ ক্ষমতা এক জায়গায় কুক্ষিগত না রেখে ভাগ করে দেওয়া উচিত।

একত্ববাদ বনাম বহুবাদী মতবাদ: তুলনামূলক পার্থক্য

তাত্ত্বিক দিক থেকে এই দুটি মতবাদ সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী। নিচে এদের প্রধান পার্থক্যগুলো ছকের মাধ্যমে দেখানো হলো:

বিষয় একত্ববাদী মতবাদ বহুবাদী মতবাদ
ক্ষমতার উৎস রাষ্ট্রই একমাত্র ও চরম ক্ষমতার উৎস। রাষ্ট্র ও অন্যান্য সংঘের মধ্যে ক্ষমতা ভাগ করা থাকে।
আইন সার্বভৌমের আদেশই আইন। আইন সামাজিক প্রয়োজনের প্রতিফলন, রাষ্ট্র আইনের অধীন।
বিভাজ্যতা সার্বভৌমত্ব অবিভাজ্য। সার্বভৌমত্ব বিভাজ্য ও বিকেন্দ্রীভূত।
প্রকৃতি ক্ষমতা অসীম ও স্বৈরাচারী হতে পারে। ক্ষমতা সীমিত ও গণতান্ত্রিক।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তাত্ত্বিক প্রয়োগ (Local Context)

বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্র একক ও অবিভাজ্য ক্ষমতার অধিকারী, যা একত্ববাদী ধারণার সাথে মিলে যায়। কিন্তু বাস্তবে বাংলাদেশ একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে বহুবাদী চর্চাকে উৎসাহিত করে। এখানে এনজিও (NGO), মানবাধিকার সংগঠন, ব্যবসায়িক সমিতি এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাধীনভাবে কাজ করে এবং সরকারি সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করে। অর্থাৎ, সাংবিধানিকভাবে একত্ববাদ থাকলেও প্রায়োগিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশে বহুবাদী সমাজের বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান।

উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, জন অস্টিনের একত্ববাদী মতবাদ আইনের দৃষ্টিতে সঠিক হলেও সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিতে অসম্পূর্ণ। আধুনিক জটিল সমাজব্যবস্থায় রাষ্ট্র একাই সব চাহিদা পূরণ করতে পারে না। তাই বহুবাদী ধারণা বর্তমানে বেশি গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছে। তবে রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা ও ঐক্যের জন্য একটি কেন্দ্রীয় সার্বভৌম কর্তৃপক্ষের প্রয়োজনীয়তাকেও অস্বীকার করা যায় না। একত্ববাদ ও বহুববাদের সমন্বয়েই একটি আদর্শ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠিত হতে পারে।

আপনি কি মনে করেন রাষ্ট্রের হাতেই সব ক্ষমতা থাকা উচিত, নাকি ক্ষমতা ভাগ করে দেওয়া ভালো? নিচে কমেন্ট করুন।

Post a Comment

0 Comments

Post a Comment (0)

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Check Out
Ok, Go it!