সার্বভৌমত্ব কি? সংজ্ঞা, বৈশিষ্ট্য ও প্রকারভেদ

একটি রাষ্ট্র গঠিত হয় চারটি মূল উপাদানের সমন্বয়ে—জনসমষ্টি, নির্দিষ্ট ভূখণ্ড, সরকার এবং সার্বভৌমত্ব। এর মধ্যে সার্বভৌমত্বকে বলা হয় রাষ্ট্রের প্রাণ। দেহের মধ্যে যেমন প্রাণ না থাকলে তা জড়বস্তুতে পরিণত হয়, তেমনি সার্বভৌমত্ব ছাড়া রাষ্ট্রের অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না। এই চরম ক্ষমতার বলেই রাষ্ট্র তার অভ্যন্তরীণ সকল প্রতিষ্ঠানকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং বহিঃশত্রুর হাত থেকে নিজেকে মুক্ত রাখে। আজকের ব্লগে আমরা জানব সার্বভৌমত্ব কাকে বলে, এর বৈশিষ্ট্যসমূহ এবং এর বিভিন্ন রূপ যেমন—আইনগত, রাজনৈতিক ও জনগণের সার্বভৌমত্ব।
- সার্বভৌমত্ব হলো রাষ্ট্রের চরম, চূড়ান্ত ও অবিভাজ্য ক্ষমতা।
- এটি রাষ্ট্রের স্থায়িত্ব ও অনন্যতার প্রতীক।
- আইনগত সার্বভৌমত্ব পার্লামেন্ট বা আইনসভার হাতে থাকে।
- গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জনগণই সার্বভৌম ক্ষমতার প্রকৃত উৎস।
সার্বভৌমত্ব কি? (Definition of Sovereignty)
সার্বভৌমত্ব শব্দটি ইংরেজি 'Sovereignty'-এর বাংলা প্রতিশব্দ। এই ইংরেজি শব্দটি এসেছে ল্যাটিন শব্দ 'Superanus' থেকে, যার অর্থ সর্বশ্রেষ্ঠ বা পরম। ব্যুৎপত্তিগত অর্থে, রাষ্ট্রের চরম ও চূড়ান্ত ক্ষমতাই হলো সার্বভৌমত্ব।
প্রামাণ্য সংজ্ঞা
বিভিন্ন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী সার্বভৌমত্বকে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে সংজ্ঞায়িত করেছেন:
এছাড়াও অধ্যাপক বার্জেস বলেন, "সকল ব্যক্তি, প্রজা এবং সংঘের উপর মৌলিক, চরম ও সীমাহীন ক্ষমতা হলো সার্বভৌমত্ব।" অন্যদিকে উইলোবি-এর মতে, "রাষ্ট্রের চূড়ান্ত ইচ্ছাই হচ্ছে সার্বভৌমত্ব।"
সার্বভৌমত্বের বৈশিষ্ট্যসমূহ
সার্বভৌম ক্ষমতার প্রকৃতি বিশ্লেষণ করলে এর কিছু সুনির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়, যা একে অন্যান্য ক্ষমতা থেকে আলাদা করে। নিচে প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো আলোচনা করা হলো:
১. মৌলিকত্ব ও চরমত্ব
সার্বভৌম ক্ষমতা মৌলিক এবং চরম। রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে এই ক্ষমতার উপরে আর কোনো ক্ষমতা নেই। সকল ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর এই ক্ষমতা অবাধ ও চূড়ান্তভাবে কার্যকর হয়।
২. স্থায়িত্ব ও অবিনশ্বরতা
রাষ্ট্র যতদিন টিকে থাকে, সার্বভৌমত্বও ততদিন স্থায়ী হয়। সরকার পরিবর্তিত হতে পারে, কিন্তু সার্বভৌমত্ব নষ্ট হয় না। সার্বভৌম ক্ষমতার বিনাশ মানেই রাষ্ট্রের বিনাশ।
৩. সর্বজনীনতা
রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে অবস্থানরত সকল নাগরিক, প্রতিষ্ঠান ও সংঘের ওপর সার্বভৌম ক্ষমতা প্রযোজ্য। একমাত্র বিদেশি কূটনীতিকরা আন্তর্জাতিক প্রথা অনুযায়ী এর আওতামুক্ত থাকেন।
৪. অবিভাজ্যতা ও অহস্তান্তরযোগ্যতা
সার্বভৌমত্বকে ভাগ করা যায় না। একে খণ্ড খণ্ড করলে রাষ্ট্র ধ্বংস হয়ে যায়। এটি একটি একক সত্তা। তাছাড়া, মানুষ যেমন তার প্রাণ হস্তান্তর করতে পারে না, রাষ্ট্রও তার সার্বভৌমত্ব অন্যকে দিতে পারে না।
সার্বভৌমত্বের প্রকারভেদ: আইনগত, রাজনৈতিক ও জনগণ
সার্বভৌমত্ব এক হলেও এর প্রকাশের মাধ্যম ভিন্ন হতে পারে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে প্রধানত তিন ধরণের সার্বভৌমত্বের কথা বলা হয়:
ক. আইনগত সার্বভৌমত্ব (Legal Sovereignty)
রাষ্ট্রের যে কর্তৃপক্ষের আইন তৈরির চূড়ান্ত ক্ষমতা রয়েছে, তাকে আইনগত সার্বভৌম বলে। যেমন—বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ। জন অস্টিনের মতে, নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশই আইন এবং জনগণ স্বভাবগতভাবে তা মেনে চলে। আইনের দৃষ্টিতে এই ক্ষমতা অসীম ও অবাধ।
খ. রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব (Political Sovereignty)
আইনগত সার্বভৌম যার কাছে নতি স্বীকার করে, তাই রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নির্বাচকমণ্ডলী বা ভোটাররাই মূলত রাজনৈতিক সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী। জনমত, নির্বাচন এবং সমাবেশের মাধ্যমে এটি প্রকাশিত হয়। অধ্যাপক ডাইসি বলেন, "আইনগত সার্বভৌম যার ইচ্ছার প্রতি শেষ পর্যন্ত নতি স্বীকার করে, তাই রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব।"
গ. জনগণের সার্বভৌমত্ব (Popular Sovereignty)
এই মতবাদ অনুসারে, জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস। ফরাসি দার্শনিক রুশো এই মতবাদের প্রধান প্রবক্তা। আধুনিক গণতন্ত্রে এই ধারণাটি সবচেয়ে শক্তিশালী। এখানে বিশ্বাস করা হয় যে, সার্বভৌম ক্ষমতা কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা রাজার হাতে নয়, বরং জনগণের সমষ্টিগত ইচ্ছার (General Will) ওপর ন্যস্ত।
বিশেষজ্ঞ মতামত: অধ্যাপক রিচ (Ritchie)-এর মতে, সার্বভৌমত্বের সর্বশেষ রূপ হচ্ছে 'গায়ের জোর', আর সমষ্টিগতভাবে জনগণের গায়ের জোরই সবচেয়ে বেশি। তাই শেষ বিচারে জনগণই সার্বভৌম।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সার্বভৌমত্ব (Local Context)
বাংলাদেশের সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ। অর্থাৎ, বাংলাদেশে 'জনগণের সার্বভৌমত্ব' স্বীকৃত। তবে এই ক্ষমতার প্রয়োগ হয় নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে জাতীয় সংসদে, যা 'আইনগত সার্বভৌমত্ব'-এর উদাহরণ। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের মানচিত্রে স্থান করে নেয়। বর্তমানে অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা রক্ষা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক স্থাপনে বাংলাদেশ তার সার্বভৌম ক্ষমতার পূর্ণ প্রয়োগ করছে।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, সার্বভৌমত্ব রাষ্ট্রের অস্তিত্বের ভিত্তি। এটি চরম, চূড়ান্ত, স্থায়ী এবং অবিভাজ্য। আইনগত সার্বভৌমত্ব রাষ্ট্র পরিচালনা করে, আর রাজনৈতিক ও জনগণের সার্বভৌমত্ব তাকে নিয়ন্ত্রণ করে। আধুনিক গণতান্ত্রিক বিশ্বে জনগণের ইচ্ছাই সার্বভৌমত্বের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচিত হয়।
সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা কি কেবল সরকারের দায়িত্ব, নাকি নাগরিকেরও? আপনার মতামত নিচে কমেন্ট করে জানান।