এসএসসি ও দাখিল বাংলা ১ম পত্র পরীক্ষায় কাঙ্ক্ষিত এ প্লাস (A+) অর্জনে গদ্যাংশের ৫০ নম্বরের সৃজনশীল (Prose CQ) অংশে পূর্ণ নম্বর পাওয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আল ফাতাহ ২০২৭ প্রশ্নপত্র সাজেশন ও শীর্ষ বোর্ড পরীক্ষার আলোকে তৈরি এই গদ্যাংশ সৃজনশীল প্রশ্নব্যাংকে প্রত্যুপকার, সুভা, বই পড়া, নিমগাছ থেকে শুরু করে নতুন অন্তর্ভুক্ত 'আমাদের নতুন গৌরবগাথা' পর্যন্ত প্রতিটি অধ্যায়ের প্রতিটি উদ্দীপকের ক, খ, গ, ঘ স্তরের পূর্ণাঙ্গ নির্ভুল সমাধান তুলে ধরা হলো। প্রতিটি প্রশ্ন ক্লিক-টু-রিভিল ড্রপডাউনে সাজানো হয়েছে যাতে শিক্ষার্থীরা নিজে আগে উত্তর ভেবে পরে মিলিয়ে নিতে পারে।
গদ্যাংশ সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর লেখার পরীক্ষিত কৌশল ও মানবণ্টন (Prose CQ Exam Strategy)
এসএসসি ও দাখিল বাংলা ১ম পত্র পরীক্ষায় গদ্যাংশ বিভাগ থেকে মোট ৪টি সৃজনশীল প্রশ্ন থাকবে, যার মধ্য থেকে ন্যূনতম ২টি প্রশ্নের উত্তর দেওয়া বাধ্যতামূলক। সৃজনশীল প্রশ্নের ১০ নম্বরে পূর্ণ ১০ পেতে হলে ৪টি স্তরের সঠিক বিন্যাস জানা অপরিহার্য:
| প্রশ্নের স্তর | মান | প্যারা সংখ্যা | পরীক্ষকের চাহিদা ও লেখার সুনির্দিষ্ট নিয়ম |
|---|---|---|---|
| (ক) জ্ঞানমূলক | ১ নম্বর | ১টি পূর্ণ বাক্য | পাঠ্যবইয়ের তথ্য অনুযায়ী একদম সরাসরি ও নির্ভুল ১ বাক্যে উত্তর দিতে হবে। অপ্রয়োজনীয় ভূমিকা বর্জনীয়। |
| (খ) অনুধাবনমূলক | ২ নম্বর | ২টি প্যারা | প্রথম প্যারায় প্রশ্নের মূলভাব ১ বাক্যে লিখতে হবে। দ্বিতীয় প্যারায় পাঠ্যপ্রসঙ্গ টেনে ৪-৫ লাইনে বুঝিয়ে লিখতে হবে। |
| (গ) প্রয়োগমূলক | ৩ নম্বর | ৩টি প্যারা | ১ম প্যারা: জ্ঞানমূলক মূল বক্তব্য। ২য় প্যারা: পাঠ্যবইয়ের সংশ্লিষ্ট গল্পের প্রেক্ষাপট। ৩য় প্যারা: উদ্দীপকের সাথে সাদৃশ্য বা বৈসাদৃশ্যের তুলনামূলক বিশ্লেষণ। |
| (ঘ) উচ্চতর দক্ষতা | ৪ নম্বর | ৪টি প্যারা | ১ম প্যারা: সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা। ২য় প্যারা: পাঠ্যবইয়ের সামগ্রিক সুর। ৩য় প্যারা: উদ্দীপকের গভীর তাৎপর্য। ৪র্থ প্যারা: তুলনামূলক সিদ্ধান্ত ও সামগ্রিক মূল্যায়ন। |
সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ স্টাডি লিংক (Study Hub):
• আপনি কি বহুনির্বাচনি প্রস্তুতি খুঁজছেন? দেখুন:
এসএসসি বাংলা ১ম পত্র গদ্যাংশ বহুনির্বাচনি প্রশ্নব্যাংক (২৬৭টি MCQ)
• সম্পূর্ণ ১০০ নম্বরের মাস্টার গাইড:
SSC বাংলা ১ম পত্র চূড়ান্ত সুপার সাজেশন ও নতুন মানবণ্টন ২০২৭
অধ্যায়ভিত্তিক গদ্যাংশ সৃজনশীল প্রশ্নব্যাংক ও সমাধান (Chapter-wise Prose CQ Bank)
নিচে আল ফাতাহ দাখিল সাজেশন ও শীর্ষ বোর্ড পরীক্ষার আলোকে প্রতিটি অধ্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ উদ্দীপক এবং প্রতিটি প্রশ্নের ক, খ, গ, ঘ স্তরের পূর্ণাঙ্গ নির্ভুল সমাধান তুলে ধরা হলো:
অধ্যায় ০১: প্রত্যুপকার — ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
রফিকের ব্যবসায় হঠাৎ বড় লোকসান হলে সে সর্বস্বান্ত হয়ে চরম অর্থসংকটে পড়ে। এই দুঃসময়ে তার পূর্বপরিচিত জামিল সাহেব তাকে আশ্রয় দেন এবং নিঃশর্তভাবে প্রয়োজনীয় মূলধন দিয়ে আবার ঘুরে দাঁড়াতে সাহায্য করেন। কিছুদিন পর জামিল সাহেব এক মিথ্যা মামলায় অভিযুক্ত হয়ে ফেরারি হন। তখন রফিক নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে জামিল সাহেবকে নিরাপদ আশ্রয়ে গোপন রেখে তার নির্দোষিতা প্রমাণে আইনি লড়াই পরিচালনা করে এবং তাকে মুক্ত করে আনে।
মডেল উত্তর ও পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা দেখুন (Click to View Answer)
'প্রত্যুপকার' গল্পে দেখা যায়, আলী ইবনে আব্বাস যখন চরম বিপদে পড়ে দামেস্কের এক অচেনা ব্যক্তির বাড়িতে আশ্রয় নেন, তখন সেই ব্যক্তি নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আলীকে আশ্রয় দেন। পরবর্তীতে যখন সেই ব্যক্তি খলিফার হাতে বন্দী হয়ে মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি হন, তখন আলী ইবনে আব্বাস নিজের জীবন বাজি রেখে খলিফার কাছে সেই বন্দীর মুক্তির জন্য আকুল আবেদন জানান।
উদ্দীপকের রফিকও ঠিক একইভাবে জামিল সাহেবের পূর্বকৃত ঋণ ও উপকারের কথা ভোলেনি। জামিল সাহেব যখন মিথ্যা মামলায় ফেঁসে যান, তখন রফিক জীবনের ঝুঁকি নিয়ে জামিল সাহেবের পাশে দাঁড়ায়। সুতরাং, উপকারীর প্রতি কৃতজ্ঞতা ও প্রতিদান দেওয়ার দিক থেকে উদ্দীপকের রফিক 'প্রত্যুপকার' গল্পের আলী ইবনে আব্বাসের প্রতিচ্ছবি।
বিদ্যাসাগরের 'প্রত্যুপকার' গল্পে আশ্রয়দাতা ব্যক্তি আলী ইবনে আব্বাসকে যেমন অচেনা হওয়া সত্ত্বেও পরম যত্নে রক্ষা করেছিলেন, তেমনি আলী ইবনে আব্বাসও সুযোগ পাওয়া মাত্র চরম কৃতজ্ঞতায় নিজের জীবনের বিনিময়ে হলেও সেই আশ্রয়দাতার জীবন রক্ষা করার চেষ্টা করেছিলেন। এই পারস্পরিক মানবতা ও মহত্ত্বই গল্পটিকে কালোত্তীর্ণ করেছে।
উদ্দীপকে জামিল সাহেব রফিককে দুঃসময়ে নিঃশর্ত আর্থিক সহায়তা দিয়ে বাঁচিয়েছেন, যা গল্পের আশ্রয়দাতার মহানুভবতার সমতুল্য। অন্যদিকে রফিকও জামিল সাহেবের বিপদে নিজের সর্বস্ব দিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছে, যা আলী ইবনে আব্বাসের প্রত্যুপকারের সমতুল্য।
অতএব, নিঃস্বার্থভাবে অন্যের পাশে দাঁড়ানো এবং বিপদের দিনে উপকারের মর্যাদা রক্ষা করার যে শাশ্বত আবেদন বিদ্যাসাগর তাঁর রচনায় তুলে ধরেছেন, জামিল সাহেব ও রফিকের পারস্পরিক সম্পর্কের মাঝে তারই সার্থক ও জীবন্ত প্রতিফলন ঘটেছে।
দৃশ্যপট ১: সামাদ সাহেব গ্রামের এক দরিদ্র এতিম ছেলেকে নিজের সন্তানের মতো লালন-পালন করে উচ্চশিক্ষিত করেন। পরবর্তীতে সেই ছেলেটি বড় কর্মকর্তা হয়ে সামাদ সাহেবের খোঁজখবর রাখা বন্ধ করে দেয়।
দৃশ্যপট ২: অন্যদিকে আকবর আলী নৌকায় নদী পার হওয়ার সময় এক মাঝিকে ডুবে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন। বহু বছর পর এক অগ্নিকাণ্ডে যখন আকবর আলীর বাড়ি ভস্মীভূত হতে চলেছিল, তখন সেই মাঝি নিজের জীবনের তোয়াক্কা না করে আকবর আলীর পরিবারকে আগুন থেকে উদ্ধার করে।
মডেল উত্তর ও পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা দেখুন (Click to View Answer)
পাঠ্যবইয়ে আলী ইবনে আব্বাস দামেস্কের আশ্রয়দাতার মহানুভবতা সারা জীবন স্মরণে রেখেছিলেন এবং খলিফার দরবারে সেই ব্যক্তির জীবন বাঁচাতে নিজের জীবন উৎসর্গ করতেও কুণ্ঠাবোধ করেননি।
দৃশ্যপট-২ এর মাঝিটিও অতীতে আকবর আলীর দ্বারা জীবন ফিরে পেয়েছিল। বহু বছর পরও সে সেই ঋণ ভুলে যায়নি, বরং আকবর আলীর পরিবার যখন অগ্নিকাণ্ডে বিপন্ন, তখন নিজের জীবনের পরোয়া না করে সে তাঁদের উদ্ধার করে। সুতরাং, অতীত উপকারের প্রতিদান নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে মাঝির আচরণ আলী ইবনে আব্বাসের মহৎ চরিত্রের সাথে সমান্তরাল।
'প্রত্যুপকার' গল্পের মূল প্রতিপাদ্য হলো উপকারীর প্রতি আজীবন কৃতজ্ঞ থাকা এবং বিপদের দিনে তাঁর প্রতিদান দেওয়া। অথচ দৃশ্যপট-১ এর এতিম ছেলেটি লালন-পালনকারী সামাদ সাহেবের উপকার ভুলে গিয়ে চরম অকৃতজ্ঞতার পরিচয় দিয়েছে। এটি গল্পের আদর্শের সম্পূর্ণ বিপরীত ও নৈতিকতাবিরোধী চিত্র।
বিপরীতে, দৃশ্যপট-২ এর মাঝি আকবর আলীর অতীত জীবন বাঁচানোর ঋণকে স্মরণে রেখে অগ্নিকাণ্ডের চরম মুহূর্তে নিজের জীবনের মায়া ত্যাগ করে পরিবারটিকে বাঁচিয়েছে। মাঝির এই নিঃস্বার্থ প্রতিদানই মূলত বিদ্যাসাগরের 'প্রত্যুপকার' গল্পের শাশ্বত দর্শনকে সার্থকভাবে মূর্ত করে তুলেছে।
সুতরাং, দৃশ্যপট-১ যেখানে অকৃতজ্ঞতার নেতিবাচক রূপ তুলে ধরে, সেখানে দৃশ্যপট-২ আত্মত্যাগী প্রত্যুপকারের চিরন্তন আদর্শকে সমুন্নত করেছে—তাই উক্তিটি যথার্থ।
অধ্যায় ০২: সুভা — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
দশম শ্রেণির ছাত্রী মিনুর কথা বলার শক্তি নেই। তার বয়স যখন সাত, তখন তার মা মারা যায়। সৎ মা মিনুকে পরিবারের বোঝা মনে করে এবং কথায় কথায় অবহেলা করে। কথা বলতে না পারলেও মিনু বাড়ির পোষা বিড়াল ও কবুতরদের নিজের পরম বন্ধু মনে করে। নদীর পাড়ে বসে খোলা আকাশের দিকে তাকিয়ে সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। কিন্তু পরিবারের লোকেরা তাকে দ্রুত বিয়ে দিয়ে দায়মুক্ত হতে চায়। মিনু অশ্রুসজল চোখে নদীর দিকে তাকিয়ে নিজের মনের না-বলা কথা প্রকাশ করে।
মডেল উত্তর ও পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা দেখুন (Click to View Answer)
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'সুভা' গল্পে বাকপ্রতিবন্ধী সুভা মানুষের সমাজে অবহেলিত ও উপেক্ষিত ছিল। সহপাঠী বা সমবয়সীরা তার সাথে মিশত না। তাই সে গোয়ালঘরের দুই গাভী সর্বশী ও পাঙ্গুলির কাছে গিয়ে নিজের মনের না-বলা ভাষা প্রকাশ করত এবং নির্বাক প্রকৃতির মাঝে আশ্রয় খুঁজত।
উদ্দীপকের মিনুও বাকপ্রতিবন্ধী এবং সৎ মায়ের অবহেলার শিকার হয়ে সে গৃহপালিত বিড়াল, কবুতর ও নদীর প্রকৃতির মাঝে নিজের দুঃখ ভাগাভাগি করে নেয়। বাকহীনতা এবং পশুপাখির সাথে আত্মিক সংযোগের দিক দিয়ে মিনু ও সুভা অভিন্ন অনুভূতির অংশীদার।
'সুভা' গল্পে সমাজ সুভাকে কোনোদিন মানুষ হিসেবে হৃদয় দিয়ে অনুভব করেনি। সুভার বাবা বাণীকণ্ঠ তাকে কিছুটা ভালোবাসলেও সমাজের চাপে এবং বিয়ের নামে তাকে এক অচেনা পরিবেশে নির্বাসিত করতে বাধ্য হন। সুভা যখন বিদায়ের আগে নদীর ঘাসে লুটিয়ে পড়ে নির্বাকভাবে আকুল মিনতি জানায়, তখন তা বিশ্বজনীন মানবিক বেদনার রূপ ধারণ করে।
উদ্দীপকের মিনুও একই নিয়তির শিকার। তার বাকপ্রতিবন্ধিতা তাকে পরিবারে অবাঞ্ছিত করে তুলেছে এবং দায়মুক্তির তাড়নায় তাকেও জোরপূর্বক বিয়ে দিয়ে বিদায় করার ষড়যন্ত্র চলছে। মিনুর অশ্রুসজল দৃষ্টি সুভার মতোই সমাজের নির্দয় বাস্তবতার বিরুদ্ধে এক নীরব প্রতিবাদ।
অতএব, মিনুর বেদনা ও অশ্রুসজল চাহনির মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সৃষ্ট সুভা চরিত্রের শাশ্বত নির্বাক হাহাকার ও আত্মিক ক্রন্দনই পুনর্বার ফুটে উঠেছে।
অধ্যায় ০৩: বই পড়া — প্রমথ চৌধুরী
বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারী তানভীর কেবল চাকরির পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য নির্দিষ্ট সিলেবাসের গাইড বই মুখস্থ করে। সে সাহিত্য, দর্শন বা ইতিহাসের কোনো অতিরিক্ত বই স্পর্শও করে না। তার মতে, 'যে বই পড়ে টাকা বা সার্টিফিকেট পাওয়া যায় না, তা পড়া সময়ের অপচয়।' অন্যদিকে তার সহপাঠী ফারহান নিয়মিত পাবলিক লাইব্রেরিতে গিয়ে বিশ্বসাহিত্যের বই পড়ে এবং তার বিশ্বাস, সার্টিফিকেট নয়—জ্ঞান অর্জন ও অন্তরের প্রসারতাই মানুষের আসল পরিচয়।
মডেল উত্তর ও পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা দেখুন (Click to View Answer)
প্রমথ চৌধুরী তাঁর প্রবন্ধে স্পষ্ট বলেছেন যে, আমাদের দেশে তথাকথিত শিক্ষিত সম্প্রদায় জ্ঞানার্জনের আনন্দ নয়, বরং চাকরির বাজারে দর বাড়ানোর জন্যই কেবল পাস করা বই পড়ে। তারা সাহিত্যচর্চাকে অনাবশ্যক ও অপচয় মনে করে।
উদ্দীপকের তানভীরও ঠিক একই দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে সার্টিফিকেট ও নগদ টাকার মাপকাঠিতে বই পড়ার প্রয়োজনীয়তা বিচার করছে। এটি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার সেই অবক্ষয়িত রূপকেই মূর্ত করে তোলে যেখানে জ্ঞান নয়, অর্থলিপ্সাই শিক্ষার প্রধান মানদণ্ড হয়ে দাঁড়ায়।
প্রাবন্ধিকের মতে, সুশিক্ষিত লোক মাত্রই স্বশিক্ষিত। মানুষ যখন স্বেচ্ছায় এবং আনন্দের সাথে বই পড়ে, তখনই তার মনের দিগন্ত প্রসারিত হয়। আত্মার তৃপ্তির জন্য যে শিক্ষা, তাই প্রকৃত শিক্ষা। আর এই শিক্ষা অর্জনের সর্বোৎকৃষ্ট স্থান হলো লাইব্রেরি।
উদ্দীপকের ফারহান সার্টিফিকেটের মোহমুক্ত হয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে লাইব্রেরিতে গিয়ে জ্ঞানপিপাসা মেটায়। সে বুঝতে পেরেছে যে বৈষয়িক লাভের চেয়ে মনকে আলোকিত করা এবং সুকুমার বৃত্তির বিকাশ ঘটানোই শিক্ষার আসল স্বার্থকতা।
অতএব, প্রমথ চৌধুরী সমাজে যে ধরনের স্বাধীন ও স্বশিক্ষিত রুচিশীল পাঠকশ্রেণি গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছিলেন, ফারহানের জীবনাচরণে তারই বাস্তব প্রতিফলন ঘটেছে। তাই সে প্রাবন্ধিকের ভাবনার যথার্থ উত্তরসূরি।
অধ্যায় ০৪: নিরীহ বাঙালি — রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
একটি গ্রামে কৃষক ও যুবসমাজ সারা দিন চায়ের দোকানে আড্ডা দিয়ে রাজনৈতিক তর্কবিতর্কে সময় কাটায়। তারা বিদেশে গিয়ে বড় কিছু করার বা নিজেদের জমিতে কঠোর পরিশ্রম করে আধুনিক চাষাবাদ করার স্বপ্ন দেখে না। কোনো বিপদ-আপদ আসলে তারা ভাগ্যের দোহাই দিয়ে ঘরে লুকিয়ে থাকে এবং বলে, 'দুবেলা ডাল-ভাত পেলেই আমাদের চলে, এর চেয়ে বেশি চেয়ে অশান্তি ডেকে এনে লাভ কী!'
মডেল উত্তর ও পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা দেখুন (Click to View Answer)
রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন দেখিয়েছেন যে, বাঙালি জাতি কাজে নয়, কথায় পটু। তারা একটু স্বস্তির জন্য নিজের ভবিষ্যৎ বিসর্জন দিতে প্রস্তুত থাকে এবং বড় কোনো অর্জনের জন্য ঘাম ঝরাতে ভয় পায়।
উদ্দীপকের যুবকেরাও চাষাবাদ বা উদ্ভাবনী কাজের চেয়ে চায়ের দোকানে আড্ডাকে শ্রেয় মনে করে এবং অলসভাবে বেঁচে থাকাকেই শান্তি মনে করে। এটি প্রবন্ধে চিত্রিত নিরীহ বাঙালির অবিকল রূপ।
'নিরীহ বাঙালি' প্রবন্ধে লেখিকা তীব্র শ্লেষের সাথে বাঙালির আত্মঘাতী শান্তিবাদকে বিদ্রূপ করেছেন। বাঙালি নিজের আরামের জন্য দাসত্ব মেনে নেয় কিন্তু মুক্তির সংগ্রামে নামতে ভয় পায়। উদ্দীপকের যুবকেরাও ভাগ্যের ওপর দায় চাপিয়ে অকর্মণ্য জীবন কাটাচ্ছে।
পরিশেষে বলা যায়, কেবল অলস শান্তি ও অল্পে তুষ্ট থাকার এই মানসিকতা ভাঙতে না পারলে কোনো জাতি সমৃদ্ধির সোপানে আরোহণ করতে পারে না। তাই জাতীয় উন্নয়নের জন্য এই নির্লিপ্ততা ত্যাগ করা অপরিহার্য।
অধ্যায় ০৫: মানুষ মুহম্মদ (স.) — মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী
এক প্রভাবশালী নেতা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে দীর্ঘদিন নির্বাসিত ছিলেন। পরবর্তী সময়ে দেশে ফিরে যখন তিনি বিপুল ক্ষমতার অধিকারী হন, তখন তাঁর অনুসারীরা অতীতের নির্যাতনকারীদের কঠোর শাস্তির দাবি জানায়। কিন্তু সেই নেতা অতীতের সকল অন্যায় ও লাঞ্ছনা ক্ষমা করে দিয়ে বিরোধীদের আলিঙ্গন করেন এবং বলেন, 'প্রতিশোধের আগুনে নতুন সমাজ গড়া যায় না; ক্ষমা ও ভালোবাসাই বিজয়ের শ্রেষ্ঠ অস্ত্র।' এমনকি বিরোধীদের বিপদে তিনি নিজে এগিয়ে যান।
মডেল উত্তর ও পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা দেখুন (Click to View Answer)
মক্কা বিজয়ের পর মহানবী (স.) চাইলে কুরাইশদের অতীতের সকল জুলুম, নির্যাতন ও হত্যাযজ্ঞের প্রতিশোধ নিতে পারতেন। কিন্তু তিনি সর্বজনীন সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে বলেছিলেন, 'আজ তোমাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই।' তিনি শত্রুদেরও ভালোবেসে আপন করে নিয়েছিলেন।
উদ্দীপকের নেতাও ক্ষমতায় ফিরে প্রতিশোধ না নিয়ে অতীতের সকল নির্যাতন ক্ষমা করে বিরোধীদের আপন করে নিয়েছেন। এই আচরণ মহানবীর মক্কা বিজয়ের সুমহান ক্ষমার আদর্শকেই স্মরণ করিয়ে দেয়।
মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী দেখিয়েছেন, তায়েফের ময়দানে রক্তক্ষরণের পরও নবীজি তাদের ধ্বংস চাননি, বরং তাদের হেদায়াতের জন্য দোয়া করেছেন। শত্রুর বিষাক্ত বাণের জবাবে তিনি স্নেহের বারি বর্ষণ করেছিলেন। এই মানবিক ঔদার্যই আরবের বর্বর জাতিকে শ্রেষ্ঠ সভ্যতায় রূপান্তর করেছিল।
উদ্দীপকের নেতাও প্রতিশোধের পরিবর্তে ক্ষমাকে আলিঙ্গন করে সমাজে সৌহার্দ্য ও শান্তির পরিবেশ সৃষ্টি করেছেন।
সুতরাং, হিংসা ও প্রতিশোধের বিপরীতে অহিংস মানবিকতা ও ক্ষমার শক্তিতে সমাজ পুনর্গঠন করার দিক থেকে প্রবন্ধ ও উদ্দীপকের বক্তব্য একই মোহনায় মিলিত হয়েছে।
অধ্যায় ০৬: নিমগাছ — বনফুল
সালমা বেগম শ্বশুরবাড়ির সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত প্রতিটি সদস্যের রান্না-বান্না, সেবা-যত্ন ও ঘরের সব কাজ একহাতে সামলান। নিজের শারীরিক অসুস্থতা থাকলেও তিনি কখনো মুখ ফুটে অভিযোগ করেন না। পরিবারের সবাই তার হাতের রান্না খেয়ে প্রশংসা করে, কিন্তু তার ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখ বা চিকিৎসার খবর কেউ রাখে না। তিনি যেন সংসারের এমন এক অপরিহার্য ছায়া, যাকে সবাই ব্যবহার করে কিন্তু হৃদয়ের মর্যাদা কেউ দেয় না।
মডেল উত্তর ও পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা দেখুন (Click to View Answer)
বনফুলের রূপক গল্পে নিমগাছ যেমন মানুষের উপকারে নিঃস্বার্থভাবে নিবেদিত থাকে—তার পাতা, বাকল, বাতাস মানুষকে রোগমুক্ত রাখে, অথচ কেউ তার যত্ন নেয় না। ঠিক তেমনি সংসারের লক্ষ্মী বউটিও আজীবন পরিবারের সকলের সেবা করে যায় কিন্তু নিজের জন্য একবিন্দু সহানুভূতিও পায় না।
উদ্দীপকের সালমা বেগমও ভোর থেকে রাত পর্যন্ত সংসারের সবার চাহিদা পূরণ করলেও তার অসুস্থতা বা মনোকষ্টের দিকে কেউ ফিরে তাকায় না। নিঃস্বার্থ ত্যাগ ও পারিবারিক চরম অবহেলার দিক থেকে সালমা বেগম নিমগাছ গল্পের সেই গৃহবধূরই বাস্তব রূপ।
গল্পে কবি নিমগাছের রূপ দেখে চলে যায়, নিমগাছের ইচ্ছা হলেও সে কবির সাথে চলে যেতে পারে না, কারণ তার শিকড় মাটির গভীরে ছড়িয়ে পড়েছে। ঠিক তেমনি গৃহবধূটিরও চারদিকে সংসারের মায়াজালে আবদ্ধ থাকার কারণে সমস্ত অবহেলা সহ্য করেও কোথাও চলে যাওয়ার উপায় থাকে না।
উদ্দীপকের সালমা বেগমও এই স্বার্থান্ধ সমাজের জাঁতাকলে পিষ্ট এক জীবন্ত প্রতীক। সমাজ নারীকে শুধু সেবাদাসী হিসেবে দেখতে অভ্যস্ত, কিন্তু তার অন্তরের রক্তক্ষরণ উপলব্ধি করতে অক্ষম।
অতএব, প্রতীকী কাঠামোর অন্তরালে সমাজ ও পরিবারের এই নির্লজ্জ স্বার্থপরতাকে উন্মোচিত করার কারণে গল্পটি যথার্থই এক শৈল্পিক চপেটাঘাত।
অধ্যায় ০৭: উপেক্ষিত শক্তির উদ্বোধন — কাজী নজরুল ইসলাম
একটি শহরের পরিচ্ছন্নতাকর্মী, দিনমজুর ও রিকশাচালকরা তাদের ন্যায্য মজুরি ও মানবিক মর্যাদার দাবিতে কর্মবিরতি শুরু করল। মাত্র তিন দিনের মাথায় পুরো শহর আবর্জনার স্তূপে পরিণত হলো এবং অভিজাত নাগরিকরা চরম দুর্ভোগে পড়ল। তখন নগরবাসী বুঝতে পারল যে, যাদের তারা এতদিন 'ছোটলোক' বলে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করত, তাদের শ্রম ছাড়া আধুনিক সভ্যতা এক মুহূর্তও অচল।
মডেল উত্তর ও পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা দেখুন (Click to View Answer)
প্রাবন্ধিক নজরুল দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলেছেন, দশ আনা শক্তির অধিকারী দেশের দিনমজুর ও কৃষকদের বাদ দিয়ে মুষ্টিমেয় ভদ্রলোক দিয়ে কখনো দেশ বা জাতির সত্যিকারের কল্যাণ সাধিত হতে পারে না।
উদ্দীপকে পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের তিন দিনের কর্মবিরতি প্রমাণ করেছে যে, কথিত ছোটলোকদের বাদ দিয়ে তথাকথিত ভদ্রসমাজের অস্তিত্বই বিপন্ন। এই সত্যটি অনুধাবনের মধ্য দিয়েই প্রবন্ধের মূল সুর জীবন্ত হয়ে উঠেছে।
নজরুল তাঁর প্রবন্ধে শ্রেণিবৈষম্যের বিরুদ্ধে তীব্র বিদ্রোহ ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেছেন, মানুষকে মানুষ হিসেবে ভাই বলে বুকে জড়িয়ে ধরতে হবে। যে পর্যন্ত না দেশের কোটি কোটি উপেক্ষিত মানুষ নিজেদের শক্তি চিনতে পারবে এবং তাদের শ্রমের পূর্ণ মূল্যায়ন পাবে, সে পর্যন্ত স্বাধীনতা অর্থহীন।
উদ্দীপকেও দেখা যায়, শ্রমের মূল্যায়ন না করায় যখন পুরো ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়ে, তখনই তথাকথিত অভিজাতদের চৈতন্যোদয় ঘটে।
সুতরাং, শ্রমজীবী মানুষকে অবহেলা না করে তাদের হাতে হাত মিলিয়ে সাম্যের ভিত্তিতে একাত্ম হতে পারলেই জাতির টেকসই অগ্রগতি সম্ভব—এটাই প্রবন্ধ ও উদ্দীপকের চূড়ান্ত বার্তা।
অধ্যায় ০৮: শিক্ষা ও মনুষ্যত্ব — মোতাহের হোসেন চৌধুরী
বিশিষ্ট ব্যবসায়ী বারেক সাহেব কোটি কোটি টাকার মালিক। দামি গাড়ি, বাড়ি ও বিলাসিতায় তার জীবন ভরপুর হলেও তিনি কর্মচারীদের ঠকিয়ে অর্থ উপার্জন করেন। কোনো বই পড়া, গান শোনা বা মানুষের বিপদে দাঁড়ানোর সময় তার নেই। অন্যদিকে একজন সাধারণ স্কুলশিক্ষক আনোয়ার সাহেব স্বল্প আয়ে জীবন ধারণ করেও ছাত্র-ছাত্রীদের ভালোবাসেন, সাহিত্যের চর্চা করেন এবং মনে-প্রাণে এক গভীর আত্মিক আনন্দ উপভোগ করেন।
মডেল উত্তর ও পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা দেখুন (Click to View Answer)
লেখক বলেছেন, ক্ষুধা-তৃষ্ণা মেটানো এবং ধনসম্পদ আহরণ হলো জীবসত্তার কাজ। যে মানুষ কেবল টাকাপয়সা নিয়ে মেতে থাকে এবং আত্মিক উৎকর্ষের সন্ধান করে না, সে দোতলা ঘরের ওপরের তলায় অর্থাৎ 'মানবসত্তা'য় পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়।
উদ্দীপকের বারেক সাহেব প্রচুর অর্থের মালিক হলেও কর্মচারীদের শোষণ করেন এবং মানসিক আনন্দ থেকে বঞ্চিত। তিনি মানবজীবনের প্রকৃত স্বাদ পাননি, কেবল জৈবিক অস্তিত্ব রক্ষা ও প্রাচুর্য লাভের অন্ধ মোহে আবদ্ধ আছেন।
প্রাবন্ধিক মোতাহের হোসেন চৌধুরী দেখিয়েছেন যে, জীবসত্তার শিকল ভেঙে মানুষকে মানবসত্তায় উন্নীত করার একমাত্র মাধ্যম হলো প্রকৃত শিক্ষা। শিক্ষা মানুষকে আত্মার মুক্তির পথ দেখায় এবং মনুষ্যত্ব অর্জনে সহায়তা করে।
আনোয়ার সাহেব স্বল্প আয়ের মানুষ হওয়া সত্ত্বেও লোভ-লালসামুক্ত হয়ে জ্ঞান ও সুন্দরের সাধনায় মগ্ন। তিনি অন্তরের যে আলো ও স্বস্তি অর্জন করেছেন, তা কোটি টাকার চেয়েও মূল্যবান। তিনি মানবসত্তার মুক্ত বাতাবরণে বাস করছেন।
অতএব, অর্থসাধনা নয়, আত্মসাধনা ও মানবিক মূল্যবোধের চর্চার মাধ্যমেই যে মানুষের আসল মুক্তি নিহিত—আনোয়ার সাহেবের জীবন তারই জীবন্ত দলিল।
অধ্যায় ০৯: প্রবাস বন্ধু — সৈয়দ মুজতবা আলী
প্রবাসী সাংবাদিক তৌহিদ এক পাহাড়ি উপজাতীয় এলাকায় গবেষণার কাজে গিয়ে এক সাধারণ পাহাড়ি তরুণ জুম্মনের কটেজে আশ্রয় নেন। জুম্মন তৌহিদকে নিজের পরিবারের পরম সম্মানিত মেহমান মনে করে। সে দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রমে পাহাড়ের ঝর্ণা থেকে সুমিষ্ট পানি নিয়ে আসে, জংলি মুরগি ও পাহাড়ি ফলমূল দিয়ে বিশাল ভোজে আপ্যায়ন করায়। তৌহিদ এত খাবার খেতে না পারলে জুম্মন অত্যন্ত ব্যথিত হয় এবং পরম ভালোবাসায় তাকে আরও খাওয়ার জন্য অনুরোধ করে।
মডেল উত্তর ও পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা দেখুন (Click to View Answer)
পাঠ্য রচনায় দেখা যায়, আব্দুর রহমান লেখককে পরিবেশন করার সময় বিশালাকার পাত্রে পোলাও, মাংসের রেজালা, কাবাব স্তূপাকার করে নিয়ে আসত। লেখক না খেতে পারলে সে কাতর হয়ে অনুরোধ জানাত। সে মেহমানের তৃপ্তিকেই নিজের জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ আনন্দ মনে করত।
উদ্দীপকের জুম্মনও ঠিক একইভাবে তৌহিদকে পাহাড়ি ফলমূল ও খাদ্যে পরম যত্নে আপ্যায়ন করায় এবং না খেলে ব্যথিত হয়। এই অকৃত্রিম সেবা ও আতিথেয়তা আব্দুর রহমানের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের সাথে হুবহু মিলে যায়।
আব্দুর রহমান পাহাড়ি আফগান জাতির সন্তান। তার চেহারা ও শরীর দানবীয় ও ভীতিকর মনে হলেও তার অন্তর ছিল শিশুর মতো সরল ও মমতাময়। সে মনিবের আরামের জন্য বরফ ভেঙে পানি আনা থেকে শুরু করে সকল কষ্ট হাসিমুখে বরণ করত। লেখকের এক ফোঁটা অস্বস্তিও সে সহ্য করতে পারত না।
উদ্দীপকের পাহাড়ি তরুণ জুম্মনও কঠোর জীবনসংগ্রামের মানুষ হওয়া সত্ত্বেও মেহমানের প্রতি যে গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা প্রদর্শন করেছে, তা তার অন্তরের কোমল রূপকেই প্রকাশ করে।
সুতরাং, শারীরিক রুক্ষতা বা বিশালতার পেছনে যে এক গভীর মানবপ্রেম ও অকৃত্রিম ভালোবাসার উৎস ফল্গুধারার মতো বয়ে চলেছে—তা আব্দুর রহমান ও জুম্মন উভয়ের ক্ষেত্রেই সমান সত্য।
অধ্যায় ১০: মমতাদি — মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
রাশেদা বেগম এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের গৃহবধূ ছিলেন। স্বামীর আকস্মিক মৃত্যু ও ঋণের দায়ে তিনি প্রচণ্ড আর্থিক সংকটে পড়েন। নিরুপায় হয়ে তিনি প্রতিবেশী চৌধুরীদের বাড়িতে কাজের জন্য আসেন। তিনি ঘরের সকল কাজ নিষ্ঠার সাথে করেন, কিন্তু কারও করুণা বা তুচ্ছতাচ্ছিল্য সহ্য করেন না। কোনো বাড়তি অর্থ বা অনুগ্রহ না নিয়ে তিনি কেবল নিজের শ্রমের সঠিক পারিশ্রমিক দাবি করেন। পরিবারের ছোট ছেলেটি তাকে নিজের বড় বোনের মতো ভালোবাসে এবং রাশেদাও তাকে স্নেহে আগলে রাখে।
মডেল উত্তর ও পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা দেখুন (Click to View Answer)
গল্পে মমতাদি অভাবের তাড়নায় গৃহকর্মীর কাজ নিলেও তিনি করুণাপ্রার্থী ছিলেন না। অতিরিক্ত বকশিশ বা অপ্রয়োজনীয় সাহায্য তিনি প্রত্যাখ্যান করতেন এবং নিজের আত্মসম্মানকে সবার ওপরে স্থান দিতেন।
উদ্দীপকের রাশেদা বেগমও সম্ভ্রান্ত পরিবারের হয়েও ভাগ্যের বিপর্যয়ে কাজ করছেন, কিন্তু কারও করুণা নেন না। তিনি শ্রমের সঠিক মূল্য দাবি করেন। এই আত্মমর্যাদাবোধের দিক থেকে রাশেদা ও মমতাদি একই সূত্রে গাঁথা।
'মমতাদি' গল্পে লেখক দেখিয়েছেন, ধনী পরিবারের ছোট ছেলেটির অকৃত্রিম ভালোবাসা এবং মায়ের সহানুভূতিশীল দৃষ্টি মমতাদির মতো এক আত্মমর্যাদাসম্পন্ন গৃহপরিচারিকাকে আপন করে নিয়েছিল। সেখানে মালিক-শ্রমিক দূরত্ব ঘুচে গিয়ে এক পরম পারিবারিক সৌহার্দ্য সৃষ্টি হয়েছিল।
উদ্দীপকেও চৌধুরীদের ছোট ছেলেটির ভালোবাসা রাশেদা বেগমের দুঃখভারাক্রান্ত হৃদয়ে সান্ত্বনার প্রলেপ বুলিয়েছে।
অতএব, ধনী-দরিদ্রের বৈষম্যপূর্ণ সমাজে একমাত্র নিখাদ মানবিক মমতা ও পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধই সামাজিক ভেদাভেদ মুছে দিয়ে এক সুন্দর মানবিক মেলবন্ধন রচনা করতে পারে।
অধ্যায় ১১: একুশের গল্প — জহির রায়হান
১৯৫২ সালের এক কুয়াশাচ্ছন্ন সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র পলাশ মায়ের বারণ উপেক্ষা করে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে মিছিলে যোগ দেয়। ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ছাত্ররা যখন রাজপথে এগিয়ে যায়, তখন পুলিশের নির্মম গুলিবর্ষণে পলাশের বুকের তাজা রক্তে পিচঢালা পথ রঞ্জিত হয়। ছেলের লাশ দেখে গর্ভধারিণী মা চোখের জল মুছে দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, 'আমার ছেলে ভাষার জন্য প্রাণ দিয়ে কোটি মানুষের মুখের ভাষা অমর করে দিয়ে গেছে।'
মডেল উত্তর ও পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা দেখুন (Click to View Answer)
'একুশের গল্প'-এ জহির রায়হান তদানিন্তন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর জারি করা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ছাত্রদের অকুতোভয় মিছিল এবং পুলিশের বুলেটের সামনে বুক পেতে দেওয়ার বীরত্বগাঁথা জীবন্ত করেছেন।
উদ্দীপকের পলাশও মায়ের স্নেহ ও জীবনের মায়া তুচ্ছ করে রাজপথে মিছিলে যোগ দিয়ে শহীদ হয়েছে। এই আত্মত্যাগ ভাষা আন্দোলনের প্রতিটি শহীদের চিরন্তন আত্মদানেরই প্রতিচ্ছবি।
একুশ মানে শোকের অশ্রু নয়, একুশ মানে বীরত্ব ও বিজয়ের শপথ। 'একুশের গল্প'-এ শহীদের আত্মাহুতি জাতিকে মাথানত না করার যে দীক্ষা দিয়েছিল, পলাশের মায়ের কণ্ঠে তারই অনুরণন ঘটেছে। মা শোককে শক্তিতে পরিণত করে ছেলের আত্মত্যাগকে কোটি বাঙালির মুক্তির প্রেরণা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
সুতরাং, একুশের রক্তদান শুধু একজন ব্যক্তির মৃত্যু নয়, তা সমগ্র জাতির মুক্তির সূর্যোদয়—পলাশের মায়ের দৃষ্টিভঙ্গি জহির রায়হানের গল্পের এই মূল চেতনাকেই পরম সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
অধ্যায় ১২: আমাদের নতুন গৌরবগাথা — জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (NCTB)
২০২৪ সালের জুলাই মাসে বৈষম্যহীন সমাজ ও কোটা সংস্কারের দাবিতে সাধারণ শিক্ষার্থীরা রাজপথে বুক পেতে দাঁড়ায়। পুলিশের তাজা বুলেটের মুখে দুই হাত প্রসারিত করে রংপুরের তরুণ আবু সাঈদ বুক পেতে দিয়ে বীরের মতো শাহাদাতবরণ করে। অন্যদিকে তৃষ্ণার্ত সহযোদ্ধাদের পানি পান করাতে করাতে মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ পুলিশের গুলিতে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। তাদের এই রক্তদান সমগ্র দেশবাসীকে রাস্তায় নামিয়ে আনে এবং এক ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদী স্বৈরাচারের পতন ঘটে।
মডেল উত্তর ও পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা দেখুন (Click to View Answer)
পাঠ্য রচনায় বলা হয়েছে, কীভাবে তরুণ প্রজন্ম কোনো দলীয় স্বার্থ ছাড়া কেবল ন্যায়বিচার, মেধার মূল্যায়ন এবং নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য জীবন উৎসর্গ করেছিল।
উদ্দীপকে আবু সাঈদের বুক চেতিয়ে দাঁড়ানো এবং মুগ্ধের শহীদ হওয়ার মধ্য দিয়ে পুরো জাতির জেগে ওঠার যে চিত্র এসেছে, তা এনসিটিবির নতুন প্রবন্ধে বর্ণিত ছাত্র-জনতার অদম্য প্রতিরোধকেই তুলে ধরে।
'আমাদের নতুন গৌরবগাথা' রচনায় স্পষ্ট করা হয়েছে যে, জুলাই বিপ্লবের মূল লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রীয় সকল বৈষম্য, দুর্নীতি ও বিচারহীনতার অবসান ঘটিয়ে একটি গণতান্ত্রিক ও সমতাভিত্তিক মানবিক রাষ্ট্র বিনির্মাণ করা। শহীদদের রক্তের ঋণ শোধ করতে হলে এই নতুন রাষ্ট্রকাঠামো গড়ে তুলতে হবে।
উদ্দীপকের আবু সাঈদ ও মুগ্ধদের আত্মাহুতি প্রমাণ করে যে, দেশের তরুণ সমাজ অন্যায়ের সাথে আপস করতে শেখেনি। তাদের এই লড়াই দীর্ঘদিনের ভোটাধিকারহীন ও নিপীড়িত জাতিকে নতুন দিগন্ত উপহার দিয়েছে।
অতএব, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা ধারণ করে একটি মেধাভিত্তিক, শোষণহীন ও দুর্নীতিমুক্ত স্বদেশ গড়ে তোলাই এর আসল স্বার্থকতা—এটাই এই ঐতিহাসিক রচনার মূল বার্তা।