Political Science
তথ্য যাচাইকৃত

সমাজ সংস্কারে রাজা রামমোহন রায়ের অবদান ও ভূমিকা

সাইজ:
সূচিপত্র (বিষয়বস্তু রূপরেখা)
সমাজ সংস্কারে রাজা রামমোহন রায়ের অবদান ও ভূমিকা
সমাজ সংস্কারে রাজা রামমোহন রায়ের অবদান ও ভূমিকা – হেল্পট্রিকবিডি অফিসিয়াল গাইড

সারসংক্ষেপ: ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলার সামাজিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও ধর্মীয় নবজাগরণের (Bengal Renaissance) পুরোধা ব্যক্তিত্ব ছিলেন রাজা রামমোহন রায় (১৭৭২–১৮৩৩)। ভারতীয় উপমহাদেশের মধ্যযুগীয় অন্ধ কুসংস্কার, ধর্মীয় গোঁড়ামি এবং অমানবিক সতীদাহ প্রথার বিরুদ্ধে তাঁর আপসহীন সংগ্রাম মানব ইতিহাসের এক উজ্জ্বল অধ্যায়। আধুনিক ভারতের জনক ও প্রথম আধুনিক চিন্তাবিদ হিসেবে তিনি প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের উদারনৈতিক দর্শনের এক অসাধারণ সমন্বয় সাধন করেছিলেন। নিম্নে তাঁর সমাজ সংস্কারের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, সতীদাহ প্রথা উচ্ছেদ আন্দোলন, শিক্ষা ও সংবাদপত্রের সংস্কার বিষয়ক তুলনামূলক ছক এবং মাস্টার্স ও বিসিএস পরীক্ষার মডেল প্রশ্নোত্তরসহ পূর্ণাঙ্গ হ্যান্ডনোট উপস্থাপন করা হলো।

মূল প্রশ্ন: সমাজ সংস্কারে রাজা রামমোহন রায়ের অবদান লিখ। (Write the contribution of Raja Rammohan Roy in social reform)

১. ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও রাজা রামমোহন রায়ের আবির্ভাব

১৭৫৭ সালে পলাশির যুদ্ধে নবাব সিরাজ উদ-দৌলার পরাজয়ের মধ্য দিয়ে বাংলার মধ্যযুগীয় শাসনব্যবস্থার অবসান ঘটে এবং ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের সূচনা হয়। এর ফলে বাংলায় যে চরম অর্থনৈতিক শোষণ ও সামাজিক স্থবিরতা দেখা দেয়, তার প্রেক্ষাপটে আধুনিক চেতনার উন্মেষ ঘটে। এই যুগসন্ধিক্ষণে ১৭৭২ সালের ২২ মে হুগলি জেলার রাধানগর গ্রামে এক রক্ষণশীল কুলীন ব্রাহ্মণ পরিবারে রাজা রামমোহন রায়ের জন্ম হয়। আরবি, ফারসি, সংস্কৃত, হিব্রু, গ্রিক ও ইংরেজি ভাষায় অসাধারণ পাণ্ডিত্যের অধিকারী রামমোহন রায় উপলব্ধি করেছিলেন যে, মধ্যযুগীয় অন্ধ কুসংস্কার থেকে জাতিকে মুক্ত করতে না পারলে রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক কোনো মুক্তিই সম্ভব নয়।

২. সতীদাহ প্রথা বিলোপে ঐতিহাসিক সংগ্রাম ও সাফল্য

সমাজ সংস্কারক হিসেবে রাজা রামমোহন রায়ের অমর কীর্তি হলো নৃশংস ‘সতীদাহ প্রথা’ (সহমরণ) উচ্ছেদ করা। তৎকালীন হিন্দু সমাজে মৃত স্বামীর চিতায় জীবিত বিধবা স্ত্রীকে জোরপূর্বক আগুনে পুড়িয়ে মারার এক বর্বর প্রথা প্রচলিত ছিল। ১৮১১ সালে রামমোহনের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা জগমোহনের মৃত্যুর পর তাঁর ভ্রাতৃজায়া অলকমঞ্জরীকে বলপূর্বক চিতায় দগ্ধ করা হয়। এই মর্মান্তিক দৃশ্য তরুণ রামমোহনের হৃদয়ে গভীর রক্তক্ষরণ সৃষ্টি করে এবং তিনি প্রতিজ্ঞা করেন এই অমানবিক প্রথা সমূলে উৎপাটন করবেন।

তিনি শাস্ত্রীয় পণ্ডিতদের অন্ধ বিশ্বাসের বিপরীতে দাঁড়িয়ে বেদ ও উপনিষদের মূল ভাষ্য বিশ্লেষণ করে প্রমাণ করেন যে, হিন্দু ধর্মে কোথাও সহমরণের কোনো বাধ্যতামূলক বিধান নেই। রক্ষণশীল পণ্ডিতদের বিরুদ্ধে তিনি জনমত গড়ে তোলেন এবং তৎকালীন ব্রিটিশ গভর্নর জেনারেল লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ককে আইন প্রণয়নে উদ্বুদ্ধ করেন। অবশেষে ১৮২৯ সালের ৪ ডিসেম্বর ঐতিহাসিক ‘রেগুলেশন ১৭’ (Regulation XVII) জারির মাধ্যমে সতীদাহ প্রথাকে আইনত নিষিদ্ধ ও নরহত্যা হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

৩. আধুনিক শিক্ষা বিস্তার ও প্রাতিষ্ঠানিক অবদান

রাজা রামমোহন রায় দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে, কেবল সংস্কৃত ব্যাকরণ ও ধর্মতত্ত্ব শিক্ষায় আটকে থাকলে ভারতীয় সমাজ কখনো আধুনিক বিশ্বের সাথে তাল মেলাতে পারবে না। তিনি বিজ্ঞানমনস্ক পাশ্চাত্য শিক্ষার পক্ষপাতী ছিলেন:

  • ১৮২৩ সালের ঐতিহাসিক পত্র: লর্ড আমহার্স্টকে লিখিত বিখ্যাত পত্রে তিনি সরকারি ব্যয়ে সংস্কৃত কলেজের পরিবর্তে গণিত, পদার্থবিদ্যা, রসায়ন ও আধুনিক দর্শন শিক্ষার জন্য প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার জোর দাবি জানান।
  • শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন: তিনি ১৮১৫ সালে কলকাতায় ‘আত্মীয় সভা’, ১৮২২ সালে আধুনিক শিক্ষার জন্য ‘অ্যাংলো-হিন্দু স্কুল’ এবং ১৮২৬ সালে বেদান্তের অদ্বৈতবাদী শিক্ষার সাথে যুক্তিবাদী চিন্তার মিলনে ‘বেদান্ত কলেজ’ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৮১৭ সালে হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠায় ডেভিড হেয়ারকে তিনি সর্বাত্মক পরামর্শ ও সহযোগিতা দিয়েছিলেন।

৪. সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও ধর্মীয় উদারতাবাদ

জনমত গঠন এবং নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় রামমোহন রায় ছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম আধুনিক সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবী:

  • সংবাদপত্র প্রকাশ: তিনি ১৮২১ সালে বাংলায় ‘সম্বাদ কৌমুদী’ এবং ১৮২২ সালে ফারসি ভাষায় ‘মিরাত-উল-আখবার’ প্রকাশ করেন। ১৮২৩ সালে জন অ্যাডামসের দমনমূলক প্রেস অর্ডিন্যান্সের বিরুদ্ধে তিনি সুপ্রিম কোর্ট ও লন্ডনের প্রিভি কাউন্সিলে ঐতিহাসিক স্মারকলিপি প্রদান করেন, যা ভারতীয় প্রেসের স্বাধীনতার প্রথম ঐতিহাসিক দলিল।
  • ব্রাহ্মসমাজ প্রতিষ্ঠা (১৮২৮): মূর্তিপূজা ও ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার ঊর্ধ্বে উঠে সর্বজনীন একত্ববাদী পরমব্রহ্মের উপাসনার উদ্দেশ্যে তিনি ১৮২৮ সালের ২০ আগস্ট ‘ব্রাহ্মসমাজ’ প্রতিষ্ঠা করেন। এটি তৎকালীন বাংলার চিন্তাজগতে ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় আঘাত হানে।
  • নারী অধিকার ও সম্পত্তির উত্তরাধিকার: রামমোহন রায় বহুবিবাহ ও বাল্যবিবাহের তীব্র বিরোধিতা করেন এবং হিন্দু বিধবা নারীর পৈতৃক ও স্বামীর সম্পত্তিতে বৈধ অধিকার প্রতিষ্ঠার পক্ষে শক্তিশালী পুস্তিকা রচনা করেন।

৫. রাজা রামমোহন রায়ের সংস্কার আন্দোলনের তুলনামূলক ছক

সম্পূর্ণ তথ্য দেখতে ডানে-বামে স্ক্রোল করুন
সংস্কারের ক্ষেত্ররামমোহনের প্রধান উদ্যোগ ও পদক্ষেপঐতিহাসিক প্রভাব ও ফলাফল
১. সতীদাহ প্রথা উচ্ছেদশাস্ত্রমতে সহমরণ নিষিদ্ধ প্রমাণ এবং ১৮২৯ সালে লর্ড বেন্টিঙ্ককে দিয়ে আইন পাস করানো।হাজার হাজার অসহায় হিন্দু নারীর জীবন্ত দাহ হওয়া থেকে জীবন রক্ষা।
২. আধুনিক বিজ্ঞান শিক্ষাঅ্যাংলো-হিন্দু স্কুল স্থাপন এবং ১৮২৩ সালে ব্রিটিশ সরকারকে বিজ্ঞান শিক্ষার দাবি জানিয়ে পত্র।পাশ্চাত্য বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী শিক্ষার দ্বার উন্মোচন এবং আধুনিক বুদ্ধিজীবী শ্রেণীর উদ্ভব।
৩. সংবাদপত্রের স্বাধীনতা‘সম্বাদ কৌমুদী’ ও ‘মিরাত-উল-আখবার’ প্রকাশ এবং ১৮২৩ সালের প্রেস আইনের বিরুদ্ধে আপিল।উপমহাদেশে রাজনৈতিক মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও আধুনিক সাংবাদিকতার শুভ সূচনা।
৪. ধর্মীয় সংস্কারএকেশ্বরবাদী উপনিষদের ভাষ্য প্রচার এবং ১৮২৮ সালে ব্রাহ্মসমাজ প্রতিষ্ঠা।কুসংস্কারাচ্ছন্ন পৌত্তলিকতা ও মধ্যযুগীয় বর্ণভেদ প্রথার মূল শিকড়ে আঘাত।

মাস্টার্স ও বিসিএস স্পেশাল মডেল প্রশ্নোত্তর (Exam Master Notes)

প্রশ্ন ১: কত সালের কোন রেগুলেশন দ্বারা সতীদাহ প্রথা নিষিদ্ধ করা হয়?
উত্তর: ১৮২৯ সালের ৪ ডিসেম্বর ‘রেগুলেশন ১৭’ (Regulation XVII)-এর মাধ্যমে ব্রিটিশ ভারতে সতীদাহ প্রথা আইনত নিষিদ্ধ করা হয়।

প্রশ্ন ২: রামমোহন রায়কে ‘রাজা’ উপাধি কে দিয়েছিলেন?
উত্তর: দিল্লির মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় আকবর তাঁর ভাতা বৃদ্ধির জন্য ইংল্যান্ডে দূত হিসেবে পাঠানোর সময় ১৮৩০ সালে রামমোহন রায়কে ‘রাজা’ উপাধিতে ভূষিত করেন।

প্রশ্ন ৩: রাজা রামমোহন রায়ের বিখ্যাত ফারসি পত্রিকার নাম কী?
উত্তর: ১৮২২ সালে প্রকাশিত ফারসি সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘মিরাত-উল-আখবার’ (Mirat-ul-Akhbar)।

প্রশ্ন ৪: রামমোহন রায়ের সমাজ সংস্কারের প্রধান দার্শনিক ভিত্তি কী ছিল?
উত্তর: বেদান্তের অদ্বৈতবাদী দর্শন, মানবপ্রেম এবং পশ্চিমা যুক্তিবাদী বৈজ্ঞানিক চিন্তাধারার মেলবন্ধন।

প্রশ্ন ৫: রাজা রামমোহন রায় কবে এবং কোথায় মৃত্যুবরণ করেন?
উত্তর: ১৮৩৩ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর ইংল্যান্ডের ব্রিস্টল নগরে এই মহান মনীষী মৃত্যুবরণ করেন এবং সেখানে তাঁর স্মৃতিসৌধ অবস্থিত।

উপসংহার

সার্বিক মূল্যায়নে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায় বলা যায়, “রামমোহন রায় ছিলেন আধুনিক ভারতের প্রথম যুগের পথিকৃৎ যিনি অন্ধ মধ্যযুগ থেকে ভারতকে টেনে আধুনিকতার আলোয় এনেছিলেন।” তাঁর বলিষ্ঠ সমাজ সংস্কার আন্দোলন কেবল ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলাকেই নয়, বরং সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশকে এক নবচেতনায় উদ্বুদ্ধ করেছিল। নারীমুক্তি, বিজ্ঞানশিক্ষা এবং যুক্তিবাদী সমাজ বিনির্মাণে রাজা রামমোহন রায়ের অবদান চিরভাস্বর হয়ে থাকবে।

তথ্যসূত্র ও অ্যাকাডেমিক সাইটেশন

প্রামাণ্য উৎস: জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (NCTB), জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অফিশিয়াল গেজেট ও অ্যাকাডেমিক রেগুলেশন।

APA 7th Edition Citation: ayesha. (2025). সমাজ সংস্কারে রাজা রামমোহন রায়ের অবদান ও ভূমিকা. Help Trick BD. Retrieved from https://www.helptrickbd.com/contribution-raja-rammohan-roy-social-reform/

পরীক্ষার জরুরি রুটিন ও স্পেশাল হ্যান্ডনোট মিস করতে না চাইলে!

আমাদের ভেরিফাইড হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রাম স্টাডি গ্রুপে আজই যুক্ত হোন।

ayesha

শিক্ষা পরামর্শক, প্রাবন্ধিক ও হেল্প ট্রিক বিডি এডিটোরিয়াল টিম সদস্য।