

বিভাগ: বাংলা সাহিত্য ও ইতিহাস | সর্বশেষ সংস্করণ: ২০২৬ | বিসিএস ও অনার্স বিশেষ হ্যান্ডনোট
চিত্র: উনিশ শতকের নবজাগরণ, বিধবা বিবাহ আন্দোলন ও আধুনিক বাংলা গদ্যের জনক ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
সারসংক্ষেপ (Quick Overview):
পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর (১৮২০ – ১৮৯১) ছিলেন উনিশ শতকের বাংলার নবজাগরণের (Bengal Renaissance) পুরোধা ব্যক্তিত্ব, আধুনিক বাংলা গদ্যের জনক এবং একাধারে সমাজ সংস্কারক ও শিক্ষাবিদ। তিনি গোঁড়া হিন্দু সমাজের প্রবল বাধা উপেক্ষা করে ১৮৫৬ সালে হিন্দু বিধবা বিবাহ আইন পাস করান, বহুবিবাহ রোধে আন্দোলন করেন এবং নারীদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার প্রসারে ৩৫টি বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। এছাড়া বাংলা গদ্যে প্রথম জ্যোতিচিহ্ন বা বিরামচিহ্নের সফল প্রয়োগ ঘটিয়ে তিনি বাংলা ভাষাকে এক সুশৃঙ্খল ও আধুনিক রূপ দান করেন।
সূচিপত্র (Table of Contents)
- ১. ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের প্রারম্ভিক জীবন ও শিক্ষাদীক্ষা
- ২. বাংলা গদ্যের জনক হিসেবে বিদ্যাসাগরের সাহিত্যকর্ম ও বিরামচিহ্ন প্রবর্তন
- ৩. ঐতিহাসিক বিধবা বিবাহ আন্দোলন ও ১৮৫৬ সালের আইন পাস
- ৪. নারী শিক্ষা বিস্তার ও বেথুন স্কুলের প্রতিষ্ঠা
- ৫. বহুবিবাহ ও বাল্যবিবাহ নিরোধে সমাজ সংস্কারমুখী পদক্ষেপ
- ৬. বিদ্যাসাগরের বিখ্যাত গ্রন্থপঞ্জি ও অনুবাদ সাহিত্যের তথ্য ছক
- ৭. বিসিএস ও অনার্স পরীক্ষার স্পেশাল মডেল প্রশ্নোত্তর
- ৮. সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
১. ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের প্রারম্ভিক জীবন ও শিক্ষাদীক্ষা
ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় ১৮২০ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর মেদিনীপুর জেলার বীরসিংহ গ্রামে এক দরিদ্র কিন্তু বিদ্যানুরাগী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। কলকাতার সংস্কৃত কলেজে অসাধারণ মেধার পরিচয় দিয়ে তিনি ব্যাকরণ, কাব্য, অলংকার, বেদান্ত ও স্মৃতিশাস্ত্রে অসামান্য পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। তাঁর এই বিপুল পাণ্ডিত্যের স্বীকৃতিস্বরূপ সংস্কৃত কলেজ তাঁকে ‘বিদ্যাসাগর’ (জ্ঞানের সাগর) উপাধিতে ভূষিত করে। আর তাঁর অপরিসীম মানবপ্রেম ও করুণার জন্য তিনি পরিচিত হন ‘দয়ার সাগর’ নামে।
২. বাংলা গদ্যের জনক হিসেবে বিদ্যাসাগরের সাহিত্যকর্ম ও বিরামচিহ্ন প্রবর্তন
বিদ্যাসাগরের আবির্ভাবের পূর্বে বাংলা গদ্য ছিল দুর্বোধ্য, ছন্দহীন এবং বিরামচিহ্নবিহীন এক জগাখিচুড়ি অবস্থা। ১৮৪৭ সালে প্রকাশিত তাঁর ‘বেতাল পঞ্চবিংশতি’ গ্রন্থে তিনি প্রথম বাংলা গদ্যে যতিচিহ্ন বা বিরামচিহ্নের (কমা, সেমিকোলন, দাঁড়ি ইত্যাদি) সুশৃঙ্খল প্রয়োগ ঘটান। ফলে বাংলা ভাষা পাঠযোগ্য ও শ্রুতিমধুর রূপ লাভ করে। এই কারণে তাঁকে আধুনিক বাংলা গদ্যের জনক বলা হয়। শিশুদের বাংলা বর্ণমালা শিক্ষার চিরন্তন বই ‘বর্ণপরিচয়’ (১৮৫৫) তাঁর এক অনন্য অবদান।
৩. ঐতিহাসিক বিধবা বিবাহ আন্দোলন ও ১৮৫৬ সালের আইন পাস
তৎকালীন হিন্দু সমাজে বাল্যকালে স্বামী মারা গেলে ছোট্ট কন্যাশিশুদের আজীবন চরম অমানবিক লাঞ্ছনা ও কৃচ্ছ্রসাধনের মধ্যে বেঁচে থাকতে হতো। বিদ্যাসাগর প্রাচীন পরাশর সংহিতা ঘেঁটে প্রমাণ করেন যে শাস্ত্রীয় বিধানে বিধবা বিবাহের বৈধতা রয়েছে।
তীব্র সামাজিক কুৎসা ও প্রাণনাশের হুমকি সত্ত্বেও তিনি হাজার হাজার নাগরিকের স্বাক্ষর সংগ্রহ করে ব্রিটিশ সরকারের কাছে আবেদন জানান। এর ফলশ্রুতিতে ১৮৫৬ সালের ২৬ জুলাই লর্ড ক্যানিং-এর আমলে ঐতিহাসিক ‘হিন্দু বিধবা বিবাহ আইন’ (Act XV of 1856) পাস হয়। শুধু আইন পাস করেই তিনি ক্ষান্ত হননি, নিজ খরচে বহু বিধবা বিবাহের আয়োজন করেন এবং নিজের একমাত্র পুত্র নারায়ণচন্দ্রকেও এক বিধবার সাথে বিয়ে দিয়ে আদর্শ স্থাপন করেন।
৬. বিদ্যাসাগরের বিখ্যাত গ্রন্থপঞ্জি ও অনুবাদ সাহিত্যের তথ্য ছক
| গ্রন্থের নাম | প্রকাশকাল | মূল উৎস / বিষয়বস্তু |
|---|---|---|
| বেতাল পঞ্চবিংশতি | ১৮৪৭ খ্রি. | হিন্দি ‘বৈ তাল পচ্চীসী’ অবলম্বনে প্রথম বিরামচিহ্নযুক্ত বাংলা গদ্য |
| শকুন্তলা | ১৮৫৪ খ্রি. | কালিদাসের ‘অভিজ্ঞান শকুন্তলম’ নাটকের সুললিত গদ্যানুবাদ |
| বর্ণপরিচয় (১ম ও ২য় ভাগ) | ১৮৫৫ খ্রি. | বাঙালি শিশুদের জন্য আধুনিক বাংলা বর্ণমালার ভিত্তিগ্রন্থ |
| সীতার বনবাস | ১৮৬০ খ্রি. | ভবভূতির ‘উত্তররামচরিত’ ও রামায়ণের করুণ রসের আখ্যান |
| বিধবা বিবাহ প্রচলিত হওয়া উচিত কি না | ১৮৫৫ খ্রি. | বিধবা বিবাহের সপক্ষে শাস্ত্রীয় ও যৌক্তিক প্রবন্ধ |
৭. বিসিএস ও অনার্স পরীক্ষার স্পেশাল মডেল প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন: বাংলা গদ্যে প্রথম বিরামচিহ্ন ব্যবহার করেন কে এবং কোন গ্রন্থে?
উত্তর: ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, ১৮৪৭ সালে প্রকাশিত ‘বেতাল পঞ্চবিংশতি’ গ্রন্থে।
প্রশ্ন: বিধবা বিবাহ আইন কত সালে পাস হয় এবং তখন গভর্নর জেনারেল কে ছিলেন?
উত্তর: ১৮৫৬ সালের ২৬ জুলাই, লর্ড ক্যানিং-এর সময়ে।
৮. সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
প্রশ্ন ১: বিদ্যাসাগরের ছদ্মনাম কী ছিল?
উত্তর: কস্যচিৎ উপযুক্ত ভাইপোস্য এবং কস্যচিৎ উপযুক্ত ভাইপো সহচরস্য।
প্রশ্ন ২: মেট্রোপলিটন ইনস্টিটিউশন কে প্রতিষ্ঠা করেন?
উত্তর: ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর (যা বর্তমানে বিদ্যাসাগর কলেজ নামে পরিচিত)।