

প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দুনিয়ায় শুভাগমন ও ধরাধাম আলোকিত করার আনন্দে ভক্ত মুমিনদের কণ্ঠে ধ্বনিত হওয়া এক পরম আবেগময় নাতিয়া ক্বাসিদা হলো ‘মারহাবা ইয়া মারহাবা, রাহমাতুল্লিল আলামিন-এ মারহাবা’। মিলাদুন্নবী ও সীরাত সম্মেলনে এই পবিত্র ক্বাসিদাটি সুরের মূর্ছনায় প্রতিটি হৃদয়কে বিমোহিত করে। অন্ধকার দূর করে যিনি মানবতার মুক্তি এনেছিলেন, তাঁকে স্বাগত জানানোর এ এক অনন্য আধ্যাত্মিক উদযাপন।
“মারহাবা! হে আমার নয়নের জ্যোতি মারহাবা! স্বাগতম হে হযরত ইমাম হুসাইনের নানা বিশ্বনবী মারহাবা!”
‘মারহাবা ইয়া মারহাবা’ সম্পূর্ণ দীর্ঘ ক্বাসিদা লিরিক্স (সকল মূল ও বিস্তৃত অন্তরা)
(স্থায়ী মারহাবা কোরাস)
মারহাবা ইয়া মারহাবা, মারহাবা ইয়া মারহাবা!
রাহমাতুল্লিল আলামিন-এ মারহাবা!
(১ম অন্তরা: খোশ আমদেদ ও নূরে মুস্তফা)
খোশ আমদেদ খোশ আমদেদ মারহাবা,
নূরে মুস্তফা জগত জুড়ে উজ্বলা!
মারহাবা ইয়া মারহাবা, মারহাবা ইয়া মারহাবা!
(২য় অন্তরা: কিসরার রাজপ্রাসাদ ও হেদায়েতের ভোর)
আসলো ধরায় নূরের রবি দূর হলো সব আঁধার ঘোর,
কাঁপলো কিসরার রাজপ্রাসাদ ফুটলো হেদায়াতের ভোর!
মারহাবা ইয়া মারহাবা, রাহমাতুল্লিল আলামিন-এ মারহাবা!
(৩য় অন্তরা: মা আমিনার কোল ও মক্কার জমিন ধন্য)
আমিনার কোল আলো করে এলেন রাহমাতাল্লিল আলামিন,
ধন্য হলো মক্কা নগর ধন্য হলো বিশ্ব জমিন!
মারহাবা ইয়া মারহাবা, মারহাবা ইয়া মারহাবা!
(৪র্থ অন্তরা: আকাশের দ্বার উন্মুক্ত ও হুর-পরীদের গান)
খুলে গেল আকাশের দ্বার নেমে এলো রহমত অপার,
হুর ও ফেরেশতা গাহিল গান আসিলেন নবীজী আমার!
মারহাবা ইয়া মারহাবা, রাহমাতুল্লিল আলামিন-এ মারহাবা!
(৫ম অন্তরা: হালিমা সাদিয়ার ঘরে বরকতের জোয়ার)
হালিমা সাদিয়ার ঘরে যখন নিলেন আপনি ঠাঁই,
শুকনো স্তনে এলো দুধ বরকতের তো সীমা নাই!
পথের কাফেলা অবাক হলো দেখে উটের দ্রুত চাল,
ধন্য হলো বনু সা’দ ধন্য হলো সারা কাল!
মারহাবা ইয়া মারহাবা, রাহমাতুল্লিল আলামিন-এ মারহাবা!
(৬ষ্ঠ অন্তরা: শুকনো গাছে ফল ও বৃক্ষ-পাথরের সালাম)
শুকনো গাছে ফল ধরে আর পাথর বলে ইয়া নবী,
তোমার নূরের আলোয় হাসে এই জগতের সবকিছুই!
মেঘ এসে দেয় ছায়া তব বৃক্ষ করে যে সিজদা,
তোমার কদমে লুটিয়ে পড়ে নিখিল জাহানের আস্থা!
মারহাবা ইয়া মারহাবা, মারহাবা ইয়া মারহাবা!
(৭ম অন্তরা: শাফায়াতের কাণ্ডারী ও হাশরের প্রার্থনা)
দুরুদ ও সালাম জানাই মোরা দরবারে পাকের গোলাম,
শাফায়াতের কাণ্ডারী তুমি কিয়ামতের কঠিন দিন!
হাশরের সেই কঠিন দিনে ফেলে যেও না মোদের একা,
কাওসারের পানির পেয়ালা হাতে দিয়ে দিও দেখা!
মারহাবা ইয়া মারহাবা, মারহাবা ইয়া মারহাবা!
(৮ম অন্তরা: সালাত ও সালামের চিরন্তন সমাপ্তি)
লাখো কোটি দরূদ জানাই ওগো প্রিয় কামলিওয়ালা,
তোমার প্রেমে জুড়ায় মোদের মনের যত দুঃখ-জ্বালা!
রওজা পাকে পৌঁছে দিও সালাম মোদের বারে বার,
দয়াল নবীর উম্মত হয়ে ধন্য জীবন এ সংসার!
মারহাবা ইয়া মারহাবা, মারহাবা ইয়া মারহাবা!
রাহমাতুল্লিল আলামিন-এ মারহাবা!
‘মারহাবা’ শব্দের উৎপত্তি ও হৃদয়স্পর্শী অর্থ
আরবী ‘রুহব’ (Rahb) ধাতু থেকে ‘মারহাবা’ শব্দের উৎপত্তি, যার আভিধানিক অর্থ বিশালতা, প্রশস্ততা ও উষ্ণ সম্ভাষণ। আরবে কোনো সম্মানিত অতিথি আগমন করলে বলা হতো— ‘মারহাবান বিকুম’, যার ভাবার্থ হলো: “আপনাদের আগমনে আমাদের গৃহ ও হৃদয় প্রশস্ত ও ধন্য হয়েছে।” ক্বাসিদায় যখন মোমিন বলে ‘মারহাবা ইয়া রাসূলাল্লাহ’, তখন সে তার হৃদয়দ্বার উন্মুক্ত করে প্রিয় নবীজীর পবিত্র সত্তা, চরিত্র ও অনুপম শিক্ষাকে অন্তরে বরণ করে নেয়।
রাহমাতুল্লিল আলামিনের শুভাগমনে আনন্দ প্রকাশ
পবিত্র কুরআনের সূরা আল-আম্বিয়ার ১০৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা স্পষ্ট ঘোষণা করেছেন—
“ওয়ামা আরসালনাকা ইল্লা রাহমাতাল্লিল আলামিন” — “এবং আমি আপনাকে সমগ্র বিশ্বজগতের জন্য কেবল রহমতস্বরূপই প্রেরণ করেছি।”
আর সূরা ইউনুসের ৫৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে— “বলুন, এটি আল্লাহর অনুগ্রহ ও তাঁর দয়াতেই; সুতরাং এতেই তাদের আনন্দ প্রকাশ করা উচিত।” নবী করীম (সা.) কেবল আরব ভূখণ্ডের জন্য নন, বরং সৃষ্টিজগতের প্রতিটি কণা, মানবজাতি ও জিন জাতির জন্য রহমতের ফল্গুধারা হয়ে এসেছিলেন। সেই অসীম দয়ার কৃতজ্ঞতাস্বরূপ মুমিনগণ নাতে মারহাবা ধ্বনি তুলে আনন্দ প্রকাশ করে থাকেন।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: কাঁপলো কিসরার রাজপ্রাসাদ
ইতিহাসে বর্ণিত রয়েছে, যেদিন প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) মা আমিনার কোল আলো করে ধরাধামে তাশরিফ আনেন, সেদিন পারস্যের প্রতাপশালী কিসরার রাজপ্রাসাদের চৌদ্দটি স্তম্ভ বিকট শব্দে ধসে পড়েছিল এবং অগ্নিপূজকদের হাজার বছর ধরে প্রজ্জ্বলিত আগুন হঠাৎ নিভে গিয়েছিল। এটি ছিল বাতিল ও জালিম শক্তির পতন এবং তাওহিদের বিজয়ের এক ঐতিহাসিক ঐশ্বরিক ইঙ্গিত।
হালিমা সাদিয়ার ঘরে অলৌকিক বরকত
ক্বাসিদার ৫ম অন্তরায় হযরত হালিমা সাদিয়া (রা.)-এর ঘরে নবীজীর শৈশবের বরকতময় ঘটনার স্মৃতিচারণ করা হয়েছে। আরবের রীতি অনুযায়ী নবজাতক শিশুকে মরুভূমির বিশুদ্ধ আবহাওয়ায় লালন-পালনের জন্য দুধমাতা হিসেবে বনু সা’দ গোত্রের হালিমা নবীজীকে গ্রহণ করেন। অভাবগ্রস্ত হালিমার উটনি ও বকরির স্তন তৎক্ষণাৎ দুধে ভরে ওঠে, পরিবারের দরিদ্রতা দূর হয়ে বরকতের জোয়ার বয়ে যায়। এই ঐতিহাসিক অলৌকিকত্ব স্মরণ করে মুমিনরা নবীর ভালোবাসায় উজ্জীবিত হয়।