সালাতুন ইয়া রাসুলুল্লাহ আলাইকুম: ঐতিহাসিক প্রেক্ষিত, তাৎপর্য ও পূর্ণাঙ্গ লিরিক্স

সালাতুন ইয়া রাসুলুল্লাহ আলাইকুম: ঐতিহাসিক প্রেক্ষিত, তাৎপর্য ও পূর্ণাঙ্গ লিরিক্স
সালাতুন ইয়া রাসুলুল্লাহ আলাইকুম: ঐতিহাসিক প্রেক্ষিত, তাৎপর্য ও পূর্ণাঙ্গ লিরিক্স – হেল্পট্রিকবিডি অফিসিয়াল গাইড
সালাতুন ইয়া রাসুলুল্লাহ আলাইকুম: ঐতিহাসিক প্রেক্ষিত, তাৎপর্য ও পূর্ণাঙ্গ লিরিক্স
সালাতুন ইয়া রাসুলুল্লাহ আলাইকুম — ঐতিহাসিক প্রেক্ষিত, দরূদ ও সালামের তাৎপর্য | HelpTrickBD

বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শানে রচিত সালাত ও সালামের যত ক্বাসিদা রয়েছে, তার মধ্যে ‘সালাতুন ইয়া রাসুলুল্লাহ আলাইকুম, সালামুন ইয়া হাবীবাল্লাহ আলাইকুম’ বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চলে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সবচেয়ে জনপ্রিয় ও ভক্তিপূর্ণ এক চিরন্তন নাতিয়া ক্বাসিদা। মিলাদ ও সীরাত মাহফিলে সমবেত ভক্ত হৃদয়ের আকুল আবেগ প্রকাশে এই বাণীটি অতুলনীয়।

الصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ عَلَيْكَ يَا رَسُولَ اللَّهِ ، الصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ عَلَيْكَ يَا حَبِيبَ اللَّهِ
“হে আল্লাহর রাসূল! আপনার ওপর অগণিত সালাত ও রহমত বর্ষিত হোক। হে আল্লাহর প্রিয় হাবীব! আপনার ওপর চিরন্তন সালাম ও শান্তি বর্ষিত হোক।”

‘সালাতুন ইয়া রাসুলুল্লাহ’ সম্পূর্ণ দীর্ঘ লিরিক্স (সকল মূল ও বিস্তৃত অন্তরা)

(সালাম ও স্থায়ী কোরাস)
সালাতুন ইয়া রাসুলুল্লাহ আলাইকুম!
সালামুন ইয়া হাবীবাল্লাহ আলাইকুম!

(১ম অন্তরা: নূরের রবি ও ধরার ধন্য হওয়া)
তুমি যে নূরের রবি তুমি যে চাঁদের ছবি,
তোমারি আগমনে ধন্য হলো ধরা সবি!
সালাতুন ইয়া রাসুলুল্লাহ আলাইকুম…

(২য় অন্তরা: জাহেলিয়াতের ঘোর আঁধার দূরীকরণ)
আঁধারে ডুবেছিল জাহেলিয়াতের সংসার,
এসে তুমি জ্বেলে দিলে সত্যের আলো অপার!
সালাতুন ইয়া রাসুলুল্লাহ আলাইকুম…

(৩য় অন্তরা: শাহে মদিনার রওজা মোবারক ও গভীর প্রেম)
রওজা মোবারকে যার শুয়ে আছেন শাহে মদিনা,
তাঁহার প্রেমে না মজিল যাহার দিল তো রবেনা!
সালাতুন ইয়া রাসুলুল্লাহ আলাইকুম…

(৪র্থ অন্তরা: মক্কার ফুল ও আরশ-কুরসী উজালা)
মক্কার বুকে ফুটল যে ফুল সুবাস তাহার ছড়িয়ে গেল,
আরশ থেকে কুরসী পর্যন্ত যাঁর নূরেতে উজল হলো!
সালাতুন ইয়া রাসুলুল্লাহ আলাইকুম…

(৫ম অন্তরা: অদেখা ভালোবাসার গভীর আর্তি)
আমরা তোমায় দেখিনি গো বাসি তোমায় কত ভালো,
ওগো প্রিয় নবীজী মোর অন্ধ নয়নের আলো!
চক্ষু জুড়ে স্বপ্ন তোমার হৃদয়েতে তোমার সুর,
আমায় তুমি কাছে টেনে নাও ফেলে রেখো না দূর!
সালাতুন ইয়া রাসুলুল্লাহ আলাইকুম…

(৬ষ্ঠ অন্তরা: মিরাজের রজনী ও আরশে মোবারক)
মিরাজের ঐ পুণ্য রাতে আরশে খোদার হলেন মেহমান,
দুই জাহানের শ্রেষ্ঠ নবী দিলে খোদা পূর্ণ সম্মান!
আম্বিয়া ও ফেরেশতাকুল দাঁড়িয়ে করেন তা’জিম যার,
সালাত সালাম জানাই মোরা দরবারেতে বারবার!
সালাতুন ইয়া রাসুলুল্লাহ আলাইকুম…

(৭ম অন্তরা: হাশরের ময়দান ও নবীজীর উম্মতের ফিকির)
হাশরের ঐ কঠিন দিনে কাঁদবে যবে আম্বিয়া,
উম্মতেরই ফিকিরে সেদিন কাঁদবে নবী কামলিওয়ালা!
ইয়া উম্মতী ইয়া উম্মতী ধ্বনি উঠবে রবের কাছে,
তোমার সুপারিশেই মোদের নাজাতের এই আশা আছে!
সালাতুন ইয়া রাসুলুল্লাহ আলাইকুম…

(৮ম অন্তরা: গুনাহগারের সুপারিশ ও পুলসিরাত পার)
পাপের বোঝা ভারী মোদের নাই তো কোনো নেক আমল,
তোমার প্রেমের এক ফোঁটা অশ্রু নয়ন করে ছলছল!
কিয়ামতের মহা দিনে পার করে দিও পুলসিরাত,
তোমার চরণ ছুঁয়ে যেন পাই মোরা নাজাত!
সালাতুন ইয়া রাসুলুল্লাহ আলাইকুম!
সালামুন ইয়া হাবীবাল্লাহ আলাইকুম!

সালাত ও সালামের ভাষাগত ও আত্মিক মর্মার্থ

ইসলামী পরিভাষায় ‘সালাত’ এবং ‘সালাম’ দুটি গভীর তাত্পর্যপূর্ণ শব্দ, যা নবীর প্রতি মুমিনের ভক্তি ও বিশ্বাসের প্রকাশ ঘটায়:

  • সালাত (الصلاة): মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমত বর্ষণ ও সৃষ্টির শ্রেষ্ঠতম মর্যাদায় ভূষিত করার নাম সালাত। মুমিন যখন নবীর প্রতি সালাত পেশ করে, তখন সে আল্লাহর দরবারে আকুল মিনতি জানায় যেন প্রিয় নবীর মর্যাদা ও মর্যাদা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পায়।
  • সালাম (السلام): সালাম অর্থ শান্তি, নিরাপত্তা ও শুভেচ্ছা জ্ঞাপন। কিয়ামতের কঠিন ময়দানে উম্মতের জন্য যিনি মহান আল্লাহর দরবারে শাফায়াত করবেন, সেই পরম দয়ালু নবীর ওপর চিরন্তন শান্তি ও নিরাপত্তার বার্তা বর্ষণের আর্তি হলো সালাম।
  • হাবীবাল্লাহ (حبيب الله): আল্লাহর পরম বন্ধু ও প্রিয়তম সৃষ্টি। যাঁর সন্তুষ্টির জন্য আল্লাহ তাআলা কিবলা পরিবর্তন করেছিলেন এবং মিরাজে স্বশরীরে সান্নিধ্য দিয়েছিলেন।

নবীপ্রেম: ঈমানের পূর্ণতার অপরিহার্য শর্ত

সহীহ বুখারী শরীফে হযরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন—
“তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত প্রকৃত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার পিতা-মাতা, সন্তান-সন্ততি এবং সমস্ত মানবজাতির চেয়েও অধিক প্রিয় না হই।”
(সহীহ বুখারী: ১৫, সহীহ মুসলিম: ৪৪)

এই কারণে সুফি সাধক, বুজুর্গানে দ্বীন ও সাধারণ মুসলমানগণ প্রিয় নবীর প্রতি নিজেদের অন্তরের অকৃত্রিম ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ঘটান ছন্দোবদ্ধ কবিতা ও ক্বাসিদার মাধ্যমে। দূর থেকে সালাম পাঠানো যেন হৃদয়ের সুরকে সরাসরি মদিনা মোনাওয়ারার সবুজ গম্বুজে পৌঁছে দেওয়ার এক আত্মিক অনুভূতি।

জাহেলিয়াতের আঁধার দূর করে মানবতার মুক্তির বার্তা

ক্বাসিদার একটি অমূল্য পঙক্তি হলো— ‘আঁধারে ডুবেছিল জাহেলিয়াতের সংসার, এসে তুমি জ্বেলে দিলে সত্যের আলো অপার।’ রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর আবির্ভাবের প্রাক্কালে গোটা আরব উপদ্বীপ যখন অজ্ঞতা, পৌত্তলিকতা, কন্যাশিশু হত্যা, নারীর চরম অবমূল্যায়ন ও গোত্রীয় যুদ্ধ-বিগ্রহে নিমজ্জিত ছিল, তখন তিনি সত্যের মশাল জ্বেলে একটি বর্বর জাতিকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সভ্য, ন্যায়পরায়ণ ও মানবিক জাতিতে রূপান্তরিত করেছিলেন। এই ঐতিহাসিক পরিবর্তনকে কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করাই এই ক্বাসিদার মূল শিক্ষা।

দূর থেকে প্রেরিত সালামের পরিণতি

অনেক মুমিনের মনে প্রশ্ন জাগে, মদিনা থেকে হাজার মাইল দূর থেকে সালাত ও সালাম পেশ করলে তা নবীজী পর্যন্ত পৌঁছায় কি না? সহীহ হাদিসে এর দ্ব্যর্থহীন সমাধান দেওয়া হয়েছে। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) ও আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন—

“আল্লাহ তাআলার এমন কিছু ভ্রাম্যমাণ ফেরেশতা রয়েছেন, যাঁরা জমিনের আনাচে-কানাচে বিচরণ করেন এবং আমার উম্মতের পক্ষ থেকে প্রেরিত সালাম আমার দরবারে পৌঁছে দেন।” (সুনানে আন-নাসাঈ: ১২৮২)। সুবহানাল্লাহ! এর অর্থ হলো, পৃথিবীর যেকোনো প্রান্ত থেকে মুমিন যে মুহূর্তেই ‘সালাতুন ইয়া রাসুলুল্লাহ’ পাঠ করে, তৎক্ষণাৎ ফেরেশতা মারফত তা বিশ্বনবীর কাছে পৌঁছে যায়।

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

প্রশ্ন: ক্বাসিদা কাকে বলে?
উত্তর: আরবী ও ফারসি সাহিত্যে নির্দিষ্ট ছন্দ, ভাবগাম্ভীর্য ও অন্ত্যমিলযুক্ত দীর্ঘ ভক্তিমূলক কাব্যকে ‘ক্বাসিদা’ বলা হয়। নবীজীর প্রশংসায় রচিত হলে তাকে ‘নাতিয়া ক্বাসিদা’ বলা হয়।
প্রশ্ন: রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে সালাম জানানোর ফজিলত কি?
উত্তর: হাদিস শরীফে এসেছে, কোনো ব্যক্তি যখন দূর থেকে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর সালাম পাঠ করে, তখন নিযুক্ত ফেরেশতাগণ সেই সালাম প্রিয় নবীর রওজা শরীফে পৌঁছে দেন এবং আল্লাহ তাঁর রহমত বর্ষণ করেন।
প্রশ্ন: দাঁড়িয়ে সালাম পেশ করা কি জায়েজ?
উত্তর: শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে কিয়াম বা দাঁড়িয়ে সালাম পেশ করাকে অধিকাংশ মুহাদ্দিস ও আলেম মুস্তাহাব বা প্রশংসনীয় আদব হিসেবে গণ্য করেছেন।

Leave a Comment