উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে রাজনীতির দ্বিমুখী প্রভাব: নীতি, প্রতিষ্ঠান ও প্রবৃদ্ধির বিশ্লেষণ
রাজনীতি (Politics) ও অর্থনীতি (Economy)—এই দুটি ক্ষেত্র একটি রাষ্ট্রের ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে কাজ করে। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোর ক্ষেত্রে, এই দুইয়ের আন্তঃসম্পর্ক কেবল পরিপূরক নয়, বরং প্রায়শই রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলোই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং সামাজিক কল্যাণের গতিপথ নির্ধারণ করে। অর্থনীতির মূল কাজ সীমিত সম্পদ দিয়ে অসীম চাহিদা পূরণ করা, আর রাজনীতির লক্ষ্য হলো জনকল্যাণ নিশ্চিত করার জন্য সেই সম্পদ বণ্টনের নীতি ও পদ্ধতি স্থির করা। এই নিবন্ধে আমরা বিশ্লেষণ করব, কীভাবে রাজনৈতিক ক্ষমতা এবং সিদ্ধান্তগুলো উন্নয়নশীল অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ন্ত্রণ স্থাপন করে।
উন্নয়নশীল দেশে রাজনীতির আধিপত্যের ভিত্তি
উন্নত দেশগুলোতে যেখানে অর্থনীতি বাজার শক্তি ও শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর উপর নির্ভরশীল, সেখানে উন্নয়নশীল বা উদীয়মান অর্থনীতিতে রাষ্ট্রের ভূমিকা অনেক বেশি প্রকট। এই আধিপত্যের মূল কারণগুলো হলো দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি এবং স্বল্প বিকশিত বাজার ব্যবস্থা।
দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো
উন্নয়নশীল দেশগুলোতে প্রায়শই অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো (যেমন বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক) পুরোপুরি স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে না। ফলস্বরূপ, রাজনৈতিক নেতৃত্ব অর্থনৈতিক নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নেঅস্বাভাবিক নিয়ন্ত্রণপ্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন। উদাহরণস্বরূপ, যে কোনো বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্প (যেমন সেতু, বন্দর বা বিদ্যুৎ কেন্দ্র) অর্থনৈতিক বিশ্লেষণের চেয়েও রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে নেওয়া হয়, যা অর্থনীতির জন্য দীর্ঘমেয়াদী ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
সরকারি নীতির কেন্দ্রীয় ভূমিকা
উন্নয়নশীল দেশগুলো প্রায়শই বেসরকারি খাতকে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দিতে পারে না, কারণ তাদের লক্ষ্য থাকে দ্রুত দারিদ্র্য বিমোচন ও শিল্পায়ন। এজন্য সরকার রাজস্ব নীতি (Fiscal Policy), আর্থিক নীতি (Monetary Policy) এবং বৈদেশিক বাণিজ্য নীতি প্রণয়নে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে। এই নীতিগুলো রাজনৈতিক ক্ষমতার মাধ্যমে সরাসরি অর্থনৈতিক গতিকে প্রভাবিত করে।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির উপর রাজনীতির প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণ
রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং সুশাসন সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ (Foreign Direct Investment - FDI) আকর্ষণ করার ক্ষমতাকে প্রভাবিত করে। একজন বিনিয়োগকারী এমন একটি দেশে পুঁজি বিনিয়োগ করতে চান, যেখানে সরকারের নীতি স্থিতিশীল এবং চুক্তির নিশ্চয়তা রয়েছে।

রাজনৈতিক অস্থিরতার অর্থনৈতিক মূল্য
আমাদের অভিজ্ঞতা বলে, যখনই কোনো দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা বা সংঘাত দেখা দেয়, তখন শেয়ারবাজারের পতন ঘটে এবং বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় হার (Exchange Rate) অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। ঘন ঘন ধর্মঘট, অবরোধ বা নির্বাচনের অনিশ্চয়তা বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আস্থা মুহূর্তের মধ্যে হ্রাস করে দেয়। একটি বাস্তব উদাহরণ হিসেবে, নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত সিদ্ধান্তগুলো প্রায়শই আটকে যায়, যা বৃহৎ শিল্প স্থাপন বা অবকাঠামো নির্মাণে বিলম্ব ঘটায়, ফলে জাতীয় অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বাজেট প্রণয়ন ও সম্পদ বণ্টন
প্রতি বছর প্রণীত জাতীয় বাজেট মূলত একটিরাজনৈতিক দলিল। সরকার কোন খাতে কতটুকু বরাদ্দ দেবে—তা অর্থনৈতিক চাহিদা ও অগ্রাধিকারের চেয়েও অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির উপর নির্ভর করে। উদাহরণস্বরূপ:
- নির্দিষ্ট অঞ্চলে রাস্তা বা স্কুল নির্মাণ করা—যা সেই অঞ্চলের রাজনৈতিক ভোটব্যাংককে শক্তিশালী করবে।
- কৃষি বা শিল্প খাতে ভর্তুকি প্রদান করা, যা জনতুষ্টির জন্য জরুরি।
- গুরুত্বপূর্ণ মেগা প্রকল্পগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করা, যা রাজনৈতিক সাফল্য হিসেবে তুলে ধরা যায়।
এক্ষেত্রে রাজনীতির লক্ষ্য থাকে ক্ষমতার ধারাবাহিকতা, আর অর্থনীতি সেই লক্ষ্য পূরণের অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে।
সুশাসন এবং দুর্নীতির প্রভাব: বিশ্বস্ততার সংকট
অর্থনীতি ও রাজনীতির সম্পর্কের সবচেয়ে অন্ধকার দিকটি হলো সুশাসনের অভাব ও দুর্নীতি। দুর্নীতি এমন একটি অদৃশ্য করের মতো কাজ করে, যা অর্থনৈতিক উন্নয়নের গতিকে মারাত্মকভাবে থামিয়ে দেয়।
দুর্নীতির ফলে সম্পদের অপচয়
যখন রাজনৈতিক ক্ষমতা অপব্যবহার করা হয়, তখন সরকারি তহবিল ব্যক্তিগত পকেটে চলে যায়। এর ফলে সরকারি প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন খরচ কৃত্রিমভাবে বেড়ে যায়, কিন্তু কাজের মান খারাপ হয়। এতে রাষ্ট্রের সম্পদ অপচয় হয় এবং সাধারণ মানুষ তাদের প্রাপ্য কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হয়। এটি দেশের ব্যাংকিং খাত, কর ব্যবস্থা এবং আমদানি-রপ্তানি নীতিমালায় মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
সামাজিক ন্যায়বিচার ও অসমতা
রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত যখন নিরপেক্ষতার ভিত্তিতে না হয়ে পক্ষপাতিত্বের ভিত্তিতে নেওয়া হয়, তখন সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্য বাড়ে। সরকার যদি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা ব্যক্তির অর্থনৈতিক সুবিধা নিশ্চিত করে, তবে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ অর্থনৈতিক সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়, যা সামাজিক অস্থিরতা বাড়াতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করে।
সম্পর্কটি দ্বিমুখী: অর্থনীতি কীভাবে রাজনীতিকে প্রভাবিত করে?
যদিও উন্নয়নশীল দেশে রাজনীতিই অর্থনীতির উপর বেশি নিয়ন্ত্রণ রাখে, সম্পর্কটি কখনোই একমুখী নয়। দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা সরাসরি রাজনৈতিক পরিস্থিতিকেও প্রভাবিত করে:
- অর্থনৈতিক অসন্তোষ:উচ্চ মূল্যস্ফীতি (Inflation) বা বেকারত্ব সৃষ্টি হলে জনগণের মধ্যে দ্রুত রাজনৈতিক অসন্তোষ তৈরি হয়, যা সরকারের পতন বা রাজনৈতিক পরিবর্তনের দিকে পরিচালিত করতে পারে।
- মধ্যবিত্ত শ্রেণির উত্থান:অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ফলে যখন একটি শক্তিশালী মধ্যবিত্ত শ্রেণি গড়ে ওঠে, তখন তারা উন্নততর সুশাসন, স্বচ্ছতা ও রাজনৈতিক জবাবদিহিতা দাবি করে।
এভাবে, অর্থনীতি এক ধরনের চাপ তৈরি করে যা রাজনৈতিক সংস্কারের দিকে সরকারকে ঠেলে দেয়।
উপসংহার
রাজনীতি এবং অর্থনীতি—এই দুটি ক্ষেত্র একটি দেশের অস্তিত্বের জন্য অপরিহার্য এবং পরস্পর নির্ভরশীল। তবে, উন্নয়নশীল অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে, রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলোই প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার সুযোগে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সম্পদ বণ্টন এবং বিনিয়োগের পরিবেশকে নিয়ন্ত্রণ করে। একটি দেশকে টেকসই উন্নয়নের পথে নিয়ে যেতে হলে, প্রথমে এমন একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে যা অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, সুশাসন এবং স্বচ্ছতাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেবে। অর্থনৈতিক সাফল্য ছাড়া রাজনৈতিক স্থায়িত্ব অসম্ভব, আর শক্তিশালী রাজনৈতিক নেতৃত্ব ছাড়া অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জন করা কঠিন।
— নিবন্ধটি ডেভেলপমেন্ট ইকোনমিক্স ও পাবলিক পলিসিতে অভিজ্ঞ একজন বিশ্লেষক দ্বারা রচিত। এটি উন্নয়নশীল দেশের রাজনৈতিক অর্থনীতির জটিল সম্পর্ক ব্যাখ্যা করতে সহায়তা করবে।