আহলে বাইতের ভালোবাসায় আল্লাহ ও রাসূলের সন্তুষ্টি নিহিত
উপাধ্যক্ষ

আহলে বাইত রাদ্বিয়াল্লাহু তা'আলা আনহুম-এর প্রতি ভালোবাসা ইসলামে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। আহলে বাইতের ভালোবাসায় আল্লাহ তা'আলা ও রাসূল (স.)-এর সন্তুষ্টি নিহিত। এটি শুধু রাসূলুল্লাহ (স.)-এর পরিবারের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালবাসা নয়; বরং এর মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলার নৈকট্য ও ভালোবাসা লাভ করা যায়। এই প্রবন্ধে আমরা আহলে বাইতের পরিচয়, তাঁদের মর্যাদা এবং তাঁদের প্রতি ভালোবাসার গুরুত্ব সম্পর্কে কুরআন ও হাদিসের আলোকে বিস্তারিত আলোচনা করব।
আহলে বাইত রাদ্বিয়াল্লাহু তা'আলা আনহুম'র পরিচয়
আহলে বাইতের পরিচয় নিয়ে আলেমগণের মধ্যে কিছু ভিন্নমত থাকলেও প্রধান দুটি অভিমত নিচে তুলে ধরা হলো:
প্রথম অভিমত:
আহলে বাইত বলতে রাসূলুল্লাহ (স.), হযরত আলী, হযরত ফাতিমাহ্, হযরত হাসান ও হযরত হোসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম—এই পাঁচ জনকে বুঝানো হয়। এ ব্যাপারে হাদিস শরীফে রয়েছে:
অনুবাদ: হযরত আমির ইবন সা'দ ইবন আবী ওয়াক্কাস রা. হতে বর্ণিত, তিনি তার পিতা থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি [হযরত সা'দ ইবন আবী ওয়াক্কাস রা.] বলেন, যখন এ আয়াত নাযিল হলো (বলুন, তবে চলো আমরা আমাদের ও তোমাদের সন্তানদেরকে ডেকে নিই) তখন রাসূলুল্লাহ (স.) হযরত আলী, ফাতিমাহ্, হাসান এবং হুসাইন রা. কে ডেকে বললেন, "হে আল্লাহ, এরা হচ্ছে আমার আহলে বাইত।"
হাদিস শরীফে আরো রয়েছে:
অনুবাদ: হযরত ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন এ আয়াত নাযিল হল- (হে রাসূল) আপনি বলুন, আমি আমার দাওয়াতের জন্য তোমাদের কাছে কোনো বিনিময় চাই না, কেবল আমার নিকট আত্মীয়ের প্রতি সৌহার্দ চাই। তখন সাহাবায়ে কেরাম বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, আপনার আত্মীয়-স্বজন কারা? যাদের সাথে মুহব্বতের সম্পর্ক রাখা আমাদের ওপর ওয়াজিব। নবী করীম (স.) বললেন, তাঁরা হলেন হযরত আলী, ফাতিমাহ্ এবং তাঁদের দু'পুত্র ইমাম হাসান ও হুসাইন রা.।
উপরোক্ত হাদিসসমূহ দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, রাসূল (স.)-এর আহলে বাইত বলতে কেবল হযরত আলী, ফাতিমাহ্, হাসান এবং হুসাইন রা. কে বুঝানো হয়েছে।
দ্বিতীয় অভিমত:
নবী করীম (স.)-এর সম্মানিত স্ত্রী-উম্মাহাতুল মু'মিনীন, সন্তান এবং বানু হাশিম ইবন আবদে মুনাফ ও বানূ মুত্তালিব বংশের প্রত্যেক মুসলমান নর-নারী হলেন আহলে বাইত। ইবন হাজার আল আসকালানী রাহ্. সহ অধিকাংশ আলিম এ অভিমত পোষণ করেছেন। তবে ইমাম আ'যম আবূ হানীফা রাহ্. কেবল বানু হাশিমকে বিবেচনা করেছেন। কেননা, হাদিস শরীফে রয়েছে, হযরত আব্দুল মুত্তালিব বিন রাবিআ ইবন হারিস ইবন আবদুল মুত্তালিব রা. এবং হযরত তালহা ইবন আব্বাস রা. একবার রাসূল (স.)-এর কাছে এসে তাঁদেরকে সাদকার মালে শরীক করার অনুরোধ করলেন। রাসূল (স.) তখন তাদেরকে বললেন, শুনো,
অনুবাদ: "নিশ্চয়ই সাদকার মাল মুহাম্মদের পরিবারবর্গের জন্য জায়িয নয়; বরং এতো মানুষের (সম্পদের) আবর্জনা।"
এ হাদিস থেকে স্পষ্টত বুঝা যায় যে, রাসূল (স.) তাদেরকে আহলে বাইতের অন্তর্ভুক্ত করেছেন।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন:
অনুবাদ: “(হে নবী পত্নীগণ,) তোমরা তোমাদের গৃহসমূহে অবস্থান করো। আর জাহিলী যুগের অনুরূপ নিজেদেরকে প্রকাশ করো না। আর তোমরা নামায কায়েম করো, যাকাত আদায় করো এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অনুসরণ করো। হে আহলে বাইতগণ, নিশ্চয়ই আল্লাহ কেবল ইচ্ছে করেন যে, তোমাদের থেকে অপবিত্রতা দূর করতে এবং তোমাদেরকে পূর্ণরূপে পুত-পবিত্র করতে।” (সূরা আল আহযাব: ৩৩)
এ আয়াত এবং তৎপূর্ববর্তী ও পরবর্তী আয়াতসমূহে নবী করীম (স.)-এর স্ত্রীগণকে উদ্দেশ্য করে আল্লাহ তা'আলা নির্দেশনা প্রদান করেছেন। তাই আয়াতে 'হে আহলে বাইতগণ' দ্বারা তাঁর স্ত্রীগণও অন্তর্ভুক্ত হবেন।
তাছাড়া হাদিস শরীফে রয়েছে, হযরত উম্মে সালামাহ্ রা. বলেন:
অনুবাদ: "আমার ঘরে অবতীর্ণ হয়েছে 'হে আহলে বাইতগণ, নিশ্চয়ই আল্লাহ কেবল ইচ্ছা করেন যে, তোমাদের থেকে অপবিত্রতা দূর করতে এবং তোমাদেরকে পূর্ণরূপে পূত-পবিত্র করতে'-এ আয়াত নাযিল হয়েছিলো। তখন রাসূলুল্লাহ (স.) হযরত ফাতিমাহ্, হযরত আলী, ইমাম হাসান এবং হুসাইন রা.-কে ডেকে পাঠালেন। আর বললেন, হে আল্লাহ। এরা আমার আহলে বাইত। হযরত কাদ্বী ও সুলামীর হাদীসে রয়েছে, এরা আমার পরিবার। উম্মে সালামাহ্ রা. বলেন, আমি তখন বললাম, হে আল্লাহর রাসূল, আমি কি আহলে বাইতের অন্তর্ভুক্ত? রাসূল জবাব দিলেন, 'হ্যাঁ'। যদি আল্লাহ তা'আলা চান।"
এ হাদিস দ্বারাও প্রমাণিত হয়, রাসূলুল্লাহ (স.)-এর স্ত্রীগণ আহলে বাইতের অন্তর্ভুক্ত।
আল্লাহ ও রাসূলের সন্তুষ্টি অর্জনে আহলে বাইতের ভালোবাসার অপরিহার্যতা
আহলে বাইতকে ভালোবাসা এবং তাদেরকে সম্মান করা ফরয। কেননা তাদেরকে ভালোবাসা ও সম্মান করা নবী কারীম (স.)-কে ভালবাসা ও সম্মান করার অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ তা'আলা ও রাসূলুল্লাহ (স.) তাদেরকে ভালোবাসতে আদেশ করেছেন।
অনুবাদ: "হে নবী, আপনি বলুন, আমি তোমাদের কাছে কোনো বিনিময় চাই না, চাই শুধু আমার স্বজনদের (আহলে বাইতদের) প্রতি ভালোবাসা।" (সূরা আশ শুরা: ২৩)
আল্লাহ তায়ালা আরও ইরশাদ করেন:
অনুবাদ: "বলুন, আমি তোমাদের কাছে কোন পারিশ্রমিক চাই না বরং তা তোমাদেরই। আমার পুরস্কার তো আল্লাহর কাছে রয়েছে। তিনি সব কিছুর উপরই সাক্ষী।" (সূরা সাবা: ৪৭)
রাসূল (স.)-এর সম্মান ও মুহাব্বত সবকিছুর চেয়ে বেশি হওয়া আমাদের ঈমানের অঙ্গ ও ভিত্তি। নবী পরিবারের প্রতি ভালোবাসার মর্যাদা এবং এর গুরুত্ব বর্ণনা করে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন:
অনুবাদ: "অতঃপর আপনার কাছে সঠিক জ্ঞান আসার পর যারা আপনার সঙ্গে ঝগড়া করে, আপনি তাদের বলে দিন, এসো আমরা ডাকি আমাদের সন্তানদের ও তোমাদের সন্তানদের, আমাদের মহিলাদের ও তোমাদের মহিলাদের এবং আমাদের নিজেদের ও তোমাদের নিজেদের। অতঃপর আমরা আন্তরিকভাবে প্রার্থনা করি, মিথ্যাবাদীদের ওপর অভিসম্পাত করি।" (সূরা আলে ইমরান: ৬১)
এ আয়াতে খ্রিষ্টান পাদ্রিদের সাথে রাসূল (স.)-এর সত্য-মিথ্যার প্রতিযোগিতার আহ্বান জানানো হয়। রাসুল হযরত হাসান, হুসাইন, ফাতিমাহ্, আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা'আলা আনহুম এবং নিজেকে মুবাহিলার ময়দানে উপস্থিত করেন। সমগ্র সৃষ্টির শ্রেষ্ঠদের ভেতর থেকে নূরে মোহাম্মাদির তাজাল্লির বহিঃপ্রকাশ দেখে খ্রিষ্টান পাদ্রিরা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে গিয়েছিল। পাদ্রিরা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ না করে বশ্যতা স্বীকার করে জিজিয়া কর দেবে এ শর্তে মদীনা শরীফ ত্যাগ করে।
আল্লাহ পাক আহলে বাইতের জন্য যুদ্ধলব্ধ সম্পদ গণীমত এবং 'ফাইয়ের' মালে অংশ নির্ধারণ করেছেন। আল্লাহ পাক বলেন:
অনুবাদ: “আল্লাহ পাক জনপদবাসীদের কাছ থেকে যা কিছু তার রাসূলকে দিয়েছেন, তা আল্লাহর, তাঁর রাসুলের আত্মীয়স্বজনের, এতিমদের এবং অভাবগ্রস্ত ও মুসাফিরদের জন্য।” (সূরা হাশর: ৭)
অনুবাদ: "তোমরা জেনে রাখ যুদ্ধে গণীমতের যে মাল তোমরা লাভ কর, তার এক-পঞ্চমাংশ আল্লাহর রাসুলের, রাসুলের আত্মীয়স্বজন, ইয়াতীম, দরিদ্র এবং মুসাফিরদের।" (সূরা আনফাল: ৪১)
তবে আল্লাহপাক আহলে বাইতকে সদকা এবং যাকাতের মাল থেকে পাক-পবিত্র রেখেছেন।
সাহাবায়ে কেরাম ও ইমামগণের অভিমত
হযরত আবূ বকর সিদ্দীক রা. বলেন:
"মহানবী (স.)-এর সন্তুষ্টি তাঁর আহলে বাইতের ভালোবাসার মাধ্যমে অন্বেষণ করো।" (সহীহ বুখারী)
ইমাম শাফি'ঈ রাহ্. বলেন, "ইয়া আহলা বাইতে রাসূল, আপনাদের মুয়াদ্দাত (আনুগত্যপূর্ণ ভালোবাসা) পবিত্র কুরআনে আবশ্যক করা হয়েছে, যে ব্যক্তি নামাযে আপনাদের উপর দুরূদ পড়বেনা তার নামাযই কবুল হবে না।"
হাদিস শরীফে রয়েছে:
"আমার আহলে বাইতের প্রতি ভালোবাসা জান্নাতে প্রবেশ করাবে, আর তাঁদের প্রতি বিদ্বেষ জাহান্নামে নিয়ে যাবে।" (আল-মুস্তাদরাক)
সন্তানদেরকে আহলে বাইতের প্রতি ভালোবাসার শিক্ষা দেওয়া জরুরী। হযরত আলী ইবন আবী তালিব রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (স.) ইরশাদ করেন:
অনুবাদ: "তোমরা সন্তানদেরকে তিনটি জিনিসের প্রতি আদব শিক্ষা দাও। ১. তোমাদের নবীর প্রতি ভালোবাসা ২. তাঁর আহলে বাইতের প্রতি ভালোবাসা ৩. কুরআন মাজীদ তিলাওয়াত।"
সাহাবায়ে কেরাম, তাবিঈন, তাব'য়ি তাবিঈন, সালফে সালিহীন, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের উলামায়ে কেরাম ও সর্বস্তরের সুন্নি মুসলমান আহলে বাইতের প্রতি ভালোবাসা রাখতেন। আহলে বাইতকে যারা ভালোবাসবে তারা জান্নাতী। আল্লাহ পাক আমাদেরকে রাসূল (স.)-এর ও আহলে বাইতের মার্যাদা অনুধাবন করার এবং তাদেরকে ভালোবাসার তাওফিক দান করুন। আমীন।