ঐতিহ্যের আলোয় জামেয়া: ইতিহাস, শিক্ষা স্তর ও সাম্প্রতিক অর্জন

Faruk Sir
0

ঐতিহ্যের আলোয় জামেয়া: ইতিহাস, শিক্ষা স্তর ও সাম্প্রতিক অর্জন

মুহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক
সহকারী শিক্ষক (সামাজিক বিজ্ঞান)

ঐতিহ্যের আলোয় জামেয়া: ইতিহাস, শিক্ষা স্তর ও সাম্প্রতিক অর্জন


আওলাদে রাসূল, হযরত শাহ্ সুফী আল্লামা সৈয়দ আহমদ শাহ্ সিরিকোটি রাহ্. আ'লা হযরতের মাসলাকের ভিত্তিতে ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দে জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া কামিল মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি ১৯৫৯ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত জামেয়ার শিক্ষা কার্যক্রম নিবিড়ভাবে তত্ত্বাবধান ও পরিচালনা করেন। ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৯৯৩ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত আওলাদে রাসূল, গাউসে যামান হাফেয ক্বারী আল্লামা সৈয়দ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ্ রাহ্.-এর পৃষ্ঠপোষকতায় জামেয়া দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় মাদ্রাসায় পরিণত হয়।

শরীআত ও ত্বরীকতের শিক্ষা-দীক্ষায় অনন্য ভূমিকার জন্য হকের প্রতীক হিসেবে তিনি জামেয়াকে “কিশতিয়ে নূহ” এবং “জান্নাত নিশান” আখ্যা দেন। ১৯৯৪ খ্রিস্টাব্দ থেকে অদ্যাবধি আনজুমান-এ রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া ট্রাস্ট-এর প্রেসিডেন্ট আওলাদে রাসূল, গাউসে যামান হযরত আল্লামা সৈয়দ মুহাম্মদ তাহের শাহ্ মুদ্দাজিল্লুহুল আলী ও আনজুমান ট্রাস্টের এক্সিকিউটিভ প্রেসিডেন্ট আওলাদে রাসূল, হাদীয়ে দ্বীন ও মিল্লাত, পীর-এ বাঙ্গাল হযরত আল্লামা সৈয়দ মুহাম্মদ সাবির শাহ্ মুদ্দাজিল্লুহুল আলী-এর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধান ও পৃষ্ঠপোষকতায় জামেয়া দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা অর্জন করে।

মূলনীতি ও লক্ষ্য

মূলনীতি/নীতিবাক্য

জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া কামিল মাদ্রাসার মূলনীতি বা নীতিবাক্য হলো: “কাম করো, ইসলাম কো বাঁচাও, দ্বীন কো বাঁচাও, সচ্চা আলেম তৈয়্যার করো।” অর্থাৎ “কাজ করো, ইসলামকে বাঁচাও, দ্বীনকে বাঁচাও, সত্যিকার আলেম তৈরি করো।”

লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য

  • ক. আক্বিদায়ে আহলে সুন্নাহ্, মাযহাবে হানাফী, ত্বরীক্বাহ্-এ কাদেরিয়া ও মাসলাকে আ'লা হযরতের ভিত্তিতে কুরআন, হাদীস, ফিকহ্, বালাগাত, মানতিক, আরবী, উর্দু, ফার্সি ভাষা ও তাসাউফের জ্ঞান চর্চার মাধ্যমে যোগ্য নাগরিক ও সুযোগ্য আলিমে দ্বীন গড়ে তোলা।
  • খ. শিক্ষার্থীদের সততা, নৈতিকতা, শৃঙ্খলা, আত্মশুদ্ধি, দায়িত্ববোধ, মানবতা, সৃজনশীলতা, নেতৃত্বগুণ ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করে আদর্শ নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা।
  • গ. দ্বীনি জ্ঞান ও বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান, ইতিহাস, আইসিটি ইত্যাদি জ্ঞানের ভারসাম্যপূর্ণ সমন্বয়ের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের বিশ্ব নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা।
  • ঘ. পাঠক্রম ও সহপাঠক্রমিক কার্যক্রমের সমন্বয়ে শিক্ষার্থীদের জ্ঞানচর্চাকে আধুনিক ও প্রাণবন্ত করা।
  • ঙ. শিক্ষার্থীদের মধ্যে ইসলামের চেতনা জাগ্রত করে সুন্নিয়ত, তরিক্বত ও দেশ-সমাজের কল্যাণে আত্মত্যাগী মানসিকতা সৃষ্টি করা।

শিক্ষার স্তর

বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ইবতেদায়ী, দাখিল (সাধারণ ও বিজ্ঞান), আলিম (সাধারণ ও বিজ্ঞান), ইসলামী আরবী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ফাজিল (স্নাতক) পাস, ফাজিল অনার্স (আল কুরআন, আল হাদীস ও আল ফিক্বহ্), কামিল (হাদীস, ফিক্বহ্ ও তাফসীর) এবং কামিল মাস্টার্স (আল কুরআন ও আল হাদীস) স্তরের শিক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে। এতে দক্ষ, অভিজ্ঞ মুহাদ্দিস, ফক্বীহ্, মুফাসসির ও বিষয়ভিত্তিক যোগ্য ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক দ্বারা পাঠদান করা হয়।

ইবতেদায়ী

ইবতেদায়ী শিক্ষা হলো জীবনের মজবুত ভিত্তি, যেখানে ভবিষ্যতের স্বপ্ন গড়ে ওঠে। ইবতেদায়ীকে মাদ্রাসার ‘একাডেমিক ফাউন্ডেশন’ আখ্যায়িত করে এর প্রতি সার্বক্ষণিক যত্নবান থাকার জন্য বর্তমান হুজুর ক্বিবলাছয়েরও বিশেষ নির্দেশনা রয়েছে। ইবতেদায়ী স্তরে ১ম শ্রেণি থেকে ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত প্রত্যেক শ্রেণিতে ৩টি করে সেকশন রয়েছে। বর্তমানে এ স্তরে ১,১৬৮ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত।

দাখিল

দাখিল স্তরের শিক্ষা হলো জীবনের স্বপ্ন ও বাস্তবতার মাঝে সেতুবন্ধন। যেখানে শুধু পাঠ্যজ্ঞান নয়, সততা, নৈতিকতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার শিক্ষাও দেয়। দাখিল ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে দাখিল দশম শ্রেণি পর্যন্ত প্রত্যেক শ্রেণিতে ৪টি করে সেকশন রয়েছে। বর্তমানে এ স্তরে ২,২০৭ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত।

আলিম

আলিম স্তরের শিক্ষা শিক্ষার্থীদের জীবনের দিশা দেখায় এবং উচ্চতর শিক্ষার ভিত্তি স্থাপন করে। যেখানে গড়ে ওঠে স্বাধীন চিন্তাশক্তি, আত্মবিশ্বাস ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা। আলিম প্রথম বর্ষে ৪টি ও দ্বিতীয় বর্ষে ৩টি সেকশন রয়েছে। ২০২৪-২০২৫ শিক্ষাবর্ষে আলিম স্তরে বিজ্ঞান বিভাগ চালু করা হয়। বর্তমানে এ স্তরে ২,২৪৫ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত।

ফাযিল স্নাতক (পাস)

ফাযিল স্তর শুধু ডিগ্রির জন্য নয়, এটি চিন্তা, গবেষণা ও সৃষ্টিশীলতার এক নতুন দিগন্ত। ইসলামী আরবী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ৩ বছর মেয়াদী ফাযিল পাস স্তর রয়েছে। প্রথম বর্ষে ২টি সেকশন, দ্বিতীয় ও তৃতীয় বর্ষে ১টি সেকশন রয়েছে। বর্তমানে এ স্তরে ১,৮৯৮ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত।

ফাযিল স্নাতক (অনার্স)

ফাযিল অনার্স শিক্ষা শিক্ষার্থীদের আত্মনির্ভরশীল, দায়িত্বশীল, ও ইসলামী সমাজ গঠনমূলক চিন্তায় উদ্বুদ্ধ করে। এটি জাতির মেধাবী নেতৃত্ব তৈরির অন্যতম প্রধান ধাপ। ইসলামী আরবী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ৪ বছর মেয়াদী ফাযিল অনার্স স্তরে ৩টি বিভাগ (আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ, আল-হাদীস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ এবং আল ফিক্বহ্ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ) রয়েছে। প্রতি বিভাগে ৯০ জন করে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়। বর্তমানে এ স্তরে ৯৬০ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত।

কামিল ও মাস্টার্স

কামিল (হাদীস, ফিক্বহ্ ও তাফসীর) স্তরের শিক্ষা জ্ঞানের গভীরতা অন্বেষণ ও গবেষণার দিগন্ত উন্মোচনের অন্যতম স্তর। এ স্তরে শিক্ষার্থীরা শুধু শেখে না, নতুন জ্ঞান সৃষ্টির পথও খুঁজে পায়। বর্তমানে এ স্তরে ১,৩৮৪ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত। পাশাপাশি, ১ বছর মেয়াদী কামিল মাস্টার্স স্তরে আল্ কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ এবং আল্ হাদীস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ রয়েছে। বর্তমানে এ স্তরে ১০০ শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত।

হিফযখানা

হিফজুল কুরআন শিক্ষা হৃদয়ে আল্লাহর বাণী ধারণের সর্বোচ্চ মর্যাদাপূর্ণ অধ্যয়ন। হিফযখানায় বর্তমানে ১ জন হিফয পরিচালক, ১ জন ক্বারী ও ৮ জন হিফয শিক্ষক রয়েছেন। হিফযখানায় নাযিরা বিভাগ ও হিফয বিভাগ রয়েছে। বর্তমানে উভয় বিভাগে ২০৬ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত। বিগত ৩ (তিন) বছরে ১০৭ জন শিক্ষার্থী হিফয সমাপ্ত করেছে।

একনজরে শিক্ষার্থী সংখ্যা

ক্রম স্তর শাখা শিক্ষার্থী সংখ্যা
ইবতেদায়ী প্রতি শ্রেণিতে ৩টি করে ১,১৬৮ জন
দাখিল প্রতি শ্রেণিতে ৪টি করে ২,২৪৫ জন
আলিম ১ম বর্ষে ৪টি ও ২য় বর্ষে ৩টি ২,২৪৬ জন
ফাযিল (পাস) ১ম বর্ষে ২টি ১,৮৯৮ জন
ফাযিল (অনার্স) - ৯৬০ জন
কামিল (হাদীস, ফিক্বহ, তাফসীর) - ১,৩৮৪ জন
কামিল মাস্টার্স - ১০০ জন
হিফয বিভাগ - ২০৬ জন
মোট ছাত্রসংখ্যা ১০,২০৭ জন

সূত্র: আইসিটি বিভাগ, জামেয়া।

শিক্ষা কার্যক্রম ও নিয়মাবলি

রুটিন ও অ্যাসেম্বলি

ক্যাম্পাসে উপস্থিতি সকাল ৮.০০টায়। অ্যাসেম্বলি শুরু সকাল ৮.১৫ টায়। প্রথম ঘণ্টা শুরু হয় সকাল ৮.৩০ টায়। ১ম পর্বে জাতীয় পতাকা ও প্রতিষ্ঠানের পতাকা উত্তোলন এবং শরীরচর্চা হয়। ২য় পর্বে পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত ও না’ত-এ রাসূল পাঠ এবং স্লোগানের পর মুনাজাত অনুষ্ঠিত হয়। অ্যাসেম্বলি সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য প্রতিদিন ১৪ জন শিক্ষকের সমন্বয়ে আলাদা টিম রয়েছে।

ইউনিফর্ম ও অন্যান্য

ইসলামী আদর্শের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ সাদা পাঞ্জাবী, সাদা পায়জামা, সাদা টুপি এবং মাদ্রাসা কর্তৃক সরবরাহকৃত পরিচয়পত্রের ব্যবহার বাধ্যতামূলক। প্রতি বছর জানুয়ারি মাসে শিক্ষার্থীদের ‘সিলেবাস’ ও ‘ক্লাস ডায়েরি’ বিতরণ করা হয়।

বেতন ও ফি পরিশোধ

মাসিক বেতন ও অন্যান্য প্রাপ্য চলতি মাসের ১০ তারিখের মধ্যে ব্যাংক বা বিকাশে জমা করতে হয়। ছাত্রাবাসের খোরাকী ১ তারিখের মধ্যে পরিশোধ করতে হয়। বিলম্ব হলে ৩০ টাকা বিলম্ব ফি প্রযোজ্য।

সুযোগ-সুবিধা ও অবকাঠামো

বর্তমানে মাদ্রাসায় দক্ষ ও অভিজ্ঞ মোট ১১৫ জন শিক্ষক এবং ৪৭ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত আছেন।

  • ছাত্রাবাস: শিক্ষার্থীদের জন্য নিয়মতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করে। বর্তমানে প্রায় ৫০০ জন শিক্ষার্থী আবাসিক সুবিধা গ্রহণ করছেন। ১২ তলা বিশিষ্ট নতুন আবাসিক ভবনের কাজ প্রক্রিয়াধীন।
  • গ্রন্থাগার: ১৮,৬১০টি গ্রন্থ সমৃদ্ধ এই লাইব্রেরি জ্ঞানচর্চার প্রাণকেন্দ্র। দেশ-বিদেশের দুষ্প্রাপ্য কিতাব, জার্নাল ও ম্যাগাজিন এখানে সংরক্ষিত আছে।
  • ক্যান্টিন: ৩১ জুলাই ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দে ৩ তলা বিশিষ্ট ‘জামেয়া ক্যান্টিন’ উদ্বোধন করা হয়, যা শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের খাবারের চাহিদা পূরণ করছে।
  • স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র: ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দে ‘জামেয়া প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র’ উদ্বোধন করা হয়। এখানে একজন এমবিবিএস ডাক্তার নিয়মিত সেবা প্রদান করেন।
  • নিরাপত্তা (CCTV): পুরো ক্যাম্পাস ও শ্রেণিকক্ষ ১৭৪টি সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় আনা হয়েছে।
  • জামেয়া গার্ডেন: ক্যাম্পাসের সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে নানাজাতের ফুল ও ফলগাছ সমৃদ্ধ একটি বাগান তৈরি করা হয়েছে।

কেন্দ্রীয় পরীক্ষার ফলাফল

দাখিল পরীক্ষা : ২০২৫

বিভাগ পরীক্ষার্থী ৪০+ ৩৩+ ফেল জিপিএ ৫ মোট উত্তীর্ণ পাশের হার
মানবিক ৩৩০ ৭১ ২৩৩ ২৬ ০০ ৩০৪ ৯২.১২%
বিজ্ঞান ৮৪ ৮৮ ০০ ০০ ০০ ৮৪ ১০০%

দাখিল পরীক্ষা : ২০২৪

বিভাগ পরীক্ষার্থী ৪০+ ৩৩+ ফেল জিপিএ ৫ মোট উত্তীর্ণ পাশের হার
মানবিক ৩২২ ৮৭ ২২৮ ০৭ ০০ ৩১৫ ৯৭.৮২%
বিজ্ঞান ৭০ ৭০ ০০ ০০ ০০ ৭০ ১০০%

দাখিল (সাময়িক) পরীক্ষা : ২০২৩

১ম শিফট (মোট নিবন্ধিত ৩৫৬ জন)

বিভাগ মোট বিবরণ ৪০+ ৩৩+ ফেল উত্তীর্ণ পাশের হার
মোট ৩৫৬ ৮৪ ২৫৪ ১৮ ৩৩৮ ৯৪.৯৩%

২য় শিফট (মোট নিবন্ধিত ১৭৬ জন)

বিভাগ মোট বিবরণ ৪০+ ৩৩+ ফেল উত্তীর্ণ পাশের হার
মোট ১৭৬ ৭১ ১০৩ ০২ ১৭৪ ৯৮.৮৬%

জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠত্ব ও অর্জন

জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া কামিল মাদ্রাসা বিভিন্ন সময়ে জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহে ‘শ্রেষ্ঠ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান’ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।

  • শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষক: ২০০১ ও ২০০৪ সালে জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং আলহাজ্ব মাওলানা মুহাম্মদ জালালউদ্দীন আলক্বাদেরী (রাহ.) ‘শ্রেষ্ঠ অধ্যক্ষ’ নির্বাচিত হন।
  • শিক্ষার্থীদের সাফল্য: ২০১৯, ২০২২, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহ এবং শিশু-কিশোর সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় জামেয়ার শিক্ষার্থীরা ক্বিরাত, হামদ-নাত, আজান ও সাধারণ জ্ঞানে জাতীয় পর্যায়ে প্রথম স্থানসহ অসামান্য কৃতিত্ব অর্জন করেছে।
  • বিশ্ববিদ্যালয় ফলাফল: ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাযিল ও কামিল পরীক্ষায় জামেয়ার শিক্ষার্থীরা নিয়মিত দেশসেরা ফলাফল (১ম ও ২য় স্থান) অর্জন করে আসছে।

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (ICT)

শিক্ষার্থীদের দক্ষ নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে জামেয়ায় আইসিটি শিক্ষা বাধ্যতামূলক। ২০২৩ খ্রিস্টাব্দে ৪৮টি কম্পিউটার ও ২টি ল্যাপটপ সমৃদ্ধ আধুনিক ল্যাব স্থাপন করা হয়েছে। মাদ্রাসার দৈনন্দিন কার্যক্রম, যেমন—হাজিরা, ফলাফল, বেতন গ্রহণ ইত্যাদি সফটওয়্যারের মাধ্যমে পরিচালিত হয়।

ওয়েবসাইট: www.jaskm.edu.bd
ফেসবুক: facebook.com/jaskmofficials
ইমেইল: jasactg@gmail.com

সাম্প্রতিক কার্যক্রম

  • ল্যাঙ্গুয়েজ কোর্স: শিক্ষার্থীদের বৈশ্বিক যোগাযোগের উপযোগী করতে ‘স্পোকেন অ্যারাবিক’ ও ‘স্পোকেন ইংলিশ’ কোর্স চালু করা হয়েছে।
  • ক্বিরাত ও আরবী সংলাপ: সহীহ তেলাওয়াত ও আরবী কথোপকথনে দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য বিশেষ ক্লাসের ব্যবস্থা রয়েছে।
  • শিক্ষক প্রশিক্ষণ: পাঠদান মানোন্নয়নে নিয়মিত ইন-হাউজ ট্রেনিং ও কর্মশালার আয়োজন করা হয়।
  • সেমিনার: শিক্ষার্থীদের দৃষ্টিভঙ্গি প্রসারিত করতে বিজ্ঞান ও দ্বীনি বিষয়ে নিয়মিত সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়।
  • প্রকাশনা: জামেয়া প্রথমবারের মতো ৪ রঙের ১৭৬ পৃষ্ঠার ‘জামেয়া বার্ষিকী ২০২৪’ প্রকাশ করেছে।
  • অভিভাবক সমাবেশ: শিক্ষার মানোন্নয়ন ও শৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়মিত অভিভাবক সমাবেশ ও মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়।

সাম্প্রতিক কার্যক্রম ও পূর্ণাঙ্গ বিবরণ

স্পোকেন অ্যারাবিক কোর্স

জামেয়ার শিক্ষার্থীরা ইসলামী জ্ঞান, কুরআন-হাদীস, আন্তর্জাতিক যোগাযোগে সক্ষমতা বৃদ্ধি, আরবী ভাষাগত দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে জামেয়ায় ‘স্পোকেন অ্যারাবিক কোর্স’ চালু করা হয়। জামেয়ার দক্ষ ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকের মাধ্যমে ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দ থেকে দাখিল ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে কামিল স্তরের শিক্ষার্থীদের জন্য ‘স্পোকেন অ্যারাবিক কোর্স’ চালু করা হয়।

স্পোকেন ইংলিশ কোর্স

শিক্ষার্থীর ইংরেজি স্পোকেনে দক্ষতা বৃদ্ধি, বৈশ্বিক যোগাযোগে পারদর্শিতা অর্জন, শুদ্ধ উচ্চারণ, শব্দচয়ন ও বাক্যগঠনের দক্ষতা বৃদ্ধি, পাবলিক স্পিকিং ও প্রেজেন্টেশন দক্ষতায় আরও দক্ষ ও প্রস্তুত করার লক্ষ্যে স্পোকেন ইংলিশ কোর্স চালু করা হয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বহির্ভূত দক্ষ ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকের মাধ্যমে তৃতীয় শ্রেণি থেকে কামিল স্তরের শিক্ষার্থীদের জন্য ‘স্পোকেন ইংলিশ কোর্স’ চালু করা হয়। ৩য় থেকে ৫ম শ্রেণির জন্য ‘Kids Spoken English’, ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির জন্য ‘Teens Spoken English’ এবং আলিম থেকে কামিল শিক্ষার্থীদের জন্য ‘Regular Spoken English’ কোর্স চালু করা হয়।

ক্বিরাত প্রশিক্ষণ কোর্স

ক্বিরাত হচ্ছে আল কুরআনের সুরেলা ও শুদ্ধ উচ্চারণ। ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দের ফেব্রুয়ারি থেকে সহীহভাবে ক্বিরাত প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা চালু করা হয়। নির্ধারিত ফি জমা করে দাখিল ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে কামিল পর্যন্ত আগ্রহী শিক্ষার্থীদের কোর্সে অংশ নেয়ার সুযোগ রয়েছে। শিক্ষার্থীর শুদ্ধভাবে কুরআন তিলাওয়াত, তাজবিদের নিয়ম সঠিকভাবে প্রয়োগ, তিলাওয়াতে সৌন্দর্য ও সুর সৃষ্টি, মঞ্চে ও প্রতিযোগিতায় আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধিসহ ইত্যাদি ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আরবী সংলাপ

শিক্ষার্থীদের আরবী কথোপকথনে দক্ষতা বৃদ্ধি, আরবী উচ্চারণ, স্বরছন্দ ও বাক্যগঠনে শুদ্ধতা নিশ্চিত করা, আরবী শব্দভান্ডার বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক পরিসরে আরবীতে যোগাযোগসহ ইত্যাদি কারণে আরবী সংলাপ ক্লাস চালু করা হয়েছে। দাখিল ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে কামিল পর্যন্ত প্রত্যেক শ্রেণির জন্য সাপ্তাহিক ‘আরবী সংলাপ’ ক্লাস বাধ্যতামূলক। ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দে রুটিন অনুযায়ী আরবী সংলাপ ক্লাস পরিচালনার জন্য একজন দক্ষ ও অভিজ্ঞ আরবী সংলাপ শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

ইন-হাউজ ট্রেনিং ও শিক্ষক প্রশিক্ষণ

নবীন শিক্ষকদের পাঠদানের আধুনিক কলাকৌশল, শ্রেণি ব্যবস্থাপনা এবং পরিবর্তনশীল ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাক্রম সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দরকার। তাই দক্ষ-অভিজ্ঞ শিক্ষক ও প্রশিক্ষকদের সমন্বয়ে বিভিন্ন সময় পাঠদান কার্যক্রম মানোন্নয়ন ও দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ‘ইন-হাউজ ট্রেনিং ও শিক্ষক প্রশিক্ষণ’-এর ব্যবস্থা করা হয়। প্রয়োজনে প্রতিষ্ঠান বহির্ভূত দক্ষ ও অভিজ্ঞ প্রশিক্ষকদের আমন্ত্রণ করা হয়। গত ১১ অক্টোবর ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দেও শিক্ষকদের পাঠদান কার্যক্রম মানোন্নয়ন ও দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে একটি শিক্ষক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। উক্ত প্রশিক্ষণে প্রশিক্ষক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ড. শামসুদ্দিন শিশির, শিক্ষক প্রশিক্ষক, সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ চট্টগ্রাম ও প্রফেসর এএমএম মজিবুর রহমান, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর।

লাইব্রেরি ক্লাস

মেধা ও প্রতিভা বিকাশ এবং শিক্ষার্থীদের বই পড়ার অভ্যাস গড়ার লক্ষ্যে দাখিল ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে আলিম পর্যন্ত রুটিন অনুযায়ী সাপ্তাহিক লাইব্রেরি ক্লাস বাধ্যতামূলক। একজন শিক্ষক ও লাইব্রেরিয়ানদের তত্ত্বাবধানে শিক্ষার্থীরা লাইব্রেরি ক্লাস সম্পন্ন করে। মাদ্রাসা ছুটির পরও জামেয়ার শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের এমফিল ও পিএইচডি গবেষকদের জন্য লাইব্রেরি উন্মুক্ত থাকে।

বিজ্ঞান বিভাগ ও সমৃদ্ধ বিজ্ঞানাগার

দাখিল ও আলিম স্তরে বিজ্ঞান বিভাগ সমৃদ্ধ করা হয়েছে। বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের গবেষণা ও ব্যবহারিক ক্লাসের জন্য অ্যাকাডেমিক ভবন-৪ এর তৃতীয় তলায় ‘সমৃদ্ধ বিজ্ঞানাগার’ রয়েছে। এখানে একজন দায়িত্ববান শিক্ষক ও প্রদর্শকের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে রুটিন অনুযায়ী দাখিল ও আলিম ক্লাসের পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, জীববিজ্ঞান ও উচ্চতর গণিত বিষয়ের ব্যবহারিক ক্লাসের কার্যক্রম পরিচালিত হয়।

দৈনিক শ্রেণি কার্যক্রম রেজিস্টার

দৈনন্দিন শ্রেণি কার্যক্রম সম্পর্কে অভিভাবকদের অবহিতকরণের লক্ষ্যে ২০২৩ খ্রিষ্টাব্দের শুরু থেকে ইবতেদায়ী প্রথম শ্রেণি থেকে আলিম শ্রেণি পর্যন্ত ‘দৈনিক শ্রেণি কার্যক্রম রেজিস্টার’ ব্যবহার করা হয়। এতে বিষয় শিক্ষক স্ব স্ব শ্রেণির পাঠদান ও আগামী দিনের বাড়ির কাজ লিপিবদ্ধ করেন। শ্রেণি কার্যক্রম শেষে সম্মানিত শ্রেণি শিক্ষকগণ স্ব স্ব শ্রেণির WhatsApp গ্রুপে তা আপলোড করেন।

মেধাবৃত্তি প্রদান

২০২৪ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ইবতেদায়ী হতে আলিম পর্যন্ত বার্ষিক পরীক্ষা ও বর্ম সমাপনী পরীক্ষায় ১ম ও ২য় স্থান অধিকারী শিক্ষার্থীদের মেধা বৃত্তি প্রদান করা হয়। বৃত্তি প্রদানে পৃষ্ঠপোষক সংস্থা ও ব্যক্তিরা প্রত্যক্ষভাবে অবদান রাখছেন।

এসএমএস সার্ভিস

ইবতেদায়ী প্রথম শ্রেণি থেকে ফাজিল শ্রেণি পর্যন্ত প্রত্যেক সম্মানিত শ্রেণি শিক্ষক মাদরাসার নিজস্ব ওয়েবসাইটে দৈনিক হাজিরা বা উপস্থিতি-অনুপস্থিতি আপলোড দেন। অনুপস্থিত শিক্ষার্থীর অভিভাবকের মোবাইল নম্বরে অনুপস্থিতির বিষয়টি এসএমএস দ্বারা জানানো হয়।

শাখা বৃদ্ধিকরণ

২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ থেকে দাখিল ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত পূর্বের তিনটি শাখার সাথে আরও একটি শাখা বৃদ্ধি করে চারটি শাখায় শিক্ষা কার্যক্রম চলমান। আলিম প্রথম বর্ষেও একটি শাখা বৃদ্ধি করে বর্তমানে চারটি শাখায় উন্নীত করা হয়। দাখিল ও আলিম স্তরে ৩টি শাখা সাধারণ বিভাগ ও ১টি বিজ্ঞান বিভাগ রয়েছে।

স্কাউট

২০২৪ খ্রিষ্টাব্দ থেকে স্কাউট শিক্ষকগণের তত্ত্বাবধানে দাখিল ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক উন্নয়নে স্কাউট কার্যক্রম চালু রয়েছে। বর্তমানে মাদরাসায় তিনটি স্কাউট দলের কার্যক্রম চলছে।

বার্ষিক ইসলামী সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া প্রতিযোগিতা

জামেয়ায় প্রথম বারের মতো ‘বার্ষিক ক্রীড়া ও ইসলামী সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা ২০২৪’ অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৬৬টি ইভেন্টে প্রতিযোগিতা হয়। এতে প্রায় ১৯৮টি ১ম, ২য় ও ৩য় পুরস্কার এবং প্রায় ২ হাজার সান্ত্বনা পুরস্কার-এর ব্যবস্থা করা হয়। অনুষ্ঠানে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মাননীয় মেয়র জনাব ডা. শাহাদত হোসেন প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। উক্ত অনুষ্ঠানে ‘জামেয়া বার্ষিকী ২০২৪’-এর মোড়ক উন্মোচন করা হয়।

জামেয়া গার্ডেন

জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া কামিল মাদরাসার মনোরম ক্যাম্পাসকে ঘিরে মাঠের চারপাশে এক অপূর্ব সজীব সৌন্দর্যে ভরপুর জামেয়া গার্ডেন। সবুজে ঘেরা এই বাগান ক্যাম্পাসের পরিবেশে এনে দেয় সতেজতা, প্রশান্তি ও নান্দনিক সৌরভ। নানাজাতের ফুল ও ফলগাছে সমৃদ্ধ বাগানটি সারা বছরই থাকে সজীব ও প্রাণবন্ত।

স্তরভিত্তিক বিভাগীয় প্রধান নির্বাচন

অ্যাকাডেমিক ও প্রশাসনিক কাজ পরিচালনার সুবিধার্থে ০১ এপ্রিল ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ থেকে নতুন করে ইবতেদায়ী, দাখিল, আলিম-ফাজিল, কামিল ও অনার্স-মাস্টার্স পর্যায়ে স্তরভিত্তিক বিভাগীয় প্রধানের পদ সৃষ্টি করা হয়েছে। নির্বাচিত বিভাগীয় প্রধানরা হলেন- কামিল প্রধান মাওলানা ড. কামাল উদ্দিন আযহারী, ফাযিল অনার্স ও মাস্টার্স প্রধান মাওলানা মোহাম্মদ সাইফুদ্দীন খালেদ আযহারী, আলিম ও ফাযিল প্রধান হাফেয মাওলানা সৈয়দ মুহাম্মদ আজিজুর রহমান, দাখিল প্রধান মাওলানা মুহাম্মদ নঈমুল হক ও ইবতেদায়ী প্রধান মাওলানা মোহাম্মদ রবিউল হোসেন। অধ্যক্ষ মহোদয়ের পরামর্শ ও নির্দেশনা অনুযায়ী উক্ত প্রধানগণ সংশ্লিষ্ট স্তরের কাজে সার্বিক সহযোগিতা ও মনিটরিং করেন।

জামেয়া আবাসিক ভবন

জামেয়ায় ক্রমাবর্ধমান ছাত্রসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে ছাত্রাবাসের চাহিদাও দিন দিন বাড়তে থাকে। বর্তমানে মাদরাসার ছাত্রসংখ্যা ১০,২০৭ জন। তবে ছাত্রাবাসে মাত্র ৫০০ জন ছাত্রের থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। তাই ছাত্রাবাসের সংকট উত্তরণে জামেয়ার পৃষ্ঠপোষক পীর-এ বাঙ্গাল আল্লামা শাহ্ সুফী সৈয়দ মুহাম্মদ সাবির শাহ্ (মু.জি.আ.)’র নির্দেশনায় আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সমৃদ্ধ ১২ (বারো) তলা বিশিষ্ট ‘জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া কামিল মাদরাসা আবাসিক ভবন’ নির্মাণের কাজ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

জামেয়া ক্যান্টিন

জামেয়ার প্রায় ১৬০ জন শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং প্রায় ১০ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য কোনো ক্যান্টিনের ব্যবস্থা ছিল না। শ্রেণি কার্যক্রম চলাকালে নাস্তা-বিরতির সময় ছাত্রদের মাদরাসা ক্যাম্পাসের বাইরে হোটেল-রেস্টুরেন্ট ও ভাসমান খাবারের দোকানে যেতে হতো। শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের সুবিধার্থে মাদরাসা ক্যাম্পাসে তিন তলা বিশিষ্ট ক্যান্টিন ভবনের নির্মাণ কাজ সমাপ্ত হয়েছে। ৩১ জুলাই ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ, বুধবার ‘জামেয়া ক্যান্টিন’ শুভ উদ্বোধন করা হয়। 

উদ্বোধন অনুষ্ঠানে জামেয়ার গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান আবুল মহসিন মো. ইয়াহিয়্যা খান, গভর্নিং বডির সদস্য ও আনজুমান ট্রাস্টের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট আলহাজ মনজুর আলম মঞ্জু, গভর্নিং বডির সদস্য ও আনজুমান ট্রাস্টের সেক্রেটারি জেনারেল আলহাজ মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন, গভর্নিং বডির সদস্য ও আনজুমান ট্রাস্টের অ্যাসিস্টেন্ট সেক্রেটারি এস.এম গিয়াস উদ্দীন (শাকের) ও সম্মানিত শিক্ষকবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

জামেয়া প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র

জামেয়ার শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের প্রাথমিক চিকিৎসা, জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সেবা প্রদান এবং শিক্ষার্থীদের সুস্থ, সক্রিয় ও স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ‘জামেয়া প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র’ স্থাপন করা হয়। এ সেবা কেন্দ্রে ২টি বেড, অক্সিজেন সিলিন্ডার, প্রাথমিক মেডিসিন সেবাসহ একজন নিয়োগপ্রাপ্ত বিএমডিসি রেজিস্ট্রেশনকৃত এমবিবিএস ডাক্তার সকাল ৯টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের চিকিৎসা সেবা দেন। 

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা হিসেবে আছে- জামেয়ায় ৫ থেকে ১০ বেডের আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা স্থাপন, প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জন্য ডিজিটাল হেলথ কার্ড চালু, অনলাইন চিকিৎসাসেবা, বছরে একবার পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্য পরীক্ষার ব্যবস্থা, ২৪/৭ জরুরি মেডিকেল টিম ও অ্যাম্বুলেন্স সেবা চালু ইত্যাদি। আওলাদ-এ রাসূল, পীর-এ বাঙ্গাল, হযরাতুলহাজ্জ আল্লামা সৈয়দ মুহাম্মদ সাবির শাহ্ (মু.জি.আ.) ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ, সোমবার জামেয়া প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র শুভ উদ্বোধন করেন। শুভ উদ্বোধনের সময় উপস্থিত ছিলেন আওলাদ-এ রাসূল, সাহেবজাদা হযরাতুলহাজ্জ সৈয়দ মুহাম্মদ কাসিম শাহ্ (মু.জি.আ.) ও সাহেবজাদা হযরাতুলহাজ্জ সৈয়দ মেহমুদ আহমেদ শাহ্ (মু.জি.আ.)।

সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন

শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ক্যাম্পাসের সার্বিক শিক্ষার পরিবেশকে আরও আধুনিক ও শৃঙ্খলাবদ্ধ করার লক্ষ্যে প্রত্যেক ক্লাসরুমসহ পুরো ক্যাম্পাসজুড়ে মোট ১৭৪টি সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। এই আধুনিক প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা, শিক্ষার্থীদের শৃঙ্খলা, উপস্থিতি ও অ্যাকাডেমিক পরিবেশকে আরও স্বচ্ছ, গঠনমূলক ও প্রাণবন্ত করে তুলবে, ইনশাআল্লাহ।

কৃতি শিক্ষার্থী সংবর্ধনা ও পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠান

বিভিন্ন ইভেন্টে জাতীয়, বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ে পুরস্কারপ্রাপ্ত কৃতি শিক্ষার্থীকে, দাখিল ও আলিম পর্যায়ে এ+ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের এবং ফাযিল, ফাযিল অনার্স, কামিল ও কামিল মাস্টার্স-এ জাতীয় পর্যায়ে কৃতিত্ব অর্জনকারী শিক্ষার্থীদের নিয়মিত সংবর্ধনা দেওয়া হয়। কৃতি শিক্ষার্থীদের জন্য প্রতি বছর সংবর্ধনার পাশাপাশি পুরস্কার বিতরণেরও ব্যবস্থা করা হয়। 

১০ সেপ্টেম্বর ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ, বুধবার আওলাদে রাসূল, পীর-এ বাঙ্গাল হযরাতুলহাজ্জ আল্লামা সৈয়দ মুহাম্মদ সাবির শাহ (মু.জি.আ.), সাহেবজাদা হযরাতুলহাজ্জ সৈয়দ মুহাম্মদ কাসিম শাহ (মু.জি.আ.) ও সাহেবজাদা হযরাতুলহাজ্জ সৈয়দ মেহমুদ আহমেদ শাহ (মু.জি.আ.)-এর সদারতে ফাযিল ২০২৩ ও কামিল ২০২৩ এর কৃতি শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা ও পুরস্কার বিতরণের ব্যবস্থা করা হয়। ১৩ আগস্ট ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ, বুধবার দাখিল কৃতি শিক্ষার্থী সংবর্ধনা-২০২৫-এ (শতভাগ পাস ও ১৪৩ জন জিপিএ ৫) প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন দৈনিক আজাদী পত্রিকার সম্পাদক জনাব এম. এ. মালেক।

ফাযিল-কামিল ফলাফলে জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ

ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাযিল (স্নাতক) পাস পরীক্ষা ২০২৩-এর প্রকাশিত ফলাফলে জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া কামিল মাদরাসা সারাদেশে ফাযিল (স্নাতক) দ্বিতীয় ও তৃতীয় বর্ষে প্রথম স্থান এবং ফাযিল (স্নাতক) প্রথম বর্ষে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছে। অন্যদিকে, দুই বছর মেয়াদি কামিল পরীক্ষা ২০২৩ এর ফলাফলে জামেয়া প্রথম বর্ষে সারাদেশে প্রথম এবং দ্বিতীয় বর্ষে সারাদেশে দ্বিতীয় স্থান অধিকারের গৌরব অর্জন করেছে।

মাদ্রাসা বার্ষিকী

প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ ও নির্দেশনায় সকল শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সমন্বিত প্রয়াসে জামেয়া প্রথমবারের মতো প্রকাশ করেছে একটি বর্ণিল ও সৃজনশীল সাময়িকী ‘জামেয়া বার্ষিকী ২০২৪’। ৪ রঙের ১৭৬ পৃষ্ঠার এই বার্ষিকী ৮,০০০ (আট হাজার) কপি ছাপানো হয়। এই প্রকাশনা শিক্ষার্থীদের জন্য চিন্তা, অনুভূতি ও সৃষ্টিশীলতার মুক্তক্ষেত্র উন্মোচন করেছে। লেখনী, শিল্প ও ভাবনার সমন্বয়ে সাজানো এই সাময়িকী বা বার্ষিকী জামেয়ার শিক্ষা ও সংস্কৃতির ধারাবাহিক যাত্রায় এক ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে স্থান করে নিয়েছে।

অভিভাবক সমাবেশ

শিক্ষক ও অভিভাবকের মধ্যে যোগাযোগের সেতুবন্ধন তৈরি এবং শিক্ষার্থীদের পড়াশুনায় অগ্রগতি, শৃঙ্খলা ও মানসিক বিকাশের লক্ষ্যে জামেয়ায় নিয়মিত অভিভাবক সমাবেশ করা হয়। সমাবেশে সম্মানিত অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ ও সংশ্লিষ্ট শিক্ষকগণ উপস্থিত থাকেন। অনেক সময় মাদ্রাসা গভর্নিং বডির চেয়ারম্যানকেও সমাবেশে আমন্ত্রণ জানানো হয়। সমাবেশে শিক্ষকদের পাশাপাশি সম্মানিত অভিভাবকদেরও গঠনমূলক মতামত প্রকাশের ব্যবস্থা করা হয়।

মতবিনিময় সভা

শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গিকে সমৃদ্ধ করা, জ্ঞানের পরিধি বিস্তার এবং বিশিষ্ট শিক্ষাবিদদের অভিজ্ঞতা ও দিকনির্দেশনার মাধ্যমে শিক্ষার মানোন্নয়নে নিয়মিত মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। ২১ মে ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ তারিখে জামেয়া অডিটোরিয়ামে আলিম পরীক্ষা সুষ্ঠু ও নকলমুক্ত পরিবেশে অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে চট্টগ্রাম অঞ্চলের কেন্দ্রসমূহের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, অধ্যক্ষ এবং চট্টগ্রাম জেলার সুপারগণের সাথে মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড-এর মাননীয় চেয়ারম্যান প্রফেসর মির্জা মোঃ নুরুল হক। 

জামেয়ার সম্মানিত শিক্ষকবৃন্দের সাথে ১৮ অক্টোবর, ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ শনিবার জামেয়া কনফারেন্স হল-এ মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জনাব মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ভূঁঞা, যুগ্ম সচিব, কারিগরি ও মাদ্রাসা বিভাগ, শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

বিভিন্ন বিষয়ে সেমিনার

শিক্ষার্থীদের জ্ঞান, দৃষ্টিভঙ্গির প্রসার, গবেষণামূলক মনোভাব ও বিশ্লেষণ ক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে জামেয়ায় প্রতি বছর বিভিন্ন বিষয়ে সেমিনারের আয়োজন করা হয়। এতে বিশেষজ্ঞদের আলোচনা শিক্ষার্থীদের বাস্তব জ্ঞান ও অনুপ্রেরণা যোগায় এবং প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মান ও গৌরবকে বহুগুণে বৃদ্ধি করে। শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহী ও বিজ্ঞানমনস্ক হয়ে গড়ে তোলার লক্ষ্যে ২৬ আগস্ট ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ, দুপুর ২.৩০টা হতে জামেয়া কনফারেন্স হলে ‘বিজ্ঞান বিষয়ক সেমিনার-২০২৫’ অনুষ্ঠিত হয়।

সেমিনারে প্রধান আলোচক ছিলেন চট্টগ্রাম কলেজের রসায়ন বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান জনাব ড. নূক ম আকবর হোসেন। কামিল ও কামিল (মাস্টার্স) বিভাগের আয়োজনে ২৯ অক্টোবর, ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ বুধবার সকাল ১১টায় জামেয়া অডিটোরিয়ামে “জাতির সঠিক পথ নির্দেশনায় ইলমে দ্বীনের অপরিহার্যতা ও আলেমগণের ভূমিকা” শীর্ষক এক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত সেমিনারে প্রধান আলোচক ছিলেন প্রফেসর ড. কে এম সাইফুল ইসলাম খান, অধ্যাপক, ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

Post a Comment

0 Comments

Post a Comment (0)

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Check Out
Ok, Go it!