জামেয়া নিয়ে পীরে বাঙ্গাল হুজুরের স্বপ্ন ও আমাদের করণীয়
প্রভাষক (আরবী)

আলে রাসূল মুরশিদে বরহক পীরে বাঙ্গাল আল্লামা সৈয়দ মুহাম্মদ সাবির শাহ (মু.জি.আ.)-এর দিকনির্দেশনা ও স্বপ্নে জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া আলিয়া আজ এক অনন্য উচ্চতায়। দাদাজান আলে রাসূল কুতুবুল আওলিয়া শায়খুল মাশায়েখ আল্লামা সৈয়দ আহমদ শাহ সিরিকোটি (র.)-এর ভবিষ্যৎ বাণীগুলো আজ বাস্তবে রূপ নিচ্ছে। এই প্রবন্ধে আমরা জামেয়া নিয়ে হুজুর কেবলার স্বপ্ন, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে আমাদের ও শিক্ষকদের করণীয় সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করব।
দাদাজান আল্লামা সৈয়দ আহমদ শাহ সিরিকোটি র. বলেছিলেন, 'তৈয়ব আউর তাহের কাম সাম্বালেঙ্গে, সাবের শাহ বাঙ্গাল কা পীর বনেগা'।
হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ তা'আলা বলেন:
অর্থ: "আমার কতিপয় বান্দা সর্বদা ফরজ ইবাদতের পাশাপাশি নফল তথা অতিরিক্ত ইবাদতের মাধ্যমে আমার নৈকট্য লাভের চেষ্টা করে। ফলে আমি তাদরেকে ভালোবাসি। তার কান দিয়ে আমার কুদরতী কানের শক্তি, তার চক্ষু দিয়ে আমার কুদরতী চক্ষুর শক্তি, তার হাত দিয়ে আমার কুদরতী হাতের শক্তি এবং তার পা দিয়ে আমার কুদরতী পায়ের শক্তি প্রকাশিত হয়। সে প্রিয় বান্দা আমার নিকট কিছু প্রার্থনা করলে আমি তা দান করি।" (বুখারী শরীফ)
বিখ্যাত সাধক হযরত হাসান বিন মানছুর খাল্লাজ র. বলেন, قلوب العارفين لها عيون - ترما لا يراه الناظرون অর্থ: "আল্লাহ ওয়ালাদের নিকট এমন অন্তরদৃষ্টি আছে তা দিয়ে তাঁরা উহা দেখে যা বাহ্যিক চক্ষুওয়ালারা দেখে না।" বুযুর্গানে দীনগণ বলেন, قلندر ہر چہ گوید دیده گوید আওলিয়ায়ে কেরামগণ লওহে মাহফুজ দেখেই বলেন'।
ভবিষ্যৎ বাণীর বাস্তবায়ন
শাহেনশাহে সিরিকোট দাদা হুজুর কেবলার সেই পবিত্র ভবিষ্যৎ বাণীর শতভাগ বাস্তবায়ন দেখার সময় এখনো হয়নি, যেহেতু পীর সাবির শাহ হুজুর কেবলার সময়কাল সবেমাত্র শুরু হয়েছে। তবে সেই ভবিষ্যৎ বাণীর বাস্তবায়ন যে শতভাগ হতে যাচ্ছে তার অসংখ্য চাক্ষুস প্রমাণ আমাদের সামনেই আছে।
গম্বুজ বিশিষ্ট জামেয়ার তিন তলা মূল ভবনটি প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই। শুরুতে বেড়া বা টিন দিয়ে মাদ্রাসা বানানো হয়েছে, পরে পাকা করা হয়েছে, তা নয়। ১৯৫৪ সালে জামেয়ার ভিত্তি প্রস্তরের সময় আনজুমান কর্মকর্তা দাদা হুজুর কেবলার মুরিদ-ভক্তগণ দাদা হুজুর কেবলাকে বলেছিলেন, আনজুমানের সূচনামাত্র, জমা টাকা বলতে কিছুই নাই। তাছাড়া মাদ্রাসার জন্য কোন ফান্ড প্রস্তুত করা হয়নি। এতো টাকা কোথায় পাওয়া যাবে? দাদা হুজুর কেবলা বলেছিলেন, 'এই জামেয়া মদিনা ওয়ালার নির্দেশে, যা প্রয়োজন মদিনা ওয়ালাই ব্যবস্থা করবেন। কোথা থেকে আসবে আপনারা বুঝতে পারবেন না'। দাদা হুজুর কেবলার সেই ভবিষ্যৎ বাণী প্রতিনিয়ত কিভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে তা সত্যিই আশ্চর্যজনক।
'তৈয়্যব আউর তাহের কাম সাম্বালেঙ্গে' - 'তৈয়ব এবং তাহের কাজ আঞ্জাম দিবেন' বলার সময় ভবিষ্যৎ বাণী হিসেবে শুনা গেলেও আজ তা শতভাগ বাস্তবায়িত। উভয় হযরতের আমলে আনজুমান, জামেয়া ও শরীয়ত-তরিকতের প্রচার-প্রসার ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পেয়ে বাংলাদেশের সীমা অতিক্রম পূর্বক পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আজ দিবাকরের ন্যায় দৃশ্যমান। উপরোক্ত দুই ভবিষ্যৎ বাণীসহ দাদা হুজুর কেবলার আরো অসংখ্য ভবিষ্যৎ বাণী আজ শতভাগ বাস্তবায়িত। অনুরূপ 'সাবের শাহ বাঙ্গাল কা পীর বনেগা' ভবিষ্যৎ বাণীটিও যে শতভাগ বাস্তবায়িত হতে যাচ্ছে, তার অনেক প্রমাণ ইতোমধ্যে প্রকাশ পেয়েছে। উল্লেখ্য যে 'সাবের শাহ বাঙ্গালীদের পীর হবে' কথাটির তাৎপর্য ও পরিধি অনেক বিশাল, যা আমাদের ধ্যান-ধারণার অনেক উর্ধ্বে। দেখার জন্য এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা।
ঈদে মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ২০২৫ এর মাসব্যাপী সফরে প্রায় বক্তব্যে এবং আলোচনায় পীরে বাঙ্গাল হুজুর জামেয়ার অগ্রগতির ভুয়সী প্রশংসা করে জামেয়াকে কীভাবে বাস্তবে এশিয়া বিখ্যাত করা যায় সে ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা প্রদান করেন। এই সফরের বিদায়ী বক্তব্যে বলেন, ইনশাআল্লাহ, অল্প সময়ের মধ্যে জামেয়া এমন এক পর্যায়ে পৌঁছবে, পৃথিবীর অন্য দেশ থেকেও অসংখ্য ছাত্র জামেয়ায় জ্ঞান অর্জনের জন্য আসবে।
জামেয়ার অগ্রগতিতে শিক্ষকদের করণীয়
জামেয়া নিয়ে পীরে বাঙ্গাল হুজুরের এই স্বপ্ন একদিন যে বাস্তবায়িত হবে এবং সেই দিন যে বেশি দূরে নয়, তা নিশ্চতভাবে বলা যায়। পীরে বাঙ্গাল হুজুরের এই স্বপ্ন পবিত্র স্বপ্ন। এর মাধ্যমে বিস্তার লাভ করবে নবীগণের মীরাস ইলমে দ্বীন, যার উপর দাঁড়িয়ে আছে ঈমান-আকিদা, শরীয়ত-তরিকত, দুনিয়া ও আখিরাত। এই পবিত্র ও অধিকতর গুরত্বপূর্ণ স্বপ্ন বাস্তবায়নে সবার চেয়ে বেশি ভূমিকা পালন করতে হবে যাঁদের, তাঁরাই হলেন জামেয়ার সম্মানিত আসাতেযায়ে কেরাম। শিক্ষক হলেন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মূল চালিকা শক্তি। উক্ত স্বপ্ন বাস্তবায়নে জামেয়ার আসাতেযায়ে কেরামের সর্বাগ্রে পালনীয় ও করণীয় বিষয়সমূহ হলো:
১। নিয়তের বিশুদ্ধতা
রাসূলে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা এর বাণী وانما لكل امرء ما نوي 'নিয়তের উপরই কাজের সফলতা'। (বুখারী শরিফ) সুতরাং জামেয়ার এই পবিত্র খেদমতের মধ্যে আমাদের উদ্দেশ্য হতে হবে আল্লাহ-রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ভালোবাসা, হাযরাতে কেরামের সন্তুষ্টি এবং সত্যিকার আলেমে দ্বীন তৈরি করা। নিয়ত যদি বিশুদ্ধ হয় অন্য শিক্ষকের প্রতি যেমন থাকবেনা কোন ধরণের হিংসা-বিদ্ধেষ, তেমনি ওনার মতো দক্ষতা ও সুনামের সহিত পাঠদানে ও দায়িত্ব আদায়ে সৃষ্টি হবে উৎসাহ ও উদ্দীপনা।
২। যোগ্যতার ব্যবহার
صم بكم عمي فهم لا يرجعون বধির, বোবা ও অন্ধ। সুতরাং তারা ফিরে আসার নয়'। (বাকারা-১৮) সত্য না শুনা, সত্য না বলা এবং সত্য না দেখার কারণে যেমন কান থাকতেও বধির, মুখ থাকতেও বোবা এবং চক্ষু থাকতেও অন্ধ, তেমনি যোগ্যতার ব্যবহার না থাকলে যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও অযোগ্য প্রমাণিত হয়। তাই আমাদের শুধু যোগ্যতা থাকলে হবে না, আন্তরিকতাপূর্ণ চেষ্টা-প্রচেষ্টার মাধ্যমে যোগ্যতাকে কাজে লাগাতে হবে।
৩। দায়িত্ববোধ
শুধুমাত্র পাঠদানের মধ্যেই শিক্ষকের দায়িত্ব সীমাবদ্ধ ও শেষ নয়। চরিত্র, আদর্শ, নৈতিকতা ও তাহযিব-তামাদ্দুন ইত্যাদি ছাত্রদের হৃদয়ে জাগিয়ে তোলার সাথে সাথে যাবতীয় ক্ষতিকর ও ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম থেকে তাদেরকে বিরত রাখা অবশ্যই শিক্ষকের দায়িত্বের অর্ন্তভুক্ত। كلكم راع وكلكم مسؤل عن رعيته তোমরা প্রত্যেকেই স্ব স্ব ক্ষেত্রে দায়িত্ববান। স্বীয় দায়িত্ব আদায় সম্পর্কে তোমরা অবশ্যই জিজ্ঞাসিত হবে'। (বুখারী শরীফ)
৪। সন্তানতুল্য ভালোবাসা
শিক্ষক যদি পিতৃতুল্য হয়, ছাত্র তো সন্তানতুল্য হবেই। স্নেহ আগে, সম্মান পরে। নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা ইরশাদ করেন, ليس منا من لم يرحم صغيرنا ولم يوقر كبيرنا যে ছোটদের স্নেহ করে না এবং বড়দের সম্মান করে না, সে আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়। (মিশকাত শরীফ)
৫। চেষ্টা অব্যাহত রাখা
চেষ্টাই সাফল্যের চাবিকাটি। আল্লাহ তা'আলার ঘোষণা, وان ليس للانسان الا ما سعي وان سعيه سوف يري মানুষ তার চেষ্টানুযায়ীই পাবে এবং তার চেষ্টার ফল সে অতিসত্বর দেখতে পাবে। (আন-নাজম-৩৯,৪০)
৬। অবহেলা কোন অবস্থাতেই কাম্য নয়
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের শিক্ষার উদ্দেশ্যে সর্বদা দোয়া করতেন। اللهم اني اعوذ بك من العجز والكسل والجبن والهرم والبخل অর্থ : হে আল্লাহ, নিশ্চয় আমি তোমার নিকট অক্ষমতা, অলসতা, ভীরুতা, স্থবিরতা ও কৃপণতা থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। (মুসলিম শরীফ) একটি সাজানো গোছানো বাগান ধ্বংস করার জন্য 'অবহেলা' নামক একটি হাতিয়ারই যথেষ্ট।
৭। উচ্চাকাঙ্ক্ষা
অল্পতুষ্ট ভালো, তবে সর্বক্ষেত্রে নয়। লোভ-লালসা মন্দ তাও সর্বক্ষেত্রে নয়। শ্রেষ্ঠনবীর শ্রেষ্ঠ গুণ হলো حريص عليكم। কবি বলেন:
অর্থ: তুমি যখন উচ্চ মর্যদা অর্জনে যাত্রা করবে, নক্ষত্রে না পৌঁছা পর্যন্ত থামবেনা। (মুন্তাখাবুল আরবি)
আল্লামা ইকবাল বলেন, ستاروں سے آگے جہاں اور بھی ہے হে মুসলিম, তোমাকে নক্ষত্রের উপরেও যেতে হবে। কবি আবু তৈয়্যব বলেন:
লক্ষ্য বড় হলে বড় পাওয়াও ছোট মনে হবে। (তালিমুল মুতাআল্লিম, পৃ.৬৪)
৮। পরিকল্পনা গ্রহণ
যে কোন নির্মাণে সফলতা অর্জনের জন্য প্ল্যান তথা পরিকল্পনা গ্রহণ পূর্ব শর্ত। বিভাগভিত্তিক সংশ্লিষ্ট শিক্ষকগণ সম্মিলিতভাবে সুপরিকল্পনা গ্রহণপূর্বক পাঠদানসহ যাবতীয় কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করলে পীরে বাঙ্গাল হুজুরের স্বপ্ন বাস্তবায়নে দ্রুত এগিয়ে যাওয়া খুব সহজ হবে।
৯। প্রতিযোগিতার মনোভাব
ভালো কাজে প্রতিযোগিতা করা আল্লাহ তা'আলার নির্দেশ فاستبقوا الخيرات কল্যাণকর কাজে প্রতিযোগিতা কর। (মায়েদা-৪৮)। মাদ্রাসার শিক্ষকমন্ডলী থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে পড়ালেখা, তাহযিব-তামাদ্দুন ও পরীক্ষার ফলাফল সবদিক দিয়ে সমগ্র দেশে জামেয়া যেন শ্রেষ্ঠ আসনে আসীন হতে পারে সেই মনোভাব অন্তরে লালন করা।
১০। কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ
দাদা হুজুর কেবলার অছিলায় জামেয়া এক অভাবহীন ভান্ডারের নাম। জামেয়া অনন্য। কোন প্রতিষ্ঠানের সাথে জামেয়ার তুলনা চলেনা। শ্রেণিকক্ষে ছাত্র সংখ্যা অন্য প্রতিষ্ঠানের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি বিধায় যাবতীয় কার্যক্রম অনেক বেশি পরিমাণে আদায় করতে হয় সম্মানিত শিক্ষকমন্ডলীকে। ছাত্র-শিক্ষক ও পড়ালেখার নামই মাদ্রাসা। তাই ছাত্র, শিক্ষক ও পড়ালেখার বিষয়টিকে সর্বাগ্রে গুরত্ব দিয়ে দিকনির্দেশনা পূর্বক পরামর্শ প্রদান, শিক্ষকমন্ডলীর যৌক্তিক চাহিদা পূরণ এবং পরিবেশ ও কাঠামোগত যাবতীয় সমস্যার আশু সমাধানের সুদৃষ্টি আন্তরিকভাবে কামনা করছি।
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
যদি নেয়ামতের মূল্যায়ন কর তাহলে নেয়ামত বাড়িয়ে দিব। (ইব্রাহিম-০৭)
অন্যথায় কঠিনতর শাস্তি ও নেয়ামত ছিনিয়ে নেয়ার প্রভু কর্তৃক ঘোষণা:
অবহেলা ও দায়িত্ব ফাঁকি দেয়ার মাধ্যমে নেয়ামতের মূল্যায়ন না করলে:
দায়িত্ব আদায়ে অবহেলা কর তাহলে আল্লাহ তা'আলা অন্যদেরকে তোমাদের স্থলাভিষিক্ত করবেন। (মুহাম্মদ-৩৮)