ইমামে আযম ও ইমাম বুখারী (র.): তাত্ত্বিক পর্যালোচনা ও জীবনী

Faruk Sir
0

ইমাম আ'যম ও ইমাম বুখারী র.: একটি তাত্ত্বিক পর্যালোচনা

হাফেয মাওলানা মুহাম্মদ ওসমান গণি
প্রভাষক (আরবী)
ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম বুখারী (র.)-এর জীবনী, হাদিস ও ফিকহ শাস্ত্রে তাঁদের অবদান, মতপার্থক্য এবং একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ নিয়ে বিস্তারিত তাত্ত্বিক আলোচনা।

আজকে আমরা পৃথিবী খ্যাত দু'জন ইমাম নিয়ে আলোচনা করার প্রয়াস পাচ্ছি। এ দু'জন সমগ্র ইসলামী বিশ্বে সর্বজন পরিচিত, বিখ্যাত ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিত্ব। ইসলামী জগতে এদের অবদান সর্বজন স্বীকৃত। এরা এক একজন এক এক বিষয়ে কিংবা বহু বিষয়ে এমন কৃতিত্বের অধিকারী ছিলেন যে, দুনিয়াবাসী তাদেরকে ইমাম উপাধিতে ভূষিত করেন। এই প্রবন্ধে আমরা ইমামে আযম আবু হানিফা (র.) এবং ইমাম বুখারী (র.)-এর জীবনী, কর্ম, এবং তাঁদের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।

এতক্ষণ পর্যন্ত যাদের কথা বলছি তাঁরা হলেন-

  • এক. ইমামুল আইম্মা, সিরাজুল উম্মাহ, রঈসুল ফোকাহা ওয়াল মুজতাহিদীন, সায়্যিদুল আউলিয়া ও মুহাদ্দিসীন, হাকিমুল হাদীস ইমামুশ শরীয়ত ইমাম আ'যম আবু হানিফা নুমান ইবনে সাবিত র.।
  • দুই, ইমামুল মুহাদ্দিসীন, আমীরুল মু'মিনীন ফিল হাদীস, হাফিজুল হাদীস, রঈসুল মুহাদ্দিসীন ইমাম আবু আব্দিল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে ইসমাঈল বুখারী র.।

এ দু'জন হলেন মানব জাতির হেদায়েতের আলোকবর্তিকা ও পথ প্রদর্শক, ইসলামের সঠিক রূপরেখা প্রণয়ন কারীদের অন্যতম ব্যক্তিত্ব। প্রথম জনের উপমা যদি সূর্য্যের সাথে দেয়া হয় তাহলে দ্বিতীয়জনের তুলনা হবে চন্দ্রের সাথে। উভয়জন হলেন মুসলিম মিল্লাতের ইমাম, তাই তাঁদের নামের সাথে 'ইমাম' শব্দটি অবিচ্ছেদ্য অংশরূপে ব্যবহৃত হয়।

ইমাম আবু হানিফা (র.)-এর জীবনী ও মর্যাদা

ইমাম আবু হানিফা র. এর জন্ম ৮০ হিজরি এবং ওফাত ১৫০ হিজরি সনে। তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা কর্তৃক সুসংবাদ প্রাপ্ত خير القرون তথা উত্তম যুগে উদিত সূর্য। তিনি একজন তাবেঈ ছিলেন, যাঁদের সম্পর্কে আল্লাহ বলেন:

والذين اتبعوهم بإحسان رضى الله عنهم ورضوا عنه واعد لهم جنات تجرى تحتها الانهار خالدين فيها ابدا ذالك الفوز العظيم

অনুবাদ: "যাঁরা আনসার-মুহাজির সাহাবীদের অনুসরণ করেছে আল্লাহ তাঁদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তাঁরাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন। আর তাঁদের জন্য প্রস্তুত রেখেছেন কাননকুঞ্জ, যার তলদেশ দিয়ে প্রসবনসমূহ প্রবাহিত রয়েছে। সেখানে তারা থাকবে চিরকাল।" (সূরা তাওবা- ১০০)

সাহাবীদের সাথে সাক্ষাৎ

ইমাম অবু হানিফা র. বহু সাহাবীর সাক্ষাত লাভে ধন্য হয়ে ছিলেন। 'রদ্দুল মোহতার' গ্রন্থে বর্ণিত আছে:

ادرك (ابو حنيفة) بالسن نحو عشرين صحابيا

অর্থাৎ, ইমাম আবু হানিফা র. বিশজন সাহাবীকে পেয়েছিলেন। উক্ত গ্রন্থে এই বিশজনের নামও উল্লেখ করা হয়েছে। এভাবে আল্লামা মুহাম্মদ হাসান সাম্বলী র. (১৩০০ হি.) ইমাম আ'যম র. এর সময়কালে জীবিত ছিলেন এমন ২২জন সাহাবীর নামসহ উল্লেখ করেছেন। (তানসিকুন নিযাম, পৃ. ৯)

'খোলাসায়ে ইকমাল' গ্রন্থে ২২-২৭ জন এবং তন্মধ্যে ২৬ জনের সাথে তাঁর সাক্ষাতের কথা উল্লেখ রয়েছে। তিনি নিজেই বলেছেন:

رایت انس بن مالك الكوفة قائماً يصلى

অনুবাদ: "আনাস ইবনে মালিক রা. কে কুফায় দাঁড়িয়ে নামাজ পড়তে দেখেছি।" (আবু নুয়াইম ইস্পাহানীর (৪৩০ হি.) মুসনাদে ইমাম আবু হানিফা, পৃ. ১৬৭)

শিষ্যরা তাঁর যেসব হাদীস সংগ্রহ করেছেন তন্মধ্যে পঞ্চাশটি হাদীস ইমাম আ'যম র. সাহাবী থেকে সরাসরি বর্ণনা করেছেন। (ইমাম কুরদরী (৮২৭ হি ) মানাকিবুল ইমাম আ'যম আবি হানিকা, খন্ড.১, পৃ. ২০-২১) ও মোল্লা আলী ক্বারী র. (১৩০৬হি) শাহরে মুসনাদে ইমাম আযম, পৃ. ২৫৮)।

আল্লামা শামশুদ্দিন মুহাম্মদ আবু নসর 'জাওয়াহিরুল আকাইদ ওয়া দুরারুল কাওয়ায়েদ' গ্রন্থে বলেন- ইমাম আবু হানিফা র. ৮ জন সাহাবী থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন। তাঁরা হলেন আনাস রা., জাবির রা., ইবনে আবি আওফা রা., আমের রা., ইবনে উনাইস রা., ওয়াসিলা রা., ইবনে জুয রা. ও আয়েশা বিনতে আজরাদ রা.। (আল্লামা শামী (১৩০৬ হি.) রদ্দুল মুহতার, খন্ড ১, পৃ. ১৫৭)।

ইলমের ধারা

صار العلم من الله تبارك وتعالي الي محمد صلي الله عليه وسلم ثم صار الي التابعين ثم صار الي ابي حنيفة واصحابه شاء فليرض و من شاء فليسخط.

অনুবাদ: "ইলম আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তাআলার নিকট হতে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পেয়েছেন। তাঁর থেকে তাঁর সাহাবীগণ, তাঁদের থেকে তাবেঈন, তাঁদের থেকে ইমাম আবু হানিফা র. ও তাঁর শাগরিদগণ পেয়েছেন। অতএব, এতে কেউ সন্তুষ্ট হোক বা অসন্তুষ্ট হোক সত্যি হলো এটাই।" (খতিবে বাগদাদী (৪৩৬হি.) তারিখে বাগদাদ, খন্ড ১৩, পৃ. ৩৩৬)।

ইমাম বুখারী (র.) ও তাঁর অবদান

ইমাম বুখারী র. এর জন্ম ১৯৪ হিজরী ১৩ শাওয়াল আর ওফাত ২৫৬ হিজরী। তিনি একজন সর্বসম্মতিক্রমে বিশ্ব বিখ্যাত মুহাদ্দিস। 'সহীহ বুখারী শরীফ' তাঁর সর্বাপেক্ষা বড় কৃতিত্ব। ছয় লক্ষ সংরক্ষিত এবং তিন লক্ষ মুখস্থ- যার মধ্যে এক লক্ষ বিশুদ্ধ হাদীস থেকে যাচাই-বাছাই করে তাকরার সহ ৭২৭৫টি হাদীস সহীহ বুখারীতে লিপিবদ্ধ করেছেন। প্রত্যেক মাযহাব বা লা-মাযহাব সকলেই সহীহ বুখারীকে বিশুদ্ধ হাদীসগ্রন্থ হিসেবে দলীল প্রমাণের ক্ষেত্রে পবিত্র কুরআনের পরে স্থান দিয়েছেন।

ইমাম আ'যম র. এর ১১৪ বছর পর ইমাম বুখারী র. এর জন্ম এবং ১০৬ বছর পর ইন্তেকাল। ইমাম বুখারী র. এর উচ্চপর্যায়ের উস্তাদগণ ছিলেন তাবে তাবেঈ, যাদের অনেকেই ইমাম আ'যম র. এর সরাসরি ছাত্র বা নাতি ছাত্র। সহীহ বুখারীতে সনদের দিক দিয়ে সর্বোচ্চ পর্যায়ের 'সুলাসী' তথা তিনজন রাবীর মাধ্যমে বর্ণিত হাদীস সংখ্যা ২২টি। 

তন্মধ্যে ২০টি হাদীস ইমাম আ'যম র. এর শিষ্য কিংবা শিষ্যের শিষ্য থেকে বর্ণিত। আবার ইমাম আ'যম র. এর হাদীস গ্রন্থ 'মুসনাদে ইমাম আ'যম' এর অধিকাংশ হাদীস দু'জন বা একজন রাবীর মাধ্যমে বর্ণিত। (ইমাম সাখাবী র. (৯০২ হি.), ফতহুল মুন্সী, পৃ. ২৪১)।

দুই ইমামের তুলনা ও বৈশিষ্ট্য

সহীহ বুখারীর কারণে ইমাম বুখারী র. সমগ্র বিশ্বে সমাদৃত এবং আমীরুল মু'মিনীন ফিল হাদীস হিসেবে খ্যাত। পক্ষান্তরে ইমাম আ'যম র. ফিকহ শাস্ত্রের জনক ও সর্বাধিক অনুসরণীয় মাযহাবের ইমামগণের মধ্যে সর্বাপেক্ষা বড় ইমাম তথা ইমাম আ'যম উপাধিতে ভূষিত। ইমাম বুখারী র. যদিও ফকীহ ও মুজতাহিদ তবুও তিনি মুহাদ্দিস হিসেবে প্রসিদ্ধ। 

তাছাড়া মুহাদ্দিস হওয়ার জন্য ফকীহ হওয়া আবশ্যক নয় কিন্তু ফকীহ হওয়ার জন্য মুহাদ্দিস হওয়া অত্যাবশ্যক। সুতরাং ইমাম আ'যম র. ফকীহ হিসেবে প্রসিদ্ধ হলেও তিনি একজন বিজ্ঞ মুহাদ্দিস। ফকীহ কুরআন-হাদীস থেকে ফিকহী মাসয়ালা আবিস্কার করেন। ইমাম আ'যম র. কর্তৃক উদ্ভাবিত মাসয়ালার সংখ্যা ৮৩০০০। এর দ্বারা হাদীসে তাঁর অসীম ও গভীর জ্ঞানের প্রমাণ পাওয়া যায়।

শাহ ওয়ালি উল্লাহ র. এর মতে ইমাম বুখারী র. মুজতাহিদ মুনতাসিব ছিলেন যা মুজতাহিদে মুতলাকের এক স্তর নিচে। অথচ ইমাম আ'যম র. ছিলেন মুজতাহিদে মুতলাক। কেউ কেউ ইমাম বুখারী র. কে মুজতাহিদ ফিল মাসায়েল বলেছেন যা আরো নিম্ন স্তরের। (আল ইনসাফ, ৬৭ সূত্র আল কামালুল মুফীদ, পৃ. ১২৭-১২৮)।

ইমাম আবু হানিফা র. ছিলেন হাদীস শাস্ত্রে হাকেম। যে মুহাদ্দিস রাসূল এর সব হাদীস জানেন তাকে হাকেম বলা হয়।

ان الامام ذكر في تصانيفه بضع وسبعون حديثا وانتخب الآثار من اربعين الف حديث

অনুবাদ: "আবু হানিফা র. স্বীয় গ্রন্থসমূহে সত্তর হাজারের অধিক হাদীস বর্ণনা করেছেন আর চল্লিশ হাজার হাদীস থেকে নির্বাচিত করে তিনি কিতাবুল আসার রচনা করেছের।" (মানাকিবে বিযাইলিল জাওয়াহের, খ. ১, পৃ. ৯৫)।

হাদীস সংখ্যার তারতম্য

হাফিয ইবনুস সালাহ ও ইমাম নববী র. এর মতে তাকরার হাদীস বাদ দিয়ে সহীহ বুখারীতে হাদীস সংখ্যা চারহাজার। আবার ইবনে হাজর আসকালানী র. এর মতে তাকরার হাদীস বাদ দিয়ে হাদিসে মারফু'র সংখ্যা হয় ২৬২৩টি। (আল্লামা তাহির ইবনে সালাহ আল জাযায়েরী, তাওজীহুন নযর, পৃ. ৯৪)।

ইমাম হাসান ইবনে যিয়াদ র. এর মতে ইমাম আ'যম আবু হানিফা র. যে সব হাদীস তাকরার ছাড়া বর্ণনা করেছেন- এর সংখ্যা চার হাজার। (ইমাম মুরাফিক (৫৬৮হি.) মানাকিবুল ইমাম আবু হানিফা, খ. ১, পৃ. ৯৫)।

রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর তাকরার ছাড়া মূল হাদীসের সংখ্যা চারহাজার চারশতটি। আল্লামা আমীর ইয়ামানী বলেন:

ان جملة الحديث المسندة عن النبي صلي الله عليه وسلم يعني الصحيحة بلا تكرار اربعة الاف واربع مائة

(তাওজিহুল আফকার, পৃ. ৬৩)

ইমাম আ'যম র. বাকী চারশত হাদীস বর্ণনা না করার কারণ হলো হয়ত ওগুলো আহকাম সম্পর্কীয় ছিল না। তিনি কেবল আহকাম সম্পর্কীয় হাদীস বর্ণনা করতেন। সুতরাং বর্ণনা না করা মানে না জানা নয়। যেমন ইমাম বুখারী র. ছয় লক্ষ হাদীস থেকে তাকরার ছাড়া মাত্র চার হাজার মতান্তরে ২৬২৩টি হাদীস সহীহ বুখারীতে বর্ণনা করেছেন। তাই বলে বাকী হাদীস তিনি জানতেন না তা নয়।

ইমাম আ'যম ও ইমাম বুখারী র. এর মধ্যে হাদীস সংরক্ষণ বা বর্ণনার মধ্যে বিরাট তফাৎ হওয়ার কারণ হলো হাদীসের সংখ্যা মূলত হাদিসের তুরুক ও সনদের দ্বারা নির্ধারিত হয়। একটি হাদীসের মতন একশত জনের মাধ্যমে বর্ণিত হলে উক্ত হাদীস কে একশত হাদীস হিসেবে গণ্য করা হয়। ইমাম আ'যম র. এর যুগে হাদীস বর্ণনাকারীর সংখ্যা কম ছিল আর ইমাম বুখারী র. এর যুগে এসে একই হাদিসের বর্ণনাকারীর সংখ্যা অনেক বেড়ে গেল। এভাবে তাদের দু'জনের মধ্যে বর্ণিত হাদীসের সংখ্যার তারতম্য পরিলক্ষিত হয়। মূলত এতে সনদের সংখ্যার তারতম্য হয়েছে মূল হাদীসের নয়। (আল্লামা গোলাম রসুল সাঈদী, তাযকারাতুল মুহাদ্দিসীন, পৃ. ৮১)।

ইমাম বুখারী (র.) কেন ইমাম আবু হানিফা (র.) থেকে হাদীস নেননি?

ইমাম আবু হানিফা র. এর বহু প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ শিষ্য থেকে ইমাম বুখারী র. হাদীস বর্ণনা করেছেন অথচ তিনি ইমাম আবু হানিফা র. থেকে তাঁর সহীহ বুখারীতে একটি হাদীসও বর্ণনা করেননি। এর কারণ হলো সাধারণত মুহাদ্দিসীনে কিরাম ওইসব হাদীস বেশি বর্ণনা করে থাকেন যেগুলো হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। 

যেহেতু ইমাম আ'যম র. এর অনুসারীর সংখ্যা বেশি সেহেতু তাঁর বর্ণিত হাদীস এরূপ হবার নয়। ইমাম বুখারী র. ইমাম শাফেঈ র. এর অনুসারী হওয়া সত্ত্বেও সহীহ বুখারীতে তাঁর বর্ণিত একটি হাদীসও স্থান পায়নি। অনুরূপভাবে ইমাম বুখারী র. ইমাম মুসলিম র. এর সরাসরি উস্তাদ হওয়া সত্ত্বেও মুসলিম শরীফে ইমাম বুখারী র. থেকে কোন হাদীস বর্ণনা করেননি।

তবে এ কথা সত্য যে, ইমাম আবু হানিফা র. এর সাথে ইমাম বুখারী র. এর কিছু ফিকহী বিষয়ে মতবিরোধ ছিল যা সহীহ বুখারীতে بعض الناس বলার দ্বারা প্রতীয়মান হয়। بعض الناس সম্পর্কে মতবিরোধ বিষয় নিয়ে বহু গ্রন্থ রচিত হয়েছে যাতে ওইসব বিষয়ে সমাধান ও ভুল বুঝাবুঝির নিরসন করা হয়েছে। এ দু'জনের মধ্যে কিছুটা মতপার্থক্য রয়েছে বলে মুহাদ্দিসীনে কিরাম উল্লেখ করেছেন এবং এর কতিপয় কারণও বর্ণনা করেছেন।

১. ঈমানের সংজ্ঞা নিয়ে মতপার্থক্য

তন্মধ্যে প্রধান হলো ঈমানের সংজ্ঞা নিয়ে। ইমাম বুখারী র. এর মত الایمان قول و عمل و هو مرکب و يزيد وينقص অর্থাৎ কথা ও কাজের সমষ্টির নাম ঈমান। এটি যৌগিক-বাড়ে ও কমে। কিন্তু ইমাম আবু হানিফা র. এর মত হলো:

ان الايمان بسيط لا يزيد ولا ينقص و يعد العمل من كمال الايمان

অর্থাৎ ঈমান হলো বাসীত যা হ্রাস-বৃদ্ধি হয় না তবে আমল দ্বারা ঈমানের পূর্ণতা সাধিত হয়। এ কারণে ইমাম বুখারী র. ইমাম আ'যম র. থেকে হাদীস বর্ণনা করেননি। এ ব্যাপারে ইমাম ইবনে হাজর আসকালানী র. ইমাম বুখারী র.এর কথা নকল করে তিনি বলেছেন لم اكتب الا عمن قال الایمان قول و عمل আমি বুখারীতে কেবল তাদের হাদীস স্থান দিয়েছি যারা বলেন ঈমান কথা ও কাজের সমষ্টি। (হাদিউস সারী, পৃ. ৫০৩)।

২. নাঈম ইবনে হাম্মাদের প্রভাব

দ্বিতীয়ত ইমাম বুখারী র. এর একজন উস্তাদ ছিলেন- নাঈম ইবনে হাম্মাদ। তিনি ইমাম আবু হানিফা র. এর প্রতি প্রচন্ড বিদ্ধেষ পোষণ করতেন। তার সুহবত ও প্রভাবে ইমাম বুখারী র. ইমাম আ'যম র. এর প্রতি বিরোপ ধারণা পোষন করতেন। এই নাঈম ইবনে হাম্মাদ জাল হাদীস তৈরী করতেন। মাকতাবাতে আল ফাতাহ প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত বুখারী শরীফের মুকাদ্দমায় বলা হয়েছে:

مذهب الامام البخاري كان البدء علي مذهب أبي حنيفة ولكنه انتقل الشافعي لدي وروده مكة - و هو كما يقال تلقاه من شيوخه فمن شيوخه نعيم ابن حماد المروزي ونعيم هذا كان من شيوخ البخاري بلا واسطة و هو وضاع الحديث

অনুবাদ: "ইমাম বুখারী র. প্রথম দিকে ইমাম আবু হানিফা র. এর মাযহাবের অনুসারী ছিলেন। কিন্তু তিনি মক্কায় অবস্থানকালে তাঁর শায়খ নাঈম ইবনে হাম্মাদের সাহচর্যে এসে শাফেঈ মাযহাবের অনুসারী হয়ে গেলেন। এই নাঈম ইবনে হাম্মাদ ইমাম বুখারী র. এর সরাসরি উস্তাদ। আর তিনি জাল হাদীস বানাতেন।"

আল্লামা ইযদী বলেন- و قال الأزدي كان نعيم ممن يضع الحديث في تقوية السنة وحكايات مزورة في ثلب النعمان ابي حنيفة كلها كذب নাঈম ইবনে হাম্মাদ ছিলেন মাওযূ হাদীস প্রণেতাদের একজন। তিনি ইমাম আবু হানিফা র. সম্পর্কে যত ঘটনা রটিয়েছেন সবগুলো মিথ্যা। (মিযানুল ই'তিদাল, পৃ. ২৬৯)।

و قد كان نعيم شديد التعصب علي ابي حنيفة فتاثر البخاري به

আর নাঈম ছিলেন আবু হানিফা র. এর প্রতি কট্টোর বিদ্ধেষী। ফলে ইমাম বুখারী র. তার দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। ইমাম আব্দুল গণির কাশফুল ইলতিবাস এর মোকাদ্দামায় ৮-৯ পৃষ্ঠায় আব্দুল ফাত্তাহ আবি গাদ্দাহ (১৪১৭ হি.) বলেন- مع العلم ان البخاري رحمه الله تعالي كان في نشأته متفقها بالمذهب الحنفي المذهب السائد بخاري وما حولها

ইমাম বুখারী র. হানাফী মাযহাবে বেড়ে উঠেছেন। কেননা এই মাযহাব বুখারা ও তার চতুর্পাশে বিস্তার লাভ করেছিল। তিনি বলেন:

فالامام البخاري تفقه بفقه ابي حنيفة فقه اهل بلده قرأ كتب ابن مبارك ووكيع هما حنفيان من - ابي حنيفة واهل مذهبه اصحاب

অনুবাদ: "ইমাম বুখারী র. ইমাম আবু হানিফা র. উদ্ভাবিত ফিকহের জ্ঞান অর্জন করেছিলেন যা তার শহরবাসীদের ফিক্ ছিল। আর তিনি আব্দুল্লাহ ইবনে মোবারক ও ওয়াকী ইবনুল জারাহ র. এর কিতাবসমূহ অধ্যায়ন করেছিলেন। আর এ দু'জন ইমাম আবু হানিফা র. এর শিষ্য হিসেবে হানাফী ছিলেন।" (প্রাগুক্ত, পৃ. ৯)।

علي ان للبخاري ميلا وتعصبا علي ابي حنيفة فشدّة تعصب البخاري وفرطه تحامل الانحراف عن أبي حنيفة

অনুবাদ: "ইমাম বুখারী র. ইমাম আবু হানিফা র. এর প্রতি বিরোপ মনোভাব পোষণ করতেন। ইমাম বুখারীর কঠোর বিরোপ মনোভাব ইমাম আবু হানিফা র. থেকে বিমুখ থাকার কারণ।" (ইমাম যাঈলী র. নাসবুর রিয়ায়‍্যা, খ.১, পৃ. ৩৫৫)।

ভুল বুঝাবুঝির অবসান

এরূপ বহু ঘটনা আছে যে, অপপ্রচারকারীদের কারণে অথবা অজ্ঞতাবশত অনেক বড় মাপের মুহাদ্দিস প্রথমে আবু হানিফা র. কে ভুল বুঝেছিলেন। কিন্তু পরে সঠিক তথ্য জেনে সঠিক সিদ্ধান্তে ফিরে এসেছিলেন। ইমাম আব্দুল ওহাব শারানী র. الميزان الكبري গ্রন্থে বলেন- প্রথমে ইমাম সুফিয়ান সওরী র. ইমাম আবু হানিফা র. এর প্রতি বিরোপ ধারণা পোষণ করতেন তাঁর প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারীদের কথায়।

 কিন্তু একদিন সুফিয়ান সওরী মুকাতিল ইবনে হাইয়‍্যান, হাম্মাদ ইবনে সালামাহ এবং ইমাম জাফর সাদিক র. ইমাম আবু হানিফা র. এর নিকট গিয়ে বিতর্কীত বিষয়ে সকাল থেকে যোহর পর্যন্ত আলোচনা করেছিলেন। তাঁরা তাঁর বক্তব্য শুনে সকলে তাঁর হস্তচুম্বন করে বললেন:

انت سيد العلماء فاعف عنا فيما مضي منا وقيعتنا فيك بغير علم

অনুবাদ: "আপনি উলামাকুল শিরোমণি। অজ্ঞাতবশত আমাদের থেকে আপনার বিপক্ষে যা কিছু প্রকাশিত হয়েছে তা ক্ষমা করে দিন।"

প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ইমাম আওযাঈ র.ও প্রথমে আবু হানিফা র. কে ভুল বুঝতেন। কিন্তু আমিরুল মুমিনীন ফিল হাদীস ইমাম আব্দুল্লাহ ইবনে মোবারক র. এর প্রচেষ্টায় উভয়ের মধ্যে আলোচনা হয়। আলোচনা শেষে ইবনে মোবারক ইমাম আওযাঈ র. সম্পর্কে বলেন:

غبت الرجل لكثرة علمه وفور عقله أستغفر الله لقد كنت في غلط ظاهر الزمه فانه بخلاف ما بلغني عنه

অনুবাদ: "আমি তাঁর জ্ঞানের আধিক্যতা ও পরিপূণ্য বুদ্ধিমত্তার প্রতি ঈর্ষা পোষণ করি। আমি তাঁর সম্পর্কে যে ভুলে ছিলাম তার জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি। কেননা তাঁর সম্পর্কে আমাকে যা জানানো হয়েছে তিনি তার সম্পূর্ণ বিপরীত।"

উপসংহার

আমরা এ দু'জনের মতবিরোধকে সাহাবায়ে কিরামগণের মধ্যে মতবিরোধের ন্যায় মনে করি এবং اختلاف العلماء رحمة হিসেবে বিবেচনা করি। আর হাদীসে বর্ণিত انزلوا الناس علي منازلهم "তোমরা মানুষকে তাদের মর্যাদা অনুপাতে স্থান দাও” মতে উভয়ের মান-মর্যাদা সমুন্নত রাখি। উভয়জনকে আপন বিষয়ের ইমাম হিসেবে গ্রহণ করি। একজনকে সম্মান করতে গিয়ে অন্য জনের মানহানি করা সমর্থন করি না। 

তবে যারা ইমাম বুখারী র. কে ইমাম আবু হানিফা র. এর উপর প্রাধান্য দিয়ে তাঁকে অসম্মান, অবজ্ঞা 'ও তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে থাকেন কেবল তাদের সংশোধনের উদ্দেশ্যে এ আলোচনার অবতারণা করেছি এবং প্রসিদ্ধ কয়েকজন গ্রহণযোগ্য মুহাদ্দিসের মতামত পেশ করেছি।

"হে আল্লাহ! হক্কানী রাব্বানী ইমামগণের বিরোদ্ধে বিদ্ধেষ বা অজ্ঞতাবশত কটুক্তি করা থেকে আমাদের যাবানকে হেফাজত করুন আর বিদ্ধেষ পোষণকারীদের হেদায়ত দান করুন। আমীন।"

Post a Comment

0 Comments

Post a Comment (0)

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Check Out
Ok, Go it!