তালেবে ইলমদের প্রতি মূল্যবান নসিহত: ইলম অর্জনের সঠিক পথ ও পাথেয়

Faruk Sir
0

তালেবে ইলমদের প্রতি মূল্যবান নসিহত

মুফতি আবুল হাসান মুহাম্মদ ওমাইর রজভী
ফকিহ
তালেবে ইলমদের জন্য ১০টি মূল্যবান নসিহত, ইলম অর্জনের আদব, সময়ের গুরুত্ব, নিয়তের বিশুদ্ধতা এবং ছাত্রজীবনে সফলতার উপায় সম্পর্কে বিস্তারিত দিকনির্দেশনা।

ইলম অর্জন করা মহান আল্লাহর এক বিশেষ নেয়ামত। তবে শুধু ইলম অর্জনই যথেষ্ট নয়, বরং সেই ইলম যাতে উপকারী বা 'নাফে' হয়, সেদিকে লক্ষ্য রাখা জরুরি। প্রত্যেক তালেবে ইলমের উচিত এমন কিছু বিষয় মেনে চলা যা তাদের জ্ঞান অর্জনের পথকে সুগম করবে এবং তাদের অর্জিত জ্ঞানকে আল্লাহর সন্তুষ্টির মাধ্যম হিসেবে কবুল করাবে। এই প্রবন্ধে আমরা তালেবে ইলমদের জন্য ১০টি অত্যন্ত মূল্যবান নসিহত নিয়ে আলোচনা করব, যা তাদের ছাত্রজীবন ও পরবর্তী জীবনে সফলতার চাবিকাঠি হিসেবে কাজ করবে।

প্রত্যেক তালেবে ইলমের উচিত ঐ সমস্ত বিষয়ে সজাগ থাকা, যেগুলোর মাধ্যমে কলবে ইলম আসবে এবং ইলমগুলো উপকারি হবে। মনে রাখতে হবে- ইলম অর্জন করাটাই মুখ্য নয়, বরং অর্জিত ইলম 'নাফে' তথা উপকারি হওয়াটাই মুখ্য। প্রিয়নবি (স.) এই ইলমের কথা-ই উল্লেখ করেছেন; যা ইন্তেকালের পরেও উপকারি হয়, যার মাধ্যমে বান্দাগণ উপকৃত হয় এবং সঠিক পথের সন্ধান পায়। এই ইলমে 'নাফে' (উপকারি) অর্জন করতে হলে কিছু বিষয়ে যথেষ্ট খেয়াল রাখা জরুরি। তা হলো-

১. নিয়ত বিশুদ্ধ করা

ইলম অর্জনের নিয়ত হতে হবে আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (স.)-এর সন্তুষ্টি অর্জন করা। এইজন্য সহিহ বুখারি শরীফের শুরুতে ইমাম বুখারি রহ. নিয়তের হাদীসটি নোট করে আমাদের এটাই শিক্ষা দিয়েছেন যে, প্রতিটি কাজের প্রারম্ভে আমাদের উচিত সহিহভাবে নিয়ত করা।

২. কলব পরিষ্কার রাখা

ইলম অর্জনের জন্য কলবকে পরিষ্কার রাখতে হবে। কেননা, ইলম হলো নুর। যে কলব পাপের মাধ্যমে অন্ধকার হয়ে যায়, সে কলবে ইলম স্থায়ী হয়না। ইমাম শাফেয়ি রহ. বলেন:

العلم نُورٌ من إلهي، ونور الله لا يهدى لعاص

অর্থ: জ্ঞান আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে নুর, আর এই নুর পাপীদেরকে দান করা হয় না।

৩. আদব রক্ষা করা

তালেবে ইলমের জন্য আদব রক্ষা করা অত্যাবশ্যক। যে আদব থাকবে কিতাবের প্রতি, সেসমস্ত বিষয়াবলির প্রতি; যা ইলম অর্জনের ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা রাখে (যেমন- খাতা, কলম ইত্যাদি)। প্রতিষ্ঠানের প্রতি, প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতিও আদব রাখতে হবে নিঃশর্তভাবে। বিশেষভাবে সর্বোচ্চ আদব রাখতে হবে শিক্ষকবৃন্দের প্রতি। নবি করিম (স.) ইরশাদ করেন:

أن الله ادبني فأحسن أدبي

অর্থ: নিশ্চয়ই আল্লাহ তা'আলা আমাকে আদব শিক্ষা দিয়েছেন এবং আমার শিষ্টাচারকে অতি সুন্দর করেছেন। (ইতকান মা ইউহসান)

নবিজি আরো ইরশাদ করেন:

ما نحل والد ولدًا من نحلٍ أفضل من أدب حسن

অর্থ: কোন বাবা তাঁর সন্তানকে উত্তম শিষ্টাচারের চেয়ে উত্তম কোন উপহার প্রদান করতে পারেন না। (তিরমিযি শরীফ-১৯৩৫, আহমদ-১৫৪০৩)

সাহাবায়ে কিরাম নবিজি (স.) এর প্রতি সর্বোচ্চ আদব রক্ষা করতেন। যেমন- হযরত উসামা বিন শারিক রহ. বলেন:

أتيت النبي وأصحابه كان على رؤوسهم الطير

অর্থ: আমি নবিজি (স.) এর কাছে আসলাম। তখন তাঁর সাহাবিবৃন্দ নীরবতার সাথে এমনভাবে বসেছিলেন, যেন তাঁদের মাথার উপর পাখি বসে আছে। (আবু দাউদ)

অন্য রেওয়ায়েতে এসেছে:

إذا تكلم أطرق جلساؤه، كان على رؤوسهم الطير

অর্থ: নবিজি যখন কথা বলতেন, সাহাবায়ে কিরাম তখন কোনপ্রকার নড়াচড়া ছাড়া এমনভাবে নীরবতা পালন করতেন যেন তাঁদের মাথায় পাখি বসে আছে। (মুজামুল কাবির)

তালেবে ইলমের আদব রক্ষার গুরুত্ব প্রসঙ্গে কিছু শিক্ষণীয় উক্তি:

  • হযরত ফুযাইল বিন আয়ায রহ. বলেন- আমি ইমাম মালেক রহ. থেকে বিশ বছর পড়েছি, তিনি আমাকে আঠারো বছর আদব শিখিয়েছেন।
  • হযরত বুরহানউদ্দিন যরনুষি রহ. বলেন- শিক্ষকের প্রতি সর্বোচ্চ আদব রক্ষা করতে না পারা পর্যন্ত একজন তালেবে ইলম তাঁর জ্ঞান থেকে উপকার অর্জন করতে পারবে না।
  • হযরত ফখরুদ্দিন আরসাবন্দি অনেক বড় মাপের আলেম ছিলেন। আপন জামানার ইমামদেরও ইমাম ছিলেন। তিনি বলেন- আমার এই অর্জন শুধুমাত্র শিক্ষকদের প্রতি আদবের মাধ্যমেই অর্জিত হয়েছে।

আদব রক্ষা করলে শিক্ষকদের অন্তর আনন্দিত হয়, হাদীস শরীফে এসেছে:

أَحَبُّ الْأَعْمَالِ إِلَى اللَّهِ سُرُورٌ تُدْخِلُهُ عَلَى مُسْلِمٍ

অর্থ: আল্লাহ তা'আলার কাছে উত্তম কাজ হলো যে কাজের মাধ্যমে এক মুসলিম অপর মুসলিমের অন্তরে আনন্দের সৃষ্টি হয়। (তাবরানি)

ছাত্রদের উচিত শিক্ষকদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে তাঁদের অন্তর খুশি করার মাধ্যমে বেশি বেশি দুআ পাওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করা। কোন অবস্থাতেই যেন আদবের খেলাফ না হয়, সেদিকে সজাগ দৃষ্টি দেয়া।

৪. অধ্যাবসায়কে গুরুত্ব দেয়া

শিক্ষার্থীদের উচিত অধিকাংশ সময় লেখাপড়ায় ব্যয় করা। যাঁরা শিক্ষার্থী অবস্থায় অধ্যাবসায়কে যতোবেশি গুরুত্ব দিয়েছে, তাঁরা জীবনে ততোবেশি উন্নতি সাধন করতে পেরেছে। এক্ষেত্রে নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত থেকে প্রত্যেক ঘন্টায় মনোযোগ সহকারে পাঠ্যবিষয় ধারণ করা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কেননা, ক্লাসে উপস্থিতির মাধ্যমে যে জ্ঞান অর্জিত হয়, তা পরবর্তীতে বছরের পর বছর সাধনার মাধ্যমে অর্জন করা বেশ কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। বর্তমানে এ দিকটিতে ছাত্রদের দুর্বলতা স্পষ্ট ফুটে উঠছে। তারা নিয়মিত ক্লাসকে যতটুকু গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন, ততটুকু দিচ্ছে না। যা ভবিষ্যতের জন্য অশনি সংকেত বটে।

৫. সময়ের প্রতি আন্তরিক হওয়া

উপযুক্ত বিষয়ে সময়কে ব্যবহার করা অত্যন্ত জরুরি। রাসূল (স.) ইরশাদ করেন:

نِعْمَتَانِ مَغْبُونٌ فِيهِمَا كَثِيرٌ مِنَ النَّاسِ الصَّحَّةُ وَالْفَرَاغُ

অর্থ: দুইটি নেয়ামতের বিষয়ে মানুষ বেশিরভাগ ধোঁকাগ্রন্থ হয়। একটি শারীরিক সুস্থতা আর অপরটি অবসর সময়। (সহিহ বুখারি ৬৪১২)

আমরা অবসর সময়কে হেলায় কাটিয়ে দিই। অথচ আমাদের উচিত ছিল অবসর সময়কে গুরুত্ব দিয়ে ভবিষ্যত জীবনে উন্নতি সাধনের দিকে অগ্রসর হওয়া। যে কিতাব পড়া হয়নি কিংবা বুঝা আসেনি, সময় থাকতে সেই কিতাবগুলোকে যেকোনভাবে নিজ আয়ত্বে আনার ব্যবস্থা করা।

সময়ের গুরুত্ব প্রসঙ্গে কিছু গুরুত্ববহ উক্তি:

  • হযরত হাসান বসরি রহ. বলেন- হে আদম সন্তান, তুমি কিছুদিনের মেহমান। কয়েকটি দিন মিলেই তোমার জীবন। এরমধ্যে একটি দিন চলে যাওয়া মানে তোমার জীবনের একটি অংশ চলে যাওয়া।
  • হযরত ওমর ইবন্ আব্দুল আজিজ রহ. বলেন- নিশ্চয়ই দিন-রাত তোমার কাজ করে। অতএব, তুমিও দিন-রাত কাজ কর। নচেৎ তা তোমার হাতছাড়া হয়ে যাবে। তখন শত আফসোসেও কাজ হবেনা।
  • হযরত ওমর ফারুক রাদি. বলেন- নিশ্চয়ই শক্তি হলো কাজের মধ্যে। আজকের কাজকে আগামীকালের জন্য জমা রেখ না। তুমি যদি এরূপ কর, তবে তা জমতে জমতে তোমার জন্য কষ্টসাধ্য এবং ভারি হয়ে যাবে। যার ফলে তোমার শক্তিও কমে যাবে।

শিক্ষার্থীদেরও উচিত- আজকের পড়া আগামীকালের জন্য জমিয়ে না রাখা। যদি জমিয়ে রাখে, তবে তা আয়ত্ব করা কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে যাবে। তখন পড়ালেখার প্রতি অনিহা চলে আসবে। যা বর্তমানে অহরহ দেখা মিলছে।

৬. ছাত্রজীবনে পড়ালেখার পরিবেশ বজায় রাখা

বেশি বেশি বাড়িতে না যাওয়া। সর্বদা ভালো শিক্ষার্থীদের সাথে থেকে কিংবা শিক্ষকদের সান্নিধ্যে গিয়ে কিতাবাদি নিজ আয়ত্বে আনার চেষ্টা করা। এমন শিক্ষার্থীদের সঙ্গ ত্যাগ করা, যারা পড়ালেখার বিষয়ে গাফেল। যারা সময়ের গুরুত্ব দেয় না, ঘুরাফেরার মধ্যে ব্যস্ত থাকে। এমন শিক্ষার্থীদের কারণে পড়ালেখার পরিবেশ নষ্ট হয়। আমাদের মনে রাখতে হবে- পড়ালেখার জন্য ভালো পরিবেশ নিশ্চিত করা অত্যাবশ্যক। কেননা, ভালো পরিবেশের মাধ্যমে শিক্ষার্থী নিজেকে ভালো পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে। আবার, খারাপ পরিবেশের কারণে ভালো শিক্ষার্থীও খারাপের দিকে ধাবিত হতে পারে।

৭. যেকোনো কিতাব একবার অধ্যয়ন করে রেখে না দেয়া

কেননা, একবার পড়া শেষ করলেই সেটি সম্পূর্ণ মনে থাকে না। বরং যতোবেশি পড়বে ততোবেশি মনে থাকবে। পূর্ববর্তী আলেমগণ এই আমলটি করতেন। এক কিতাব বারবার তাকরার করতেন। বরেণ্য মুহাদ্দিস, আল্লামা জামাল উদ্দিন রহ. বুখারি শরিফের একশত বিশ বার খতম আদায় করেছিলেন। নিজে পড়ার মাধ্যমে কিংবা অন্যকে পড়ানোর মাধ্যমে যখন এক কিতাব বারবার তাকরার হয়, তখন সেটি খুব ভালোভাবেই আমাদের অন্তরে গেঁথে যায়। অথচ বর্তমানে দেখা যায়, যেকোন কিতাব একবার পড়ার পর মানুষকে বলে বেড়ায় আমি অমুক অমুক কিতাব পড়েছি। কিন্তু সেসব কিতাব থেকে কোন বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে যথাযথ উত্তর দিতে পারেন না। এর কারণ হলো বারবার না পড়া।

৮. ছাত্রজীবনে টাকা-পয়সা খরচের ব্যাপারে সতর্ক থাকা

নিজ বিবেক খাটিয়ে খরচ করা। টাকা-পয়সার জন্য পরিবারের মাঝে কোনপ্রকার চাপ সৃষ্টি না করা। যতটুকু সম্ভব নিজের খরচ নিজেই ব্যবস্থা করা। কেননা নিজের আয়কৃত টাকার প্রতি আলাদা একটি মায়া থাকে, যার দরুণ অপচয় করা থেকে বিরত থাকা যায়। অনেক শিক্ষার্থীরা বন্ধু-বান্ধবদের সাথে মিলে না বুঝে পরিবারকে মিথ্যা বলে টাকা নেয় এবং সেগুলো বিপথে খরচ করে। যার ফলে মা-বাবার অন্তরে কষ্ট লাগে, বদদোয়া আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়। যা শিক্ষার্থীদের জীবনে উন্নতি সাধনের ক্ষেত্রে বাঁধার সৃষ্টি করে।

৯. হস্তলিপি সুন্দর করার দিকে তীক্ষ্ণ নজর দেয়া

বেশি বেশি লেখা প্র্যাক্টিস করা। যেকোনো বিষয় মুখস্ত করার পর সেটি নিজহাতে লিখে রাখলে তা স্মরণে বেশি থাকে। বিষয়টির একটি নকশা অঙ্কিত হয়ে যায়। সাথে লেখাও সুন্দর হয়। পরীক্ষায় ভালো রেজাল্টের জন্য হাতের লিখা সুন্দর হওয়া অপরিহার্য বটে।

১০. আগে নিজেকে যথাযথ গঠন করা, তারপর উপস্থাপন করা

কিছু অর্জনের আগেই নিজেকে আলেম হিসেবে পরিচয় দেয়া ভণ্ডামি। অতএব নিজেকে ভণ্ড হিসেবে পরিচিত না করে বরং হক্কানি আলেম হিসেবে গঠন করাই শিক্ষার্থীদের জন্য বেশি উপযোগী। প্রাথমিকভাবে এই দশটি গুণ কোনো শিক্ষার্থীর কাছে থাকা মানে নিজের ভবিষ্যতকে সুন্দর ও সাফল্যের পথে নিয়ে যাওয়া। আমাদের প্রত্যেক শিক্ষার্থীদের জন্য সবশেষ নসিহত এটাই- শিক্ষাজীবনে নিজের প্রতি আন্তরিক হও, ভবিষ্যত তোমাকে বাহবা দিয়ে বরণ করে নিবে ইনশাআল্লাহ।

"জ্ঞানার্জনের উদ্দেশ্য হলো জ্ঞানকে আল্লাহর জন্য ব্যবহার করা, শুধুমাত্র জ্ঞানের জন্য জ্ঞানার্জন করা নয়।"
- হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)

Post a Comment

0 Comments

Post a Comment (0)

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Check Out
Ok, Go it!