টেকসই উন্নয়ন ও বাংলাদেশ: লক্ষ্যমাত্রা, চ্যালেঞ্জ ও করণীয়

MD OMAR FARUK
0
টেকসই উন্নয়ন (SDG) এর ধারণা ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

আধুনিক বিশ্ব অর্থনীতিতে টেকসই উন্নয়নের ধারণাটি বর্তমানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মূলত, এই ধারণাটি সর্বপ্রথম পাওয়া যায় 'ক্লাব অব রোম' নামক একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদন থেকে। পরবর্তীতে, পরিবেশ সুরক্ষা এবং অর্থনৈতিক সমতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে জাতিসংঘ বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করে।

টেকসই উন্নয়নের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

১৯৬৫ সালে ইতালীয় শিল্পপতি আরেলিও পিসচাই এবং স্কটিশ বিজ্ঞানী আলেকজান্ডার কিং 'ক্লাব অব রোম' সংস্থাটি গড়ে তোলেন। পরবর্তীতে ১৯৭২ সালে সংস্থাটি বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি এবং এর প্রভাব সম্পর্কে একটি আলোড়ন সৃষ্টিকারী প্রতিবেদন প্রকাশ করে। মূলত এটি গ্রন্থাগারে 'দ্য লিমিট টু গ্রোথ' (১৯৭২) নামে বের হয়। এই প্রতিবেদনে টেকসই উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধির সীমা গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা হয়। এতে স্পষ্ট করে বলা হয়, উন্নয়নের একটি নির্দিষ্ট সীমারেখা টানতে হবে, অন্যথায় পৃথিবীর প্রাকৃতিক সম্পদ আস্তে আস্তে ধ্বংস হয়ে যাবে।

ব্রান্টল্যান্ড রিপোর্ট ও টেকসই উন্নয়নের সংজ্ঞা

১৯৮৭ সালে জাতিসংঘের 'ওয়ার্ল্ড কমিশন অন এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট' একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যা 'আওয়ার কমন ফিউচার' বা ব্রান্টল্যান্ড রিপোর্ট নামে পরিচিত। এই প্রতিবেদনে টেকসই উন্নয়নের সংজ্ঞাকে সুস্পষ্ট করা হয়:

"টেকসই উন্নয়ন হচ্ছে এমন একটি অর্থনৈতিক উন্নয়ন, যা বর্তমান প্রজন্মের চাহিদা পূরণ করতে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চাহিদা মেটাতে সক্ষম হয়।"

এমডিজি থেকে এসডিজি: উন্নয়নের ধারাবাহিকতা

২০০০ সালে জাতিসংঘ 'সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা' বা এমডিজি (MDG) প্রণয়ন করে। এমডিজিতে সদস্য দেশগুলোর জন্য ৮টি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল, যা ২০১৫ সালের মধ্যে পূরণ করতে বলা হয়। পরবর্তীতে সেই গতি ধরে রাখতেই ২০১৫ সালের শেষদিকে জাতিসংঘ ১৫ বছরের জন্য আরও একগুচ্ছ লক্ষ্য নির্ধারণ করে। এর নাম দেওয়া হয় 'টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা' বা এসডিজি (SDG)। এতে ১৭টি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়, যা ২০৩০ সালের মধ্যে পূরণ করতে বলা হয়।

এসডিজির ১৭টি লক্ষ্যমাত্রা

  1. দারিদ্র্য বিমোচন [No Poverty]: সর্বত্র এবং সব ধরনের দরিদ্রতা দূর করা।
  2. ক্ষুধামুক্তি [Zero Hunger]: ক্ষুধা দূর করা, খাদ্য নিরাপত্তা ও উন্নত পুষ্টি অর্জন এবং টেকসই কৃষিব্যবস্থা চালু করা।
  3. সুস্বাস্থ্য ও কল্যাণ [Good Health & Well being]: স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপন নিশ্চিত করা এবং সব বয়সের সকলের জন্য কল্যাণ বৃদ্ধি।
  4. মানসম্মত শিক্ষা [Quality Education]: অন্তর্ভুক্তিমূলক, সমতাপূর্ণ ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা এবং সবার জন্য জীবনব্যাপী শিক্ষা সুযোগ সৃষ্টি।
  5. জেন্ডার সমতা [Gender Equality]: জেন্ডার সমতা অর্জন করা এবং সব নারী ও তরুণীর ক্ষমতায়ন।
  6. বিশুদ্ধ পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন [Clean Water & Sanitation]: সবার জন্য পানি ও পয়ঃনিষ্কাশনের সুযোগ এবং এর টেকসই ব্যবস্থাপনা।
  7. ব্যয়সাধ্য ও টেকসই জ্বালানি [Affordable & Sustainable Energy]: সবার জন্য ব্যয়সাধ্য, নির্ভরযোগ্য, টেকসই এবং আধুনিক জ্বালানির সুযোগ নিশ্চিতকরণ।
  8. সবার জন্য ভালো কাজ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি [Decent Work & Economic Growth]: সবার জন্য টেকসই, অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, পূর্ণকালীন ও উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান নিশ্চিতকরণ।
  9. শিল্প, উদ্ভাবন ও উন্নত অবকাঠামো [Industry, Innovation & Infrastructure]: দীর্ঘস্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণ করা, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং টেকসই শিল্পায়ন এবং উদ্ভাবনকে প্রেরণা দেওয়া।
  10. বৈষম্য হ্রাসকরণ [Reduced Inequalities]: দেশের ভেতরে এবং বিভিন্ন দেশের মধ্যকার বৈষম্য দূর করা।
  11. টেকসই শহর ও সম্প্রদায় [Sustainable Cities and Communities]: শহর এবং মানুষের বাসস্থানকে অন্তর্ভুক্তিমূলক, নিরাপদ, দীর্ঘস্থায়ী এবং টেকসই করে তোলা।
  12. দায়িত্বশীল ব্যবহার [Responsible Consumption & Production]: টেকসই ভোগ ও উৎপাদন রীতি নিশ্চিত করা।
  13. জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিরোধ [Climate Action]: জলবায়ুর পরিবর্তন ও প্রভাব মোকাবিলায় জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ।
  14. সমুদ্রের সুরক্ষা [Life below Water]: টেকসই উন্নয়নের জন্য মহাসাগর, সাগর এবং সামুদ্রিক সম্পদের সংরক্ষণ ও টেকসই ব্যবহার।
  15. ভূমির সুরক্ষা [Life on Land]: ভূমির উপরিভাগস্থ পরিবেশ-ব্যবস্থার সুরক্ষা, পুনঃস্থাপন এবং টেকসই ব্যবহার।
  16. শান্তি ও ন্যায়বিচার [Peace, Justice & Strong Institutions]: টেকসই উন্নয়নের জন্য শান্তিপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ প্রতিষ্ঠা।
  17. লক্ষ্য অর্জনের জন্য অংশীদারিত্ব [Partnerships for the Goals]: বাস্তবায়নের উপায়গুলো শক্তিশালী করা এবং বৈশ্বিক অংশীদারিত্ব পুনরুজ্জীবিত করা।

এসডিজি অর্জনে প্রধান চ্যালেঞ্জসমূহ

বাংলাদেশে এসডিজি অর্জনে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে:

  • সম্পদের অসম বণ্টন ও বৈষম্য: ধনী-গরিবের ক্রমবর্ধমান ব্যবধান এবং অর্থনৈতিক ভারসাম্যহীনতা একটি বড় বাধা।
  • পরিবেশ দূষণ ও প্রাকৃতিক বিপর্যয়: জলবায়ু পরিবর্তন, নদী দখল এবং অপরিকল্পিত নগরায়নের ফলে প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে।
  • প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়হীনতা: জবাবদিহি ও স্বচ্ছতার অভাব সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

এসডিজি বাস্তবায়নে করণীয় পদক্ষেপ

  • নীতিমালা ও মনিটরিং: নীতি-কাঠামোগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং বাস্তবায়নের প্রতিটি পর্যায়ে মনিটরিং জোরদার করতে হবে।
  • কর্মসংস্থান ও দক্ষতা বৃদ্ধি: সাধারণ মানুষের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা ও সম্পদের ন্যায্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে।
  • গ্রামীণ অর্থনীতি ও বাজেট বরাদ্দ: গ্রামীণ অর্থনীতির বিকাশে অ-কৃষি খাতকে যথেষ্ট প্রাধান্য দিতে হবে।

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

প্রশ্ন: এসডিজি (SDG) এবং এমডিজি (MDG)-এর মধ্যে মূল পার্থক্য কী?
উত্তর: এমডিজি ছিল মূলত উন্নয়নশীল দেশগুলোর দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য ৮টি লক্ষ্য। অন্যদিকে, এসডিজি হলো বিশ্বের সব দেশের জন্য ১৭টি লক্ষ্য, যা অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষা ও সামাজিক সাম্যের ওপর জোর দেয়।

প্রশ্ন: এসডিজি অর্জনের সময়সীমা কত সাল পর্যন্ত?
উত্তর: জাতিসংঘের ঘোষণা অনুযায়ী, এসডিজির ১৭টি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের সময়সীমা হলো ২০৩০ সাল।

প্রশ্ন: ব্রান্টল্যান্ড রিপোর্ট কত সালে প্রকাশিত হয়?
উত্তর: ১৯৮৭ সালে জাতিসংঘের 'ওয়ার্ল্ড কমিশন অন এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট' কর্তৃক ব্রান্টল্যান্ড রিপোর্ট প্রকাশিত হয়।

Post a Comment

0 Comments

Post a Comment (0)

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Check Out
Ok, Go it!